Advertisement
E-Paper

বাংলার বুলবুল

দর্জিপাড়ার সেই বাড়িটার দোতলার ঘরে শেষ জীবনে কিছুটা একা থাকতেই ভালবাসতেন তিনি। পছন্দ করতেন একটু নিরিবিলি, শান্ত পরিবেশ। তাঁর সাজগোজে ছিল পরিপাটি শৌখিন ছাপ। সদ্য পাটভাঙা সাদা তাঁতের শাড়ি, হাতে ক’য়ের গাছা সোনার চুড়ি, গলায় মোটা সোনার হার, চোখে মোটা কাচের চশমা...।

বিভূতিসুন্দর ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ২১ জুলাই ২০১৫ ০০:০০

দর্জিপাড়ার সেই বাড়িটার দোতলার ঘরে শেষ জীবনে কিছুটা একা থাকতেই ভালবাসতেন তিনি। পছন্দ করতেন একটু নিরিবিলি, শান্ত পরিবেশ।

তাঁর সাজগোজে ছিল পরিপাটি শৌখিন ছাপ। সদ্য পাটভাঙা সাদা তাঁতের শাড়ি, হাতে ক’য়ের গাছা সোনার চুড়ি, গলায় মোটা সোনার হার, চোখে মোটা কাচের চশমা...।
বিকেলে মাঝে মাঝে বারান্দায় দাঁড়িয়ে উদাস ভাবে এক দৃষ্টে আকাশের দিকে চেয়ে অভিমানী মানুষটা কী যেন ভাবতেন...। কে জানে হয়তো অতীতের সৌরভ মাখা সুখস্মৃতি, জমে থাকা অভিমান কিংবা অজানা কোনও যন্ত্রণার রেশ।
লোকে বলত তিনি নাকি রসিক লোকেদের কানে মধু ঢেলে দিতেন! আর তাঁর গান হয়তো রসিক স্রোতার মন ছুঁয়ে জীবন নদীর ওপারে নিয়ে যেতে পারত। গ্রামোফোনের টার্নটেবলে ঘুরতে থাকা সেই কালো গালার রেকর্ডে যখন শুরু তাঁর গান তখন সে গানের আকুতি কিংবা মদকতা মুগ্ধ করত সব বয়সের শ্রোতাদের। জীবন সায়াহ্নে পৌঁছে অতীতের সেই সব স্মৃতি হয়তো বাংলার বুলবুলের কিছুটা অভিমানী অহংকারী শিল্পীসত্ত্বাকে পুণরায় উস্কে দিত। তাই অন্য কোনও পরিচয় নয়, তিনি চেয়েছিলেন ইতিহাসের পাতায় মিস আঙ্গুরবালা হয়েই বেঁচে থাকতে।
সে কালে মেয়েদের গান গাওয়াটা সমাজ ভাল চোখে দেখত না। সে যুগের পরিপ্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে গান গাওয়াটাকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়াটা ছিল দৃঢ় সাহসী মানসিকতার পরিচয়। গানই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম প্রেম।

১৯০০ সালে (মতান্তরে ১৮৯৬ সালে) আঙ্গুরবালার জন্ম উত্তর কলকাতার কাশীপুরে। বাবার নাম সুধীরকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, মায়ের নাম হরিমতী। ছোটবেলাটা কেটেছিল শ্যামপুকুর অঞ্চলে। তাঁর বাবার দেওয়া নাম প্রভাবতী। ডাক নাম নেড়া। ছোটবেলায় লেখাপড়া শুরু দর্জিপাড়ায় জয়রাম মিত্র স্ট্রিটের একটি মিশনারি স্কুলে। শোনা যায় তিনি মেধাবী ছাত্রী ছিলেন আর সেই জন্যই স্কুলে পেয়েছিলেন ডবল প্রোমোশন। এর পরে হেঁদোর কাছে নরম্যাল স্কুলে ভর্তি হলে সেখানেই চলতে থাকে তাঁর পড়াশুনা। সেখানে ছাত্রবৃত্তির পরীক্ষায় তিনি স্কলারশিপ পেয়েছিলেন।
খুব ছোট বয়স থেকে গানের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল। দর্জিপাড়ার স্কুলে পড়ায় সময় এক দিন আঙ্গুরবালা আর তাঁর বন বিজু, স্কুলে যাওয়ার পথে একটি বাড়ির জানালার সামনে ভিড় দেখে আর গানের গানের আওয়াজ শুনে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। দেখেছিলেন, ভিতরে একটা যন্ত্র চলছে, আর একটি মেয়ের গান শোনা যাচ্ছে। দেখে দুই বোন অবাক হয়ে ভেবেছিল যে একটি মেয়েকে নিশ্চয়ই ওই যন্ত্রটির ভিতরে হাত পা কেটে বন্দী করে রাখা হয়েছে, আর সেই গান করছে! গ্রামোফোন সম্পর্কে তাঁর সেই ধারনা বহুদিন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।
পিতৃবন্ধু অমূল্য মজুমদার এক দিন নেড়ার গান শুনে বুঝতে পেরছিলেন তাঁর প্রতিভার কথা। তিনি নিজেই উৎসাহী হয়ে গান শেখাতে শুরু করেছিলেন। পরে সে যুগের বিখ্যাত গায়ক মন্তাবাবু ও জিতেন ঘোষ আঙ্গুরবালার গান শুনে তাঁকে গ্রামোফোন কোম্পানিতে গান রেকর্ড করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ব্যস! গান রেকর্ড করার কথা শুনেই আঙ্গুরবালা আঁতকে উঠেছিলেন। মনে পড়ে গিয়েছিল ছেলেবেলার সেই ধারণাটা। মনে মনে খুব ভয়ও পেয়েছিলেন।

Advertisement

পরে অবশ্য বনের কথায় সেই ভয় কিছুটা কেটে গিয়েছিল। তবে গান রেকর্ড করার ভয় কাটেনি। পরে এক দিন মন্তাবাবু ও জিতেনবাবুর কথায় বাবার সঙ্গে বেলেঘাটায় রেকর্ডিং স্টুডিওটা ঘুরে দেখতে গিয়েছিলেন। এখানেই গ্রামোফোন কোম্পানির এক সাহেবকে দেখে মনে হয়েছিল হাসিখুসি স্বভাবের, তাই ভয়টা কিছুটা কেটে গিয়েছিল। এমন সময় বাবা বলেছিলেন সাহেব গান শুনতে চাইছেন। ইতিমধ্যেই এক জন তাঁর সঙ্গে তবলা বাজাতে বসলেন। এর পরেই সেই সাহেব ইঙ্গিত করলেন গান শুরু করার জন্য। আঙ্গুরবালা শুরু করলেন ‘বাঁধো না তরী খানি’ গানটি। গান শেষ হতেই সাহেব বলে উঠলেন ‘ওয়ান্ডারফুল, ওয়ান্ডারফুল’ গান রেকর্ড হয়ে গেছে। আঙ্গুরবালা একে বারেই হতবাক! গান রেকর্ড করার ভয় কেটে যাওয়ায় সে দিন আরও কয়েকটি গান রেকর্ড করেছিলেন। গান রেকর্ড হয়ে যাওয়ার পরে সে দিন আঙ্গুরবালা রেজিস্টারে সই করে পেয়েছিলেন চল্লিশ টাকা।
সে দিন থেকে প্রভাবতী হয়ে গেলেন আঙ্গুরবালা। যে নামটি বহু দশক পর্যন্ত সুরের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে বিরাজ করেছিল।
এর কিছু দিনের মধ্যেই আঙ্গুরবালার গানের রেকর্ড ছেয়ে গিয়েছিল গোটা বাংলায়। প্রায় পাঁচ দশক ধরে তাঁর গানের রেকর্ডই সব থেকে বেশি বিক্রি হত। প্রতি মাসে কম করে তিন-চারটি রেকর্ড প্রকাশিত হত। সে যুগে এটা একটা বড় ব্যাপার ছিল।
এর পরে ঠুমরী গজল দাদরা শেখার জন্য তিনি জমিরুদ্দিন খানের কাছে তালিম নিতে শুরু করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার কথা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আঙ্গুরবালা লিখেছিলেন, ‘‘জমিরুদ্দিন খানের কাছে তালিম নিতে গিয়ে কত যে মার খেয়েছি তার ঠিক নেই...।’’ কীর্তন শিখেছিলেন ঈশান ওস্তাদের কাছে। আর নজরুলগীতি শিখেছিলেন কাজী নজরুলের কাছে।
বিশেষ উল্লেখযোগ্য, ১৯২৮ সালে নজরুলের কথায় সুরে ও পরিচালনায় তিনি রেকর্ড করেছিলেন ‘ভুলি কেমনে আজও যে মনে’ গানটি। ক্রমেই আঙ্গুরবালা হয়ে উঠেছিলেন নজরুলের গানের এক অপ্রতিদ্বন্ধী শিল্পী।
সারা জীবনে হিন্দি, বাংলা উর্দু ভাষায় অসংখ্য গান রেকর্ড করেছেন। আর সেই সব অনবদ্য গানের জন্য তাঁকে ‘বাংলার বুলবুল’এবং ‘কলকাত্তা কি কোয়েল’ বলে ডাকা হত।

এমনই এক সময় থিয়েটারে গান গাওয়ার সুযোগ এসেছিল। আঙ্গুরবালা দেবী সে কালের বেশ কিছু থিয়েটারে গান গেয়েছিলেন। সঙ্গীতশিল্পীর পাশাপাশি তিনি ভাল অভিনেত্রী ছিলেন। বহু নাটকে এবং বেশ কিছু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন। পাশাপাশি সুযোগ এসেছিল বেতারে গান গাইবার। কলকাতায় বেতার কেন্দ্রের যে দিন সম্প্রচার শুরু হয়েছিল সে দিন প্রথম শিল্পী ছিলেন আঙ্গুরবালা।
দেশের বিভিন্ন রাজা মহারাজার দরবারে মেহফিলে গান শুনিয়ে তিনি দেশ জোড়া খ্যাতি ও সম্মান লাভ করেছিলেন। তার মধ্যে মহীশূর রাজ দরবারে এবং হায়দরাবাদের নিজামের দরবারে তাঁর মেহফিলের কথা আজও সঙ্গীতের ইতিহাসে প্রতিধ্বনিত হয়। এক কথায় সেই সময় ভারতের সঙ্গীত জগতে তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। এক সময় অভিনয় ছা়ড়লেও কখনও গান ছাড়েননি। পরিণত বয়সেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করতেন।
এক সময় তাঁর মূজরের দক্ষিণা ছিল তিরিশ হাজার টাকা। আঙ্গুরবালা এতটাই জনপ্রিয় শিল্পী ছিলেন যে তাঁর নাম লেখা শাড়ি বাজারে বেরিয়েছিল, আর সেকালের মহিলারা সেই শাড়ি পরতেন। এমনকী সেকালের নাম করা পানের দোকানে পাওয়া যেত খানদানি আঙ্গুরবালা পান। ১৯৭৬ সালে গ্রামোফোন কোম্পানি আঙ্গুরবালাকে গাল্ড ডিস্ক দিয়ে সম্মানীত করেছিল। এ ছাড়াও তিনি পেয়েছিলেন সঙ্গীত নাটক একাডেমি পুরস্কার।
১৯৮৪ সালে থেমে যায় ‘কলকাত্তা কি কোয়েল’-এর ডাক ।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy