বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে এক হারিয়ে যাওয়া ‘সিঙ্গল স্ক্রিন’ সিনেমাহল। কিন্তু সেই মায়া কাটিয়ে ভিতরে পা রাখলেই আপনি সরাসরি পৌঁছে যাবেন আস্ত এক শুটিং ফ্লোরে! চারিদিকে আলো আর ক্যামেরার সাজ-সাজ রব। মনে হবে, পরিচালক এখনই হয়তো বলে উঠবেন ‘অ্যাকশন!’, আর মেক-আপ রুম থেকে বেরিয়ে অভিনেতারা বলে উঠবেন তাঁদের সংলাপ। কলকাতা আন্তর্জাতিক পুস্তকমেলায় এমনই এক অভিনব চমক অপেক্ষা করছে দর্শকদের জন্য।
আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত, মেলার পুরো সময় জুড়ে এই পরিসরটিতে চলবে ‘বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস ও মহানায়ক’ শীর্ষক এক বিশেষ প্রদর্শনী। বাংলা চলচ্চিত্রের গৌরবময় ইতিহাস তুলে ধরার প্রয়াস করেছেন প্রদর্শনীর কিউরেটর জ্যোতির্ময় ভট্টাচার্য। এক দিকে নির্বাক যুগের সাদা-কালো অধ্যায় থেকে আজকের বাংলার চলচ্চিত্রজগতের দীর্ঘ বিবর্তনের দলিল, অন্য দিকে ‘অরুণকুমার’ থেকে বাঙালির হৃৎস্পন্দন ‘উত্তমকুমার’ হয়ে ওঠার লড়াই আর উত্তরণের সমান্তরাল ইতিহাস ফুটে উঠবে এই প্রদর্শনীতে।
পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ডই যে এই ইতিহাস তুলে ধরার সবুজ সঙ্কেত দিয়েছে ও সার্বিক সহযোগিতা করেছে, বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রদর্শনীর বিন্যাস, প্রদর্শ-নির্বাচন ও তার তত্ত্বাবধানের কাজ করেছে জ্যোতির্ময়ের শিল্প-চর্চা সংস্থা ‘আর্ট অলিন্দ’ ও কলকাতার সংগ্রাহক-দল ‘কলকাতা কথকতা’। দর্শকেরা ঘুরে আসবেন যেন অতীতের স্বর্ণসময়ে: ইতিহাসকে শুধু জানা নয়, ছুঁয়ে দেখারও সুযোগ পাবেন তাঁরা। কাছ থেকে দেখা যাবে পুরনো দিনের বায়োস্কোপ (মাঝের ছবি)। ষাটের দশকে সুপার-এইট ফিল্ম প্রোজেক্টরের সিনেমাবাক্সে ছবি দেখার বিরল অভিজ্ঞতা ফিরে আসবে, নস্টালজিয়া উস্কে দেবে হীরক রাজার দেশে ছবির দোতারা, শতরঞ্জ কে খিলাড়ি-র নানা ‘প্রপ’। বাংলা সিনেমার মাইলফলক বিভিন্ন ছবির দুষ্প্রাপ্য লবি কার্ড, টিকিট আর পোস্টার— অনন্য সফর।
প্রদর্শনীর কেন্দ্রে অবশ্যই মহানায়ক উত্তমকুমার। তাঁর শিল্পীজীবনের এমন অনেক স্থিরচিত্র এখানে প্রদর্শিত হবে যা আগে জনসমক্ষে আসেনি। দর্শকদের নজর কাড়বে সত্যজিৎ রায়ের নায়ক ছবিতে তাঁর পরিহিত স্যুটটিও। উত্তমকুমারের শতবর্ষ উদ্যাপনের অঙ্গ হিসেবে প্রকাশিত হতে চলেছে বই দ্য গোল্ডেন বুক অব উত্তমকুমার— প্রচারের আলোর বাইরের, আটপৌরে উত্তমও তার পাতায় ধরা। সহকর্মী, আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে প্রযোজনা ও শুটিংয়ের সহকারীদের স্মৃতিচারণায় উঠে আসবে মহানায়কের অজানা নানা গল্প। জানা যাবে— কী ভাবে তিনি রোজ নিষ্ঠার সঙ্গে চণ্ডীপাঠ করে জিভের জড়তা কাটাতেন, বা কতটা আন্তরিক ছিলেন সেটের সাধারণ কর্মীদের প্রতি। ছবিতে শুটিং ফ্লোরে উত্তমকুমার, আর্ট অলিন্দের সংগ্রহ থেকে।
জন্মদিনে
আজাদ হিন্দ সরকারের প্রধান হিসেবে ১৯৪৩-এর নভেম্বর মাসে ফিলিপিন্সের রাজধানী ম্যানিলায় এসে পৌঁছান নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। সে দেশের রাষ্ট্রপতি হোসে লরেল তাঁকে ৩৫ কোটি ভারতবাসীর নেতা হিসেবে বরণ করে নেন। এ বছর ২৩ জানুয়ারি, নেতাজির ১২৯তম জন্মদিনে সকাল সাড়ে ১০টায় নেতাজি ভবনে হোসে লরেল ও সুভাষচন্দ্র বসুর এশিয়া-চিন্তা নিয়ে বক্তৃতা দেবেন ফিলিপিনা ইতিহাসবিদ নিকোল এবয়টিজ়। একশো বছর আগে সুভাষচন্দ্র তাঁর জন্মদিন কাটিয়েছিলেন মান্দালয় জেলে বন্দি হিসেবে। নেতাজি রিসার্চ ব্যুরোর মহাফেজখানায় সযত্নে রক্ষিত, সুভাষচন্দ্রের নিজ হাতে লেখা জেলের চিঠি ও নোটবইয়ের ছবি দেখিয়ে সে বিষয়ে বলবেন সুগত বসু: প্রথমেই থাকবে ১৯২৬-এর ২৩ জানুয়ারি বাসন্তী দেবী ও শরৎচন্দ্র বসুকে বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা সুভাষচন্দ্রের দু’টি অপূর্ব চিঠি (ছবিতে প্রথম চিঠিটি)। প্রকাশিত হবে সুগত বসু সম্পাদিত নেতাজির তরুণের স্বপ্ন বইয়ের নতুন প্রামাণ্য সংস্করণ।
দুই মনীষী
শ্রীঅরবিন্দ ও রবীন্দ্রনাথ, দুই মনীষীর জীবনাদর্শে সাদৃশ্য অনেক। অনন্য তাঁদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাও। তার প্রকাশ ঘটেছে নানা উক্তিতে, রচনায়। শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ গড়ে তুলেছিলেন শিক্ষায়তন: ছাত্ররা সেখানে জীবনের পাঠ পাবে প্রকৃতির স্পর্শে, এই ছিল লক্ষ্য। আর মুক্তিসংগ্রামে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী অরবিন্দ ঘোষ উত্তরকালে তাঁর সাধনক্ষেত্র গড়ে তোলেন পুদুচেরিতে। দুই-ই সাধনা, দু’রকম। এই আত্মিক বন্ধন স্মরণে শ্রীঅরবিন্দ ভবন ও ভাবনা-র যৌথ উদ্যোগে ‘প্রেমে পূজায় মুক্তিসংগ্রামে শ্রীঅরবিন্দ ও রবীন্দ্রনাথ’ আলেখ্য হয়ে গেল গতকাল শ্রীঅরবিন্দ ভবনে: বিজয়লক্ষ্মী বর্মণ, সৌমী-শ্রুতির পাঠে-গানে।
সুবর্ণযাত্রায়
১৯৭৬-এর ১৬ জানুয়ারি ঊষা গঙ্গোপাধ্যায় তৈরি করেন রঙ্গকর্মী। পঞ্চাশ পূর্ণ করছে এই নাটকের দল। বিপুল দর্শক-সমাদৃত তাদের নানা নাটক: কোর্ট মার্শাল, রুদালি, চণ্ডালিকা, অন্তর্যাত্রা, বদনাম মান্টো, মাইয়াৎ, লোক কথা। পুরোধার দেখানো পথে চলছে এই প্রজন্মের পথ চলা: চলছে নাট্যপ্রযোজনা, কর্মশালা। দলের প্রতিষ্ঠাদিবস ও সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপনে ১৬ জানুয়ারি থেকে পাঁচ দিনের উৎসব শুরু হল গতকাল। আজ দুপুর ৩টেয় অ্যাকাডেমিতে বিডন স্ট্রিট শুভম-এর হ-য-ব-র-ল, সন্ধেয় অনিরুদ্ধ সরকারের নির্দেশনায় রঙ্গকর্মী-র চন্দা বেদনি। রবিবার বিকেল ৫টায় রঙ্গকর্মী স্টুডিয়ো থিয়েটারে পলি ও দেবকুমার পালের মাইম, পরে রঙ্গকর্মী-র নাটক অভি রাত বাকি হ্যায়; ১৯-২০ এখানেই বিকেল ৫টায় আধে আধুরে ও পশমিনা, পরে গান।
বিশ্বের সুর
আগের তিন বছরে শহর দেখেছিল বাংলা ও ভারতের সঙ্গীতশিল্পীদের সুর-সম্মিলন। চতুর্থ বছরে ‘টালা প্রত্যয়’-এর ‘মিউজ়িক ইন আ পার্ক’ ভাবনার তারিফ করতে হয়, কলকাতায় বিশ্বসঙ্গীতের মূর্ছনা উপহার দিতে চলেছে তারা। আগামী ২১ জানুয়ারি বুধবার সন্ধে ৬টায় এ বছরের অনুষ্ঠান টালা প্রত্যয় প্রাঙ্গণে; কাজ়াখস্তানের সিম্ফনি অর্কেস্ট্রার রসাস্বাদন করবেন শহরবাসী। আবজ়াল মুখিতদিন-এর পরিচালনায় আস্তানা ফিলহারমনিক সিম্ফনি অর্কেস্ট্রা ঘুরেছে নানা দেশ; এ দিন দেশীয়, ধ্রুপদী ও সমসাময়িক সঙ্গীত শোনাবেন অর্কেস্ট্রার শিল্পীরা। সঙ্গে বড় প্রাপ্তি ফিলহারমনিক-এর মধ্যমণি, কাজ়াখ ডান্স-অঁসম্বল ‘গাক্কু’-র ব্যালে। পণ্ডিত তন্ময় বসু এল সুব্রহ্মণ্যম কবিতা কৃষ্ণমূর্তির মতো শিল্পীদের গায়ন-বাদন মিলবে ওঁদের সুরে।
মাঘোৎসব
এমন এক মিলনমন্দিরের কথা ভেবেছিলেন রামমোহন রায়, যেখানে সকলে এক নিরাকার পরমেশ্বরের আরাধনা করবেন। ১৮৩০-এর ৮ জানুয়ারি ন্যাসপত্রে ঘোষণা হয়, এই সমাজ থেকে প্রার্থনায় বা সঙ্গীতে কোনও ধর্ম বা জাতির বিপক্ষে বিদ্রুপ বা কটু মন্তব্য করা যাবে না; শুধু নিরাকার পরব্রহ্মের উপাসনা হবে; সব ধর্মসম্প্রদায়ের মধ্যে প্রেম, ভক্তি, দয়া ও সব মানুষের ঐক্যবন্ধন হয়, তেমন উপদেশ ও সঙ্গীত হবে। সে বছর ১১ মাঘ চিৎপুর রোডে গড়ে ওঠে ব্রাহ্ম সমাজ। ব্রহ্ম মন্দির স্থাপনা ঘিরেই মাঘোৎসবেরও শুরু, প্রতি বছর নানা ব্রাহ্ম সমাজে যা অনুষ্ঠিত হয়ে এসেছে। ২১১ বিধান সরণির সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজ প্রার্থনাগৃহে ১৯৬তম মাঘোৎসব ১৮ জানুয়ারি, চলবে ২৮ পর্যন্ত: ব্রহ্মোপাসনা, ব্রহ্মসঙ্গীত, বৃন্দগান, গ্রন্থ প্রকাশ, আলোচনা, সম্মেলন, প্রদর্শনী।
প্রিয়, তাই
হিন্দুস্থান পার্কের বাসিন্দা অভিজিৎ মুখোপাধ্যায় পেশায় গায়ক, ডিজ়াইনার, মুদ্রণকর্মী, কিন্তু ওঁর নেশা— প্রতি বছর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় স্মরণে একটি ক্যালেন্ডার বানানো। ২০২১-এ কোভিডকালে যখন কারও সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ নেই, সেই সময় প্রিয় শিল্পী-অভিনেতা ও ব্যক্তিত্ব সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কিছু ছবি দিয়ে একটি ক্যালেন্ডার তৈরি করেন অভিজিৎ, তার ডিজিটাল রূপ নিমেষে ছড়িয়ে যায় শহর রাজ্য ছাড়িয়ে দেশ-বিদেশে; বহু গুণিজন অভিনন্দন জানান। সেই থেকে প্রতি বছর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে দেওয়াল ও টেবিল-ক্যালেন্ডার তৈরি করছেন তিনি। এ বারে করেছেন দু’টি ক্যালেন্ডার: প্রথম বছরে তৈরি করা ‘মুক্তি’ এবং আরও একটি— দু’টিই সৌমিত্রের জীবন ও সিনেমার নানা স্থিরচিত্রে (ছবি) সাজানো। সঙ্গে নব সংযোজন বাংলার রসশিল্পীদের নিয়েও ক্যালেন্ডার, তুলসী চক্রবর্তী নৃপতি চট্টোপাধ্যায় ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় জহর রায় রবি ঘোষ কিশোরকুমার চিন্ময় রায়, কে নেই সেখানে!
শিল্পযাত্রা
শিল্পের ‘ফর্ম’ কি আকাশ থেকে পড়ে? রোজকার জীবনের ছন্দ থেকেই উঠে আসে তা, জেগে ওঠে শিল্পীর ক্যানভাসে, টেরাকোটা-কৃতিতে, ড্রয়িংয়ে। জীবনের অস্তিত্বে পাশাপাশি থাকে যে আনন্দ আর সংগ্রাম, তা ফুটিয়ে তোলাই শিল্পীর কাজ, বিশ্বাস করেন ঠাকুরানন্দ পাল। বিশ্বভারতী কলাভবনের প্রাক্তনী, বর্ধমানের একটি শিল্প-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এই শিল্পীর একক প্রদর্শনী এর আগে হয়েছে ২০০২ ও ২০০৯-এ। সতেরো বছর পর আবারও, অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের নিউ সাউথ গ্যালারিতে গত ১৫ জানুয়ারি গুণিজন-উপস্থিতিতে শুরু হয়েছে তাঁর একক প্রদর্শনী, ‘পোয়েটিক ডেলিবারেশন’— টেরাকোটা, ভাস্কর্য ও বিভিন্ন মাধ্যমে আঁকা চিত্রকৃতির সম্ভার। উপরের ছবিতে তারই একটি, ‘লাইফ অ্যান্ড ডেথ ব্যাটল-১’। ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত, রোজ ১২টা-৮টা।
জীবনের ছবি
ভিন্নধারার চলচ্চিত্র উৎসব ‘কলকাতা পিপল’স ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’ এ বার বারো বছরে। ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার জীবন-যন্ত্রণা নিয়ে রাজনৈতিক তথ্যচিত্র ও কাহিনিচিত্রের সম্ভার। মোট ৩৯টি ছবি: অভিবাসী শ্রমিক জীবন, সামাজিক আন্দোলন, সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ, শ্রেণি-লিঙ্গ-জাতিগত সংগ্রাম, আড়ালে চলে যাওয়া ইতিহাস। নেপালের লামা’স সন, মহারাষ্ট্রে আত্মহত্যা করা কৃষকদের পরিবার ঘিরে মার্চিং ইন দ্য ডার্ক, উত্তরপ্রদেশে এনকাউন্টার কিলিংয়ের শিকার যুবকদের নিয়ে এনকাউন্টারিং হেট, ভিন্নধারার ইউটিউবারদের জীবন নিয়ে গোলা ড্রিমস, দক্ষিণ কোরিয়ার অভিবাসী শ্রমিকদের বাস্তবতা তুলে ধরা ড্রেনড বাই ড্রিমস, যুদ্ধবিরোধী টু কিল আ ওয়ার মেশিন; উদ্বোধনী ছবি মায়ানমার রেজ়িস্ট্যান্স। পাশাপাশি পরিচালকদের সঙ্গে আলোচনা, অনলাইন কর্মশালাও হবে। উৎসব উত্তম মঞ্চে আগামী ২৩-২৬ জানুয়ারি, সকাল ১০টা-রাত ৯টা।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)