Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২১ অক্টোবর ২০২১ ই-পেপার

নির্যাতনের তিক্ত অতীত ভুলে স্নেহের কাছে হার মানছেন ওঁরা

নীলোৎপল বিশ্বাস
০৫ নভেম্বর ২০১৮ ০০:২৭
অশোকনগরের মানিকলাল বিশ্বাস এবং তাঁর স্ত্রী গৌরিরানিদেবী

অশোকনগরের মানিকলাল বিশ্বাস এবং তাঁর স্ত্রী গৌরিরানিদেবী

অশোকনগরের মানিকলাল বিশ্বাস। ব্যারাকপুরের রায়মণি ভট্টাচার্য। কিংবা নিমতার শান্তিপ্রভা দেব।

নামগুলো শুনলে হয়তো চট করে মনে পড়বে না কিছু। কিন্তু তাঁদের ছবি ইতিমধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে জনে জনে, হাতে হাতে! স্মার্টফোনের পর্দায় অনেকেই অবাক চোখে দেখছেন, কী ভাবে ভাঙাচোরা, বয়স্ক মানুষগুলোকে নির্দয় ভাবে পেটাচ্ছেন তাঁদেরই সন্তানেরা। কিংবা অশক্ত, বৃদ্ধা মাকে ফেলে কী ভাবে উধাও হয়ে গিয়েছেন ছেলে-বৌমা! খাবার না পেয়ে বৃদ্ধা মায়ের কান্নার ছবিও ঘুরছে হাতে হাতে। এবং এই সমস্ত ছবি ছুড়ে দিচ্ছে কিছু প্রশ্নও। এ সব কি ব্যতিক্রমী ঘটনা, নাকি প্রবীণদের প্রতি সমাজের সার্বিক অবহেলা আর তাচ্ছিল্যেরই বীভৎস, নির্লজ্জ প্রকাশ? প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, প্রবীণ মা-বাবা কিন্তু এমন অত্যাচারের পরেও সন্তানকে এক কথায় ক্ষমা করে দিয়েছেন।

স্নেহ যে নিম্নগামী, সে কথা তো কবেই বাঙালিকে বলে গিয়েছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তার টাটকা নমুনা এই স্মার্টফোন আর হোয়াটসঅ্যাপ-ফেসবুকের যুগেও দেখা যাচ্ছে। দেখে দেখে যেমন লোকের মুখস্থ হয়ে গিয়েছে অশোকনগরের বৃদ্ধ দম্পতির ঘটনা।

Advertisement

বৃদ্ধের বয়স নব্বইয়ের কোঠায়। গায়ের চামড়া কুঁচকে ঝুলে পড়েছে। ঝাপসা চোখে মোটা কাচের চশমা। পাশে বসা অশীতিপর স্ত্রী। তাঁকে দেখিয়ে বৃদ্ধ বলছেন, ‘‘একটু মিষ্টির জন্য ওর প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছিল। আমার কাছে অবদার করল! সে দিন একাদশী। সকলেই মিষ্টিমুখ করছেন! আমিও ছেলের দেওয়া হাতখরচের টাকায় মিষ্টি কিনে এনেছিলাম।’’ বৃদ্ধাও বললেন, ‘‘বাবু (ছেলে) দেখে ফেলবে বলে মিষ্টি পাঞ্জাবির পকেটে লুকিয়ে রেখেছিল। ধরা পড়ে গিয়েছে। তবে বাবু যে ও ভাবে মারবে, তা ভাবিনি!’’

গত ২০ অক্টোবর একাদশীর দিন স্ত্রীকে সন্দেশ খাওয়ানোর ‘অপরাধে’ ছেলের হাতে বেধড়ক মার খান অশোকনগর থানা এলাকার বিল্ডিং মোড়ের বাসিন্দা মানিকলাল বিশ্বাস। মারধরের সেই ভিডিয়ো সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে ছড়িয়ে পড়তেই শোরগোল পড়ে যায়। দেখা যায়, এক ব্যক্তি পাঞ্জাবি পরা এক বৃদ্ধকে দু’গালে একের পর এক থাপ্পড় মেরে চলেছেন। সঙ্গে চেঁচাচ্ছেন, ‘‘কেন মাকে মিষ্টি দিয়েছ? আমার থেকে কেন অনুমতি নেওয়া হয়নি? আবার লুকিয়ে রাখছ? ভাবছ দেখতে পাব না!’’



ব্যারাকপুর কালিয়ানিবাসের রায়মণি ভট্টাচার্য এবং নিমতার শান্তিপ্রভা দেব।

ভিডিয়ো দেখে সক্রিয় হয় পুলিশ। গ্রেফতার করা হয় মানিকলালবাবুর ছেলে প্রদীপকে। যদিও অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেন মানিকলালবাবু। প্রদীপ ছাড়া পেয়ে যান। তাঁর যুক্তি, ‘‘মা স্মৃতিভ্রংশতার সমস্যায় ভুগছেন। রক্তে শর্করার মাত্রা অত্যন্ত বেশি। মিষ্টি মায়ের জন্য বিষ। আমি নিজেই বাড়িতে মা-বাবার জন্য কম মিষ্টির সন্দেশ বানাই। তবু আমায় লুকিয়ে মিষ্টি খাচ্ছে দেখে মাথা ঠিক রাখতে পারিনি।’’ শুক্রবার মানিকলালবাবু বলছিলেন, ‘‘ছেলে আমাকে ভালবাসে। ভুল করে ফেলেছে। কোন ছেলে-মেয়ে ভুল করে না বলুন!’’ মানিকলালবাবুর এই ক্ষমায় কি ফুটে উঠছে চিরন্তন পিতৃহৃদয়ের স্নেহশীল ছবিটাই? সব বাবা-মায়ের ভিতরেই বোধহয় এক ধরনের স্নেহবুভুক্ষু সাজাহান থাকেন। ডিএল রায়ের নাটকে যে বন্দি সাজাহানকে জাহানারার কাছে যুগ যুগ ধরে বিলাপ করতে দেখেছে বাঙালি। নিষ্ঠুর ছেলের প্রতি বিষোদ্গার করতেও যে বাবার মুখে কথা সরে না। উল্টে ছেলেকে কষ্ট দিয়ে নিজেকে অপরাধী ভাবেন তিনি।

ব্যারাকপুর কালিয়ানিবাসের বাসিন্দা রায়মণি ভট্টাচার্যও তো ছেলের নামে নালিশ করে এখন সবার কাছে ক্ষমা চাইছেন। ওই বৃদ্ধা বলেন, ‘‘আমার জন্য ছোট ছেলে আর বৌমার চাকরি গিয়েছে। দেখুন না, ওদের কাজের একটা ব্যবস্থা করা যায় কি না।’’

গত ১৭ সেপ্টেম্বর রায়মণিদেবীকে বাড়ির বারান্দায় তালাবন্ধ করে রেখে স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে গুয়াহাটি বেড়াতে চলে গিয়েছিলেন ছোট ছেলে রতন ভট্টাচার্য। সত্তরোর্ধ্ব মায়ের জন্য বরাদ্দ ছিল স্রেফ আধ প্যাকেট মুড়ি। দু’দিন তা-ই খেয়ে কাটিয়ে শেষে খিদের জ্বালায় চেঁচাতে শুরু করেন বৃদ্ধা। সেই চিৎকার শুনে বিষয়টি জানতে পেরে এগিয়ে আসেন প্রতিবেশীরা। রতন ও তাঁর স্ত্রী স্বাতী স্থানীয় একটি বেসরকারি স্কুলে পড়াতেন। স্কুলের প্রধান শিক্ষক কুণাল ঘটকের দাবি, ‘‘ছেলেকে ফোনে সব জানিয়েও দেখি, তাপ-উত্তাপ নেই।’’ অভিভাবকদের আপত্তিতে পরে রতন ও তাঁর স্ত্রীর চাকরি গিয়েছে। এখন ইছাপুরে বড় ছেলের বাড়িতে থাকছেন রায়মণিদেবী। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘‘বড় ছেলেও আমার বোঝা আর টানতে পারছে না। ওর ছোটখাটো চাকরি। জানি না, কোথায় যাব!’’

লাঠিপেটা খেয়েও ছেলেকে ছেড়ে যেতে পারেননি নিমতার শান্তিপ্রভা দেব। ছেলে ভুলুপ্রসাদ তাঁকে লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছেন— কয়েক মাস আগেই সেই ভিডিয়ো ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেশীদের অভিযোগে ভুলুপ্রসাদকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এক দিনের মধ্যে অবশ্য জামিনও পেয়ে যান তিনি। এখন নিমতার বাড়িতে মায়ের সঙ্গেই থাকেন ভুলুপ্রসাদ। শান্তিপ্রভার স্বামীর পেনশনের টাকায় সংসার চলে। বড় ছেলে বিয়ে করে অন্যত্র থাকেন। এক দুপুরে গিয়ে দেখা গেল, বাড়ির একটিমাত্র ঘরে আলো জ্বলে। সেখানেই মেঝেয় মশারি খাটিয়ে থাকেন মা-ছেলে। ভুলুপ্রসাদ বলেন, ‘‘আমিই তো মাকে দেখি। পুজোয় ঘুরতেও নিয়ে গিয়েছিলাম। সে দিনই মাথাটা গরম হয়ে গিয়েছিল।’’

ভুলুপ্রসাদের মা-ও ছেলেকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। বরং এখন তাঁর অন্য চিন্তা! ‘‘ছেলের বিয়েটাই দিতে পারলাম না! আমি চলে গেলে কে যে ওকে দেখবে!’’

ছবি: সুজিত দুয়ারি এবং সজল চট্টোপাধ্যায়

আরও পড়ুন

Advertisement