E-Paper

খুন করা হয়েছে, শেষ দেখে ছাড়ব

শ্বশুরমশাই থানায় ছুটছেন। কিন্তু শাশুড়িকে জানানো হয়নি। কয়েক দিন আগেই তাঁর হার্টে স্টেন্ট বসেছে। চোখে অস্ত্রোপচার হয়েছে। এই ধাক্কা হয়তো নিতে পারবেন না।

সোনালি দত্ত বন্দ্যোপাধ্যায় (মৃত অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী)

শেষ আপডেট: ২১ মার্চ ২০২৬ ০৭:৫৩
বেসমেন্টের ঘটনাস্থল। তালার জন্যই বেরোনো যায়নি।

বেসমেন্টের ঘটনাস্থল। তালার জন্যই বেরোনো যায়নি। — নিজস্ব চিত্র।

হঠাৎ লিফ্‌টটা উঠতে শুরু করল উপরের দিকে। দরজায় আটকে গেলেন আমার স্বামী। আমি আর ছেলে পড়ে গেলাম লিফ্‌টের নীচের গর্তে। চারদিকে অন্ধকার। উপর থেকে স্বামীর রক্তের ফোঁটা পড়ছিল আমার গায়েই।

এর পরে লিফ্‌টটা আর একটু উপরে উঠতেই উনি ধপ করে এসে পড়েন আমার গায়ে। আমি আর ছেলে তখনও সাহায্যের জন্য প্রাণপণে চিৎকার করে চলেছি। ওই অবস্থায় কত ক্ষণ আটকে ছিলাম, হিসাব নেই।

১৯ মার্চ আমার স্বামী অরূপের জন্মদিন। সেটাই ওঁকে হারানোর দিন হয়ে গেল। ওঁর ৪০তম জন্মদিনের রাতটা দুঃস্বপ্নের রাত হয়ে থাকল আমাদের ছেলে আরুষ আর আমার জীবনে। লিফ্‌টের মধ্যে আটকে থাকা অবস্থায় প্রায় দু’ঘণ্টা ধরে চিৎকার করে গেলেও আমরা সাহায্য পাইনি। বেসমেন্টে লিফ্‌টের দরজা এক বার খুলে যাওয়ার পরেও আমরা বেরিয়ে আসতে পারিনি। কারণ, লিফ্‌টের দরজার বাইরে লোহার গ্রিলে তালা দেওয়া ছিল। চিৎকার করে গেলেও কেউ চাবি নিয়ে আসতে পারেননি। শুনলাম, লিফ্‌ট বিকল হওয়ায় ভয়ে নাকি আমার স্বামীর হার্ট অ্যাটাক হয়েছে বলে হাসপাতালের তরফে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। আমি বলছি, আমার স্বামীকে খুন করা হয়েছে। কেন এমন যান্ত্রিক গোলযোগ থাকা লিফ্‌ট চালানো হচ্ছে? কেন কোনও লিফ্‌টম্যান ছিলেন না? শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে দেখার পরেও কেন মৃত্যুর অন্য কারণ বলা হচ্ছে?

তিন বছরের আরুষ আমাদের একমাত্র সন্তান। পদার্থ বিজ্ঞানে মাস্টার্স এবং বিএড করার পরে এখন চাকরির পরীক্ষা দিচ্ছি। আপাতত আমরা দু’জনেই দক্ষিণ দমদম পুরসভার অস্থায়ী কর্মী হিসেবে কাজ করি। বাবার জন্মদিনে আরুষের আনন্দই ছিল সবচেয়ে বেশি। আগের রাতে কেক কাটা হয়েছে। কিন্তু হঠাৎ খেলতে খেলতে পড়ে ডান হাত ভাঙে ওর। পায়েসের বাটি ফেলে রেখে আমরা ছেলেকে নিয়ে আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ছুটি।

ডাক্তার বললেন, আরুষের অস্ত্রোপচার করতে হবে। ট্রমা কেয়ার বিল্ডিংয়ের একতলায় অপেক্ষা করার সময়ে শৌচাগারে যেতে চায় আরুষ। শৌচাগার খোঁজার জন্য ছেলেকে নিয়ে আমি আর ওর বাবা লিফ্‌টে উঠি। লিফ্‌টটা আমাদের নিয়ে অত্যন্ত জোরে এক বার উপরের দিকে, এক বার নীচের দিকে যেতে থাকে। এক সময়ে লিফ্‌ট বেসমেন্টে গিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। দরজাও খুলে যায়। কোনও মতে বেরিয়ে পড়তে পারব ভেবে এগোতে গিয়ে দেখি, সামনে লোহার গ্রিলে তালা ঝুলছে। লিফ্‌টের দরজা এবং ওই লোহার গ্রিলের মাঝের অংশে দাঁড়িয়ে আমরা সাহায্যের জন্য চিৎকার করতে থাকি। কিন্তু কারও সাড়া মেলেনি। প্রায় ২০ মিনিট ওই অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকার পরে হঠাৎই লিফ্‌টের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। আমার স্বামী দরজায় আটকে পড়েন। সেই অবস্থাতেই লিফ্‌ট উপরের দিকে উঠতে শুরু করে। আমি আর ছেলে লিফ্‌টের নীচে গর্তে পড়ে যাই। ছেলেকে কোনওমতে বেসমেন্টের ওই গ্রিল আর লিফ্‌টের দরজার ফাঁকা জায়গায় তুলে দাঁড় করিয়ে দিই। ভয়ে আমরা দু’জনেই তখন চেঁচাচ্ছি। ভাঙা হাত নিয়ে ছেলে কাঁদছে। উপর থেকে তখন স্বামীর রক্ত ঝরে পড়ছে আমার গায়ে। লিফ্‌ট আর একটু উপরে উঠতেই সেটির দরজা আর সিমেন্টের অংশে ধাক্কা খেয়ে আমার স্বামী আমার গায়ে এসে পড়েন। তিনি তখনও বেঁচে। চিৎকার করতে থাকি ওঁকে বাঁচানোর জন্য। কিন্তু কেউ সাহায্য করতে পারেননি।

রাতভর এই অভিজ্ঞতার পরে শুক্রবার সকালে আমার ছেলের অস্ত্রোপচার হয়েছে। ও এতটাই ভয় পেয়ে রয়েছে যে, আমাকে ছাড়া থাকছেই না। আমার শ্বশুরমশাই থানায় ছুটছেন। কিন্তু শাশুড়িকে জানানো হয়নি। কয়েক দিন আগেই তাঁর হার্টে স্টেন্ট বসেছে। চোখে অস্ত্রোপচার হয়েছে। এই ধাক্কা হয়তো নিতে পারবেন না। কিন্তু আমি এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে বলছি, এর শেষ দেখে ছাড়ব।

(অনুলিখন: নীলোৎপল বিশ্বাস)

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

RG Kar Case rg kar hospital

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy