বেআইনি পার্কিং সরিয়ে দখলমুক্ত করা হচ্ছে একের পর এক রাস্তা। হেলমেটহীন মোটরবাইক আরোহীদের দেখলেই জরিমানা করা হচ্ছে। একমুখী রাস্তায় প্রবেশ বা যে কোনও ট্র্যাফিক-বিধি লঙ্ঘন করলেও পদক্ষেপ হচ্ছে হাতেনাতে। দিনভর এই কড়া পুলিশি বন্দোবস্ত প্রশংসা পাচ্ছে নানা মহলেই। কিন্তু সকালের এই ব্যবস্থা কি থাকছে রাতের কলকাতাতেও?
বুধবার গভীর রাত পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে সেই ঢিলেঢালা ব্যবস্থাই চোখে পড়ল। বড় একটি বা দু’টি মোড় ছাড়া বাকি শহরের কোথাও পুলিশ নেই। যেমন খুশি দাপিয়ে বেড়াতে দেখা গেল বাইক আরোহীদের। বিধি ভেঙে ছুটল লরি, গাড়ি। কোথাও আবার একমুখী রাস্তায় ঢোকা বাইক অন্য গাড়ির সঙ্গে সংঘর্ষের পরিস্থিতিতে পড়ল। সবটাই চলছে স্বয়ংক্রিয় ট্র্যাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থায়। স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালে জরিমানা করা গেলেও আইন মানতে বাধ্য করানো যায় কি? ট্র্যাফিক বিভাগের এক কর্তা বললেন, ‘‘রাতে পর্যাপ্ত পুলিশকর্মী রেখেই ডিউটি ভাগ হয়েছে। এর পরেও খামতি রয়েছে কিনা, দেখা হচ্ছে।’’
কখনও হাইট বারে লেগে লরির মাথায় বসা তরুণের মৃত্যুর পরে, কখনও চলন্ত গাড়িতে তরুণীকে জোর করে তুলে ধর্ষণের ঘটনার পরে, কখনও বা ট্র্যাফিক-বিধি ভেঙে ফুটপাতে লরি উঠে ঘুমন্ত কয়েক জনকে পিষে দেওয়ার পরে প্রশ্ন ওঠে, পুলিশ কোথায় ছিল? জরুরি সময়ে রাস্তায় কেন পুলিশকে দেখা যায় না? এ বছর তিন বার নগরপাল বদলানো হয়েছে। ৩০ জানুয়ারি মনোজ বর্মাকে বদলে সুপ্রতিম সরকারকে নগরপাল করেছিল প্রাক্তন সরকার। সুপ্রতিম শহরের রাস্তায়, বিশেষ করে, রাতে পুলিশকর্মীদের যাতে দেখতে পাওয়া যায়, তা নিশ্চিত করতে বলেন। রাতে পুলিশের একাধিক ডিভিশনের অফিসে হাজির হয়ে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা শুরু করেন। রাতে মেয়েদের নিরাপত্তায় মহিলা পুলিশ পরিচালিত ‘পিঙ্ক বুথ’ তৈরি করা হয়। সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত সেই বুথ খোলা থাকার কথা। এর সঙ্গেই মেয়েদের নিরাপত্তায় রাতের শহরে নজরদারি চালাতে চালু হয় নজরদারির গাড়ি ‘শাইনিং’। গত মার্চে সুপ্রতিমকে সরিয়ে দেয় নির্বাচন কমিশন। নয়া নগরপাল হন অজয়কুমার নন্দ। তিনিও রাতে নাকা তল্লাশি চালানো এবং নজরদারিতে জোর দেওয়ার কথা বলেন। প্রতিটি ট্র্যাফিক গার্ডে রাতে তিন জন অফিসারের সঙ্গে কনস্টেবল রাখার নির্দেশ নতুন করে দেওয়া হয়। থানাতেও রাতে পর্যাপ্ত পুলিশকর্মী রাখতে বলা হয়।
কিন্তু বুধবার রাত সাড়ে ১১টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত শহরে ঘুরে দেখা গেল, কোথাওই পিঙ্ক বুথ চালু নেই। শ্যামবাজারের পিঙ্ক বুথ তালাবন্ধ। গড়িয়াহাটেও একই অবস্থা। বাবুঘাট, হেস্টিংস, আলিপুর হয়ে গড়িয়াহাট যাওয়ার রাস্তায় চোখে পড়েনি মহিলাদের সুরক্ষায় নজরদারির কোনও গাড়ি। কালীঘাট, হাজরা মোড় সংলগ্ন এলাকায় শুধু গার্ডরেল বসিয়েই গতি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা হয়েছে। এসএসকেএম হাসপাতাল হয়ে নন্দনের কাছে ট্র্যাফিক-বিধি ভেঙে এগোতে গিয়ে একটি গাড়ি ও বাইকের মুখোমুখি সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়। কোনও মতে সামলে বাইক আরোহী বলেন, ‘‘রাতে অত নিয়ম কেউ মানে না।’’ পার্ক সার্কাসে হেলমেটহীন বাইক আরোহীর যাতায়াত ছিল চোখে পড়ার মতো। এমনই এক আরোহী বললেন, ‘‘রাতে পুলিশ বিশেষ নজর দেয় না। পাড়া সামনেই। সমস্যা হলে লোক নিয়ে এসে মিটমাট করে নেব।’’ একই দাবি বাইপাসের পঞ্চান্নগ্রাম মোড়ের কাছে এক অ্যাপ-ক্যাব চালকের। একাধিক সিগন্যাল ভাঙার পরে একটি লরিকে কার্যত ঘষে দিয়ে বেরোনোর সময়ে লরিচালকের সঙ্গে বচসা শুরু হয়। ক্যাবচালক বললেন, ‘‘পুলিশ ধরলে কেস করে দিতে বলতাম। টাকা মালিক দেবে। রাতে অত অপেক্ষার ধৈর্য থাকে না।’’ রাসবিহারী অ্যাভিনিউ ধরে মাঝ রাতে হেঁটে চলা দুই মহিলা আবার বললেন, ‘‘ইডেনে খেলা দেখে ফিরছি। পুলিশ তো নেই-ই, বাইকগুলো যে ভাবে যাচ্ছে, ভয়ই করছে।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)