উৎসবের মরসুমে বাজি বাজারের ছাড়পত্র দিয়েছে সরকার। অতীতের সাত দিনের বদলে চলতি বছরে মাসখানেক ধরে প্রতিটি জেলায় একটি করে বাজি বাজার বসানো যাবে বলেও জানানো হয়েছে। বাজি ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, সেই সঙ্গে এমন বাজারে বাজি মজুত রাখার
ঊর্ধ্বসীমাও বেড়েছে। যা নিয়ে আতঙ্কিত সাধারণ নাগরিক থেকে পরিবেশকর্মীদের একটা বড় অংশ। তাঁদের প্রশ্ন, একের পর এক বিস্ফোরণে মৃত্যুর পরেও সরকার এমন ছাড়পত্র দেয় কী করে? তবে শুধু বাজার বসার ক্ষেত্রেই নয়, এ বার কলকাতায় বাজি মজুত রাখার বিষয়েও ছাড়পত্র দেওয়ার পথে প্রশাসন।
কিছু দিন আগেই বড়বাজারের বাজি ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে সাপ বাজি,
ফুলঝুরি এবং বন্দুকে ফাটানো ক্যাপের জন্য ছাড়পত্র চেয়ে আবেদন করার পরিকল্পনা করা হয়। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই ‘সারা বাংলা আতশবাজি উন্নয়ন সমিতি’র তরফে রাজ্যের মুখ্যসচিব হরিকৃষ্ণ দ্বিবেদীর দফতরে একটি আবেদনপত্র পাঠানো হয় গত ৫ সেপ্টেম্বর। এর পরে গত ১২ সেপ্টেম্বর ‘মাইক্রো, স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজেস অ্যান্ড টেক্সটাইলস’ (এমএসএমই) দফতর থেকে একটি নির্দেশিকা জারি করা হয়। তাতে রাজ্য
পুলিশের ডিজি, কলকাতার নগরপাল এবং জেলাশাসকদের যথাযথ পদক্ষেপ করতে বলা হয়েছে। সারা বাংলা আতশবাজি উন্নয়ন সমিতির আবেদনে দাবি করা হয়েছিল, বিস্ফোরক আইন অনুযায়ী, ১০০ কিলোগ্রাম পর্যন্ত সাপবাজি, ফুলঝুরি বা বন্দুকে ফাটানোর ক্যাপ নিয়ে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে অনুমতির প্রয়োজন হয় না। আবেদনপত্রে লেখা হয়— ‘দোকানে মজুত রাখা বা বিক্রির জন্য এগুলি যে হেতু কম ক্ষতিকর, তাই আইন অনুযায়ী এই ধরনের বাজিতে বেশ কিছু ছাড় রয়েছে। মূলত রাখিপূর্ণিমার পর থেকে দুর্গাপুজোর মধ্যে এই
ধরনের বাজি বিক্রি হয়। কালীপুজোর সময়ে অন্য বাজির ব্যবসা শুরু হয়ে যাওয়ায় এই বাজির তেমন কদর থাকে না। কিন্তু এই মুহূর্তে নিষিদ্ধ বাজির সঙ্গে এগুলির ক্ষেত্রেও ধরপাকড় চালানো হচ্ছে। কিন্তু আইনের পথে এই কম ক্ষতিকর বাজির যে ছাড় পাওয়ার কথা, সেটা দেওয়া হোক।’ লকডাউনের সময় থেকে ‘আইসিইউ’-তে থাকা বাজির ব্যবসায়
সাহায্য করারও অনুরোধও জানানো হয়েছে।
আপাতত এই নিয়েই বিড়ম্বনায় কলকাতা পুলিশ। কারণ, গত কয়েক বছর ধরেই শহরে মজুত করে রাখা বাজির উপরে কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে। বজবজ, এগরা, মালদহ এবং দত্তপুকুরের মতো জায়গায় একের পর এক বিস্ফোরণের জেরে যে নজরদারি আরও বেড়েছে। এমনকি, পুলিশের তরফে দফায় দফায় লালবাজারে ডেকে বাজি ব্যবসায়ীদের এ বিষয়ে সতর্কও করা হয়েছে।
পুলিশের এক কর্তা বলেন, ‘‘শহরে বাজি মজুত রাখার বিষয়ে এত দিন কড়া হাতে সব সামলানো হয়েছে। এই কারণেই নজরদারির সুবিধার জন্য ১৯৯৯ সাল থেকে দফায় দফায় সরকারি উদ্যোগে বৈধ বাজি বাজার বসানো হচ্ছে। শহরে একমাত্র সেখানেই বাজি বিক্রির অনুমতি রয়েছে। অর্থাৎ শহরের বাকি সব জায়গায় বাজি বিক্রিই নিষিদ্ধ। সেখানে এমন অনুমতি দেওয়া যায় কী ভাবে?’’
পুলিশ সূত্রের খবর, এই পরিস্থিতিতে লালবাজারের তরফে আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করা হচ্ছে। তাতে পুলিশ দেখেছে, সারা বছর যে সমস্ত দোকান থেকে বাজি বিক্রি হয়, শুধু সেই দোকানের ক্ষেত্রে এই আইন কার্যকর হয়। একই দোকানে ঘুড়ি, বাজি ও প্লাস্টিকের জিনিস একসঙ্গে পাওয়া যায়— বড়বাজারের মতো ঘিঞ্জি এলাকায় এমন দোকানের ক্ষেত্রে এটা কার্যকর নয়। এ ছাড়া বাজি বিক্রি করতে দমকল এবং পুলিশের অনুমতি লাগে। সে ক্ষেত্রে পাঁচ কিলোগ্রামের বেশি পরিমাণ বাজি বিক্রি করতে হলে দমকলের অনুমতি নিতে হয়। সূত্রের খবর, এই পথেই শহরে বাজি মজুত এবং বিক্রির ক্ষেত্রে আরও এক বার কড়াকড়ি করতে চাইছে লালবাজার।
‘সারা বাংলা আতশবাজি উন্নয়ন সমিতি’-র চেয়ারম্যান বাবলা রায় যদিও বললেন, ‘‘সব কিছুকে বাঁকা চোখে দেখলে মুশকিল। পুজোর আগে বাজির সঙ্গে বহু মানুষের রুটিরুজি জড়িয়ে আছে, এটা ভেবে পুলিশ কাজ করলে ভাল হয়।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)