Advertisement
E-Paper

আড্ডাটাই ধরে রেখেছে সম্পর্কের যোগসূত্র

যার সব কিছুর সঙ্গেই কোনও না কোনও ভাবে জড়িয়ে আছি, সেটাই আমার পাড়া। এক কথায় বৃহত্তর এক পরিবার। যেখানে সব সময় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি, অনুভব করি এক স্বস্তি, সেটাই আমার পাড়া তালতলার-লর্ডপাড়া।

সুমিত চৌধুরী

শেষ আপডেট: ২৩ জুলাই ২০১৬ ০১:০২

যার সব কিছুর সঙ্গেই কোনও না কোনও ভাবে জড়িয়ে আছি, সেটাই আমার পাড়া। এক কথায় বৃহত্তর এক পরিবার। যেখানে সব সময় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি, অনুভব করি এক স্বস্তি, সেটাই আমার পাড়া তালতলার-লর্ডপাড়া। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোড থেকে শুরু হয়ে আমাদের পাড়াটা মিশেছে ডক্টর্স লেনে। পাশেই আব্দুল হালিম লেন। অতীতে যার নাম ছিল ইউরোপিয়ান অ্যাসাইলাম লেন। আমাদের পাড়াটার নাম লর্ডপাড়া হলেও ঠিকানা কিন্তু আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোড। লর্ডপাড়া নামকরণের নেপথ্যে রয়েছে এক কাহিনি। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।

অন্য পাড়ার মতোই এখানেও উন্নত নাগরিক পরিষেবা। কাউন্সিলর ইন্দ্রাণী বন্দ্যোপাধ্যায় যে কোনও সমস্যার সমাধানে পাশে থাকেন। নিয়মিত হয় রাস্তা পরিষ্কার, জঞ্জাল অপসারণ। গত কয়েক বছরে বসেছে জোরালো আলো।

পাড়ার সকালটা শুরু হয় আড্ডা দিয়েই। ভোর সাড়ে পাঁচটা থেকে একে একে আড্ডার সদস্যরা জড়ো হতে থাকেন শ্বেতপাথরে বাঁধানো রকে। আড্ডা চলে সকাল আটটা পর্যন্ত। সেখানেই খবরের কাগজে চোখ বোলানোর পাশাপাশি চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিতে দিতে চলে কুশল বিনিময়। আবারও আড্ডা বসে প্রতি সন্ধ্যায়। এতে সামিল হন তিরিশ থেকে সত্তর বছরের বাসিন্দারাও। আড্ডার ফাঁকেই বেধে যায় তুমুল তর্ক-বিতর্ক। ঘটি-বাঙাল, মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল কিংবা ইলিশ-চিংড়ি নিয়ে তর্ক গড়ায় রাত দশটা পর্যন্ত।

আসলে আড্ডাটাই আমাদের পাড়ার মানুষের মধ্যে একটা যোগসূত্র। সেটা আছে বলেই সকলে সকলকে চেনেন, খোঁজখবরও রাখেন। আমাদের প্রজন্ম আড্ডা দিলেও পরের প্রজন্মের আড্ডার আকর্ষণ নেই। যুব সম্প্রদায়ের বেশির ভাগই আজ কর্মসূত্রে বাইরে রয়েছেন। আর যাঁরা আছেন তাঁদের আড্ডায় খুব একটা আগ্রহ নেই। তাঁরা ফেসবুক, স্মার্টফোন কিংবা হোয়্যাটসঅ্যাপেই মগ্ন।

সকাল সকাল শোনা যায় হরেক ফেরিওয়ালার ডাক। শিলকাটাই, ধুনুরির টঙ্কার কিংবা পুরনো কাগজওয়ালার ডাকগুলো সব বাঁধা আছে নির্দিষ্ট সময়ে। বেলা বাড়তেই থলি হাতে বাজারে যান অনেকেই। কাছেই রয়েছে এন্টালি বাজার। অন্য দিকে, তালতলা বাজার। সেখানে মেলে প্রয়োজনীয় সব জিনিসই।

এ পাড়ার সবচেয়ে বড় গুণ লোকবলের অভাবে কাউকে অসহায় বোধ করতে হয় না। যে কোনও সমস্যায় পাড়াপড়শিরা আজও পাশে থাকেন। যথাসাধ্য সাহায্য করারও চেষ্টা করেন। এটাই মধ্য কলকাতার এই পাড়ার বৈশিষ্ট্য। আজও পাড়ায় নতুন কেউ এলে কয়েক দিনের মধ্যেই পুরনোদের সঙ্গে মিলেমিশে যান। সম্পর্কের উষ্ণতা আজও এ পাড়ায় পূর্ণমাত্রায় বজায় আছে।

এ পাড়ার সান্ধ্য আকর্ষণ বাসুর ফুচকা। তিন পুরুষ ধরে চলছে এই ফুচকার ব্যবসা। আর সেই স্বাদ এক বার যে পেয়েছে বার বার ফিরে আসে। তাই তো দেখি এ পাড়ার বিবাহিত মেয়েরা যাঁরা বাইরে থাকেন, বাপের বাড়ি এলে আগে ফুচকায় তৃপ্তি মিটিয়ে তবেই বাড়ি ঢোকেন! এমনই এর স্বাদ মাহাত্ম্য।

আজও এ পাড়ায় পুরনো বাড়ির সংখ্যাই বেশি। স্থানাভাবে নতুন বাড়ি, বহুতল তৈরি হয়নি। তাই মিশ্র সংস্কৃতি প্রবেশ না করায় এ পাড়ার নিজস্ব সংস্কৃতি এবং আবহাওয়া আজও অটুট।

ছোটবেলার পাড়া আর আজকের পাড়ার বাইরের চেহারার খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। পাড়ার আর এক আকর্ষণ তালতলা সর্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটির ৮৭ বছরের পুজোটি। পুজো ছাড়াও ওই ক্লাবের উদ্যোগে হয় রক্তদান ও চক্ষু পরীক্ষা শিবির, দুঃস্থদের মধ্যে বস্ত্র বিতরণ। আগে কালীপুজোর সময় পাড়ায় জমজমাট গানের জলসা ‘দীপালি উৎসব’ হত। তাতে তালাত মেহমুদ, মহম্মদ রফি, উত্তমকুমার থেকে ভি বালসারা কে না এসেছেন। সে সব আজ শুধুই স্মৃতি। তবে এখনও দুর্গাপুজোর সময় পাড়ার কচিকাঁচাদের নিয়ে আয়োজন করা হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেটা দেখতে আজও ভিড় করেন আশপাশের অঞ্চলের মানুষ।

সময়ের প্রভাবে কমেছে পাড়ার খেলাধুলোর পরিবেশ। অতীতের সেই মাঠটা আজ আর নেই। আগে রাস্তাতেই ছোটরা খেলত ফুটবল, ক্রিকেট। তবে বাড়তে থাকা গাড়ির সংখ্যায় সেটাও আর সম্ভব হয় না। তবে ছুটির দিনে গলিতে ছোটদের আজও খেলতে দেখা যায়। আর বছরে এক বার হয় ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। পাশাপশি কমেছে লাইব্রেরি যাওয়ার আর বই পড়ার অভ্যাসটাও।

আজ যেটা আমাদের পাড়া, অতীতে সেটাই ছিল ইউরোপিয়ান অ্যাসাইলামের বাগান। ১৯২৫-২৬ নাগাদ অ্যাসাইলামটি উঠে যাওয়ার পরে তৈরি হয় এই পাড়া। সে কালের বর্ধিষ্ণু, অভিজাতরা থাকতেন বলেই নামকরণ হয় লর্ডপাড়া। আজও পূর্ণাঙ্গ বাঙালি পাড়া। কিছু অবাঙালি এলেও তাঁরাও বাঙালি হয়ে গিয়েছেন। এ পাড়াতেই রয়েছে মেয়েদের দু’টি মেস বাড়ি। পাড়াটা আজও নিরাপদ, সুরক্ষিত।

কাছাকাছির মধ্যে থাকতেন বেশ কিছু প্রথিতযশা চিকিৎসক। যেমন মহেন্দ্রনাথ সরকার, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, আবীরলাল মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। আর থাকতেন সাহিত্যবন্ধু অনিলকুমার দে, জাস্টিস শিশিরকুমার মুখোপাধ্যায়, ত্রিপুরারী সেন শাস্ত্রী প্রমুখ।

এমন একটা পাড়া ছেড়ে অন্যত্র থাকার কথা দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারি না। আট থেকে আশি এ পাড়ায় সকলকে নিয়ে মিলেমিশে আমরা ভালই আছি।

লেখক বিশিষ্ট চক্ষু চিকিৎসক

ছবি: স্বাতী চক্রবর্তী।

Sumit Chowdhury
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy