এমনটা হতে চলেছে, তা বোঝা যায়নি খসড়া তালিকা প্রকাশের সময়েও। খোদ মুখ্যমন্ত্রীর কেন্দ্র বলে পরিচিত কলকাতার পাঁচমিশেলি এলাকা ভবানীপুরে ২০০২-এর তালিকার সঙ্গে যোগসূত্রহীন ১২ শতাংশ ভোটারের খোঁজ মিলেছিল। কিন্তু তা প্রধানত স্থানান্তরিত বা অনুপস্থিত ভোটারদের জন্য। আলাদা করে কোনও গোষ্ঠীকে নিশানা করা হচ্ছে বলে তখন মনে হয়নি।
ছবিটা পাল্টে গিয়েছে, চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পরে। মাত্র ২০ শতাংশ মুসলিম ভোটারের কেন্দ্র ভবানীপুরে বিবেচনাধীনের তালিকা দেখে অনেকেরই চোখ কপালে উঠেছে। দেখা যাচ্ছে, ওই কেন্দ্রের বিবেচনাধীন তালিকার ৫৬.৬৫ শতাংশই মুসলিম ভোটার। ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া এবং বিবেচনাধীন মিলিয়ে যে তালিকা, তার ৪৯.৪৫ শতাংশই মুসলিম বলে দেখা যাচ্ছে। সামাজিক ন্যায় সংক্রান্ত গবেষণা সংস্থা সবর ইনস্টিটিউটের তরফে সাবির আহমেদ, অশীন চক্রবর্তী এবং সৌপ্তিক হালদার ভবানীপুরের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা বিশ্লেষণ করেন। তাতেই মুসলিম ভোটারদের অন্তত ২৩.৫ শতাংশই বিবেচনাধীন তালিকায় দেখা যাচ্ছে।
মোট ভোটার তালিকায় মুসলিম, অ-মুসলিম অনুপাতের সঙ্গে বিবেচনাধীন এবং বাদ পড়া ভোটার তালিকায় মুসলিম, অ-মুসলিম অনুপাতের বৈষম্য অনেকেরই চোখে লাগছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক শুভময় মৈত্র বলছেন, ‘‘দু’টি অনুপাতের হেরফের স্বাভাবিক বা সঙ্গতিপূর্ণ কিনা, সেটা পরের কথা। কিন্তু রাশিবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টা তাৎপর্যপূর্ণ।’’ খোদ মুখ্যমন্ত্রীর কেন্দ্রে নাম বাদ দেওয়া বা বিবেচনাধীন রাখার এমন বিন্যাসে শাসকদলের অন্দরেও ঠারেঠোরে চর্চা চলছে। ভবানীপুর কেন্দ্রে নানা ভাষাভাষীর বাস। এর মধ্যে গুজরাতি এবং জৈন ধর্মাবলম্বীদের একাংশ বরাবরের বিজেপি-ঘনিষ্ঠ বলেও দাবি। কেন্দ্রটি বিধানসভায় ধারাবাহিক ভাবে তৃণমূল জিতে এলেও বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডে তারা ঠোক্করও খেয়েছে। ২০১৪-র লোকসভা ভোটে দক্ষিণ কলকাতা লোকসভা কেন্দ্রটি তৃণমূল জিতলেও তার অন্তর্গত ভবানীপুর কেন্দ্রে বিজেপিই এগিয়ে ছিল। তৃণমূলের স্থানীয় সূত্র বলছে, এই কেন্দ্রের ওয়ার্ডগুলির মধ্যে ৭৭ এবং ৮২ নম্বর ওয়ার্ড দু’টিই শাসক দলের নিশ্চিন্ত ‘গড়’ বলা যায়। অল্পস্বল্প ভোটে অন্যত্র পিছোলেও এই দু’টি ওয়ার্ডের ব্যবধানই বার বার তৃণমূলের ভবানীপুর জয়ের পথ সুগম করেছে। বিবেচনাধীন ভোটারের তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, এই ৭৭ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটারদের একটা বড় অংশ তাতে ঠাঁই পেয়েছেন।
তৃণমূলের মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তীর কথায়, ‘‘রাজ্য জুড়েই বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-প্রক্রিয়ায় সংখ্যালঘু ভোটার, যাঁরা সাধারণত বিজেপিকে ভোট দেন না বলে মনে করা হয়, তাঁদের নিশানা করা হয়েছে। মুর্শিদাবাদ, মালদহ, দিনাজপুর, দুই ২৪ পরগনার মুসলিম-প্রধান কেন্দ্রগুলির মতো ভবানীপুরের মুসলিম-প্রধান ৭৭ নম্বর ওয়ার্ডও এর মধ্যে রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই সব নথি জমা দেওয়ার পরেও একতরফা অনেকের নাম বাদ পড়েছে বা বিবেচনাধীন রাখা হয়েছে।’’ অনেকেই মনে করছেন, এর ফলে ভবানীপুরের ভোটযুদ্ধ আরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক এবং শাসকের জন্য অপেক্ষাকৃত কঠিন হয়ে উঠবে। শাসক দলের তরফে অবশ্য সরাসরি এই নিয়ে কিছু বলা হয়নি। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরং যে কোনও পরিস্থিতিতে ভবানীপুর জয়ের আশাই মেলে ধরেন।
কিন্তু মুসলিম ভোটারদের একটা বড় অংশ ২০০২-এর ভোটার তালিকার সঙ্গে যোগসূত্র থাকা সত্ত্বেও চূড়ান্ত তালিকায় বাদ পড়া বা বিবেচনাধীন থাকা নিয়ে শাসক দল কী করছে, এই প্রশ্নও নানা মহলে উঠছে। অরূপের দাবি, সুপ্রিম কোর্টে বা রাস্তায় তৃণমূলের লড়াইয়ের জন্যই অনেক নাম পুরোপুরি বাদ দেওয়া যায়নি। তা এখনও বিবেচনাধীন। যদিওকোনও ন্যায্য ভোটার শেষ পর্যন্ত ভোটাধিকার প্রয়োগে বঞ্চিত হলে শাসক দল কী করবে, তার রূপরেখা এখনও স্পষ্ট নয়।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)