Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২০ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

সকাল-বিকেল দুই কাণ্ড, হাওড়ায় হট্টগোল

নিজস্ব সংবাদদাতা
০৪ জুলাই ২০১৫ ০০:৩৮
দুপুর পৌনে ১টা। নজর উঁচু, নজর নিচু! গঙ্গায় ‘ঝাঁপ’ দিয়ে তলিয়ে গিয়েছেন এক যুবক। তখন চলছে তাঁর খোঁজ।

দুপুর পৌনে ১টা। নজর উঁচু, নজর নিচু! গঙ্গায় ‘ঝাঁপ’ দিয়ে তলিয়ে গিয়েছেন এক যুবক। তখন চলছে তাঁর খোঁজ।

বিকেল সাড়ে তিনটে। আচমকা দেখা গেল হাওড়া সেতুর মাথায় উঠে হাঁটছেন-দৌড়চ্ছেন এক যুবক। আর তাঁকে নামাতে গিয়ে যেমন হিমশিম খেল পুলিশ, তেমনি তাঁকে দেখার হুজুগে কার্যত স্তব্ধ হয়ে গেল ব্যস্ত হাওড়া সেতু। কেউ গাড়ি থামিয়ে জানলা থেকে মুখ বার করে দাঁড়িয়ে পড়লেন, কেউ মোটরবাইক দাঁড় করিয়ে মোবাইলে বন্দি করতে চাইলেন সেতুর মাথায় ওঠা যুবককে।

শুরুটা হয়েছিল শুক্রবার সকাল থেকেই। সেতুর রেলিংয়ে উঠে জলে ঝাঁপ দেন এক যুবক। প্রায় দেড় ঘণ্টা তাঁর খোঁজে তল্লাশি চলে গঙ্গায়। আর পুলিশের সেই কার্যকলাপ দেখতে সেতুর ফুটপাথে নামে মানুষের ঢল। পুলিশ জানায়, বড়বাজারের বাসিন্দা ওই যুবকের নাম মহম্মদ সামশাদ। পেশায় দর্জি ওই যুবক ঝাঁপ দেওয়ার আগে মোবাইল ও চটি খুলে রেখেছিলেন সেতুর ফুটপাথে। রাত পর্যন্ত তাঁর খোঁজ মেলেনি।

সব মিলিয়ে শুক্রবার সারা দিন ঘটনাবহুল ছিল হাওড়া সেতু।

Advertisement

পুলিশ সূত্রে খবর, এ দিন বিকেলে সেতুতে কর্তব্যরত পুলিশকর্মীরা আচমকা দেখেন, সেতুর মাঝে কাঠামোয় বসে পা দোলাচ্ছেন সাদা জামা-ধূসর প্যান্ট পরা উস্কোখুস্কো চুলের এক যুবক। নীচ থেকে ‘রে-রে’ করে উঠতেই খ্যাক খ্যাক করে হেসে কাঠামোর উপর দিয়ে দৌড়তে শুরু করলেন যুবক। খবর যায় কলকাতা পুলিশের সদর দফতরে। বিকেল চারটে নাগাদ পুলিশবাহিনী, দমকলের দু’টি ইঞ্জিন ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। কিন্তু কেউই ওই যুবককে আয়ত্তে আনতে পারেননি। ইতিমধ্যে সেতুর উপরে বিশাল পুলিশবাহিনী ও দমকলের ইঞ্জিন দেখে পথচলতি মানুষ ও যানবাহন থেমে যেতে থাকে। সবাই প্রশ্ন করতে থাকেন ‘কিছু হয়েছে কি?’

ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, যানজট এড়াতে পুলিশকর্মীরা ‘না কিছু হয়নি বলে’ প্রথমে সবাইকে সরিয়ে দেন। কিন্তু পুলিশ, দমকল, সংবাদমাধ্যমকে দেখে সেতুর উপরে কৌতূহলী মানুষের ভিড় জমতে থাকে। প্রথমে ভিড় জমে ফুটপাথে। এর জেরে হেঁটে কলকাতা-হাওড়া যাতায়াত প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ঘটনাস্থলে আসে বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের একটি দল। কিন্তু তাঁরাও ব্যর্থ হন ওই যুবককে নামিয়ে আনতে।



এর মধ্যেই ঘটনাস্থলে আসে বহুতলে উঠতে পটু বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের আর একটি দল। ততক্ষণে অবশ্য হাওড়া সেতু জুড়ে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে যানবাহন। কেউ সেতুর মাঝে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাস্তায় নেমে মোবাইলে ছবি তুলছেন, কেউ বা পাশে দাঁড়ানো ব্যক্তির কাছে জানতে চান ‘কোথা দিয়ে উঠল ছেলেটা?’ ইতিমধ্যেই সেতুর উপর উঠতে শুরু করেছেন বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের কর্মীরা। উপরে তখন হাততালি দিচ্ছেন ওই যুবক। আর নীচে তা দেখে হেসে লুটোপুটি খাচ্ছেন জনতা। ক্রমশ হাওড়া সেতু অবরুদ্ধ হয়ে পড়ছে দেখে লাঠি উঁচিয়ে তেড়ে গেলেন এক দল পুলিশকর্মী। ভয়ে অনেকে গাড়িতে উঠে চম্পট দিলেন। অনেকে হেসে বললেন, ‘‘একটু দেখতে দিন না।’’

তবে গোটা ঘটনায় হাওড়া ও কলকাতা উভয় দিকেই তীব্র যানজট হয়। অফিস ফেরত মানুষেরা বিরক্ত হয়ে পড়েন। ট্রেনের সময় হয়ে যাওয়ায় বাস থেকে নেমে ফুটপাথের ভিড় ঠেলে হাওড়ার দিকে এগোচ্ছিলেন বর্ধমানের বাসিন্দা অনুপম দাস। বললেন, ‘‘আমরাই এ বার পাগল হয়ে যাব।’’ কলকাতার একটি হাসপাতালে যাচ্ছিলেন বালির বাসিন্দা ওষুধ সংস্থার প্রতিনিধি দীপ গোস্বামী। যানজটে আটকে থেকে বললেন, ‘‘মানুষের হুজুগও বটে। এ ভাবে যানজট করে রাখবে। সময়ে না পৌঁছলে তো কাজই হবে না।’’

এ দিকে, সেতুর উপরে উঠে ওই যুবকের সঙ্গে কথা বলে বন্ধুত্ব করে ফেলেন বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের কর্মীরা। গল্পের মাধ্যমে তাঁকে আনা হয় সেতুর মাঝে নিরাপদ জায়গায়। দড়ি দিয়ে হাত-পা বাঁধা হয় তাঁর। এর পরে তাঁকে বেঁধে ফেলা হয় বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের কর্মী সুরজিৎ চক্রবর্তীর লাইফ জ্যাকেটের সঙ্গে। উপর থেকে দড়ি বেয়ে ওই যুবককে নিয়ে নেমে আসেন বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের কর্মীরা। পুলিশ হাজারো বললেও সেতুর তখন জগাখিচুড়ি অবস্থা। পরে পুলিশ জানায়, ওই যুবক মানসিক ভারসাম্যহীন।

এ দিকে নীচে নেমে ওই যুবক হেসে বললেন, ‘‘উপরটা কী ভাল। কত হাওয়া। কেউ নেই। আমার নাম শেখ সেন্টু। কিন্তু আমি এখন শক্তিমান।’’ আর সেই ‘শক্তিমান’ এর কেরামতিতে ততক্ষণে যানজটে ফেঁসে প্রাণ ওষ্ঠাগত হাওড়া সেতুর।

ছবি: দীপঙ্কর মজুমদার।

আরও পড়ুন

Advertisement