E-Paper

তালিকায় ‘জালিয়াতি’, মীমাংসার আগে ভোট নয়, দাবি বিমানদের

নির্বাচন কমিশনের রাজ্য দফতরের বাইরে বুধবার রাতভর অবস্থান চালিয়েছেন বাম নেতা-কর্মীরা। ধর্না-অবস্থানের নেতৃত্বে ছিলেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম, বিবাদী বাগের রাস্তাতেই রাত কাটিয়েছেন মীনাক্ষী মু‌খোপাধ্যায়-সহ বিভিন্ন বাম দলের নেতা ও কর্মীরা।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৬ মার্চ ২০২৬ ০৭:৪৬
সিইও -র সঙ্গে দেখা করার পথে বিমান বসু - সহ বাম নেতারা।

সিইও -র সঙ্গে দেখা করার পথে বিমান বসু - সহ বাম নেতারা। — নিজস্ব চিত্র।

খাতায়-কলমে যা নিয়ম রাখা হয়েছে, কার্যক্ষেত্রে তার অনেক কিছুই মানা হচ্ছে না। ‘জালিয়াতি’ চলছে ভোটার তালিকার নামে! নির্বাচন কমিশনের কাছে রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় ‘গুরুতর অনিয়মে’র কয়েক দফা অভিযোগ জানিয়ে এলেন বাম নেতৃত্ব। পাশাপাশিই তাঁদের স্পষ্ট দাবি, পূর্ণাঙ্গ ও বৈধ ভোটার তালিকা ছাড়া কোনও ভাবেই রাজ্যে বিধাসভা নির্বাচন ঘোষণা করা যাবে না।

নির্বাচন কমিশনের রাজ্য দফতরের বাইরে বুধবার রাতভর অবস্থান চালিয়েছেন বাম নেতা-কর্মীরা। ধর্না-অবস্থানের নেতৃত্বে ছিলেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম, বিবাদী বাগের রাস্তাতেই রাত কাটিয়েছেন মীনাক্ষী মু‌খোপাধ্যায়-সহ বিভিন্ন বাম দলের নেতা ও কর্মীরা। তার পরে বৃহস্পতিবার রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ আগরওয়াল বাম প্রতিনিধিদলকে আলোচনার সময় দিয়েছিলেন। বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু, সিপিএমের পলিটব্যুরো সদস্য শ্রীদীপ ভট্টাচার্য, সিপিআইয়ের কলকাতা জেলা সম্পাদক প্রবীর দেব-সহ বামফ্রন্ট ও অন্য দলগুলির প্রতিনিধিরা সিইও-র কাছে দাবি জানিয়েছেন, ভোটার তালিকা অসম্পূর্ণ রেখে বিধানসভা নির্বাচন করা যাবে না। পরে কমিশনের দফতরের সামনে সমাবেশে বিমান বলেছেন, ‘‘৬০ লক্ষ ভোটারকে এই অনিশ্চয়তার অন্ধকারে রেখে নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করা কেবল অনৈতিক নয়, অসাংবিধানিক।’’ সুপ্রিম কোর্টে আবেদনকারী মুর্শিদাবাদের মোস্তারি বানু, নদিয়ার নিহত বালিকা তামান্নার মা সাবিনাও কমিশনের বাইরে ধর্নায় যোগ দিয়েছিলেন। একই দিনে দিল্লিতে জাতীয় নির্বাচন কমিশনে গিয়ে রাজ্যে এআইসিসি-র পর্যবেক্ষক গুলাম আহমেদ মীর ও প্রদেশ কং‌গ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারেরাও দাবি জানিয়েছেন, ৬০ লক্ষেরও বেশি ভোটার যে ‘বিবেচনাধীন’ রয়েছেন, সেই ‘বিবেচনা’র প্রক্রিয়া শেষের পরে ভোট-প্রক্রিয়া শুরু করা হোক। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার-সহ নির্বাচন কমিশনারেরা অবশ্য দিল্লিতে ছিলেন না।

রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দফতরের বাইরে অবস্থানে বাম নেতারা।

রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দফতরের বাইরে অবস্থানে বাম নেতারা। — নিজস্ব চিত্র।

সিইও-র দফতরে বাম দলগুলির তরফে এ দিন বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ ও দাবি জানানো হয়েছে। প্রথমত, ‘বিচারাধীন বা বিবেচনাধীন’ বলে ধূসর জায়গা গণতন্ত্রে থাকতে পারে না। কে ভোটার আর কে নয়, তার ফয়সালা আগে করতে হবে। বামেদের বক্তব্য, প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষকে ‘বিবেচনাধীন’ বলে ঝুলিয়ে রেখে ভোট করা মানে তাঁদের মতামতের অধিকার কেড়ে নেওয়া এবং সেই ভোটে জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন হতে পারে না। সিইও দফতর সূত্রে বিমানদের জানানো হয়েছে, ওই ৬০ লক্ষের মধ্যে এখনও পর্যন্ত ৬ লক্ষের ফয়সালা হয়েছে। বিমানদের বক্তব্য, ৬০ লক্ষের মধ্যে ৬ লক্ষ নেহাতই সামান্য অংশ!

তাঁদের আরও অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে যাঁদের নাম কাটা গিয়েছে, তাঁদের কারণ দেখানো হয়নি। অথচ বাদ পড়ার কারণ উল্লেখ না-করলে অনলাইনে ফর্ম ৬ গ্রহণ করা হচ্ছে না। ভোটারদের সঙ্গে কি লুকোচুরি খেলছে কমিশন? জেলা নির্বাচন আধিকারিকের (ডিইও) কোনও সিদ্ধান্তের ১৫ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ভোটার সিইও-র কাছে আবেদন করতে পারেন। কিন্তু ‘রিজেকশন লেটার’ বা ‘অর্ডার শিট’ গোপন রাখা হচ্ছে, যাতে সেই ভোটার ফের আবেদন করতে বা আদালতে যেতে না পারেন। বামেদের প্রশ্ন, কেন্দ্রের শাসক দলকে সুবিধা পাইয়ে দিতেই কি এমন অদ্ভুত কাণ্ড ঘটানো হচ্ছে?

বাম নেতারা দাবি করেছেন, বাবা-মায়ের নাম থাকা সত্ত্বেও সন্তানদের নাম ‘বিবেচনাধীন’ রাখা বা বাদ দেওয়া প্রমাণ করে যে, তথ্য যাচাইয়ে ‘চরম গাফিলতি’ হয়েছে। কমিশন যেমন কেন্দ্রের শাসক দলের ‘স্তাবকতা’ করছে, তেমনই রাজ্যের আধিকারিকদের একাংশ রাজ্যের শাসক দলের হয়ে পক্ষপাতমূলক আচরণ করছেন বলে বামেদের অভিযোগ। এর পরে প্রয়োজনে তাঁরা আইনি লড়াইয়ে যাবেন বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাম নেতৃত্ব। সেই সঙ্গেই বিমান বলেছেন, কমিশন অবিলম্বে ‘বিচারাধীন’ ভোটারদের জট না কাটালে এবং দোষী আধিকারিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে রাজ্য জুড়ে বৃহত্তর গণ-আন্দোলন হবে।

রাজ্যের ৬০ লক্ষ মানুষের নাম ‘বিবেচনা’র জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো, ‘বিবেচনা’র প্রক্রিয়া শেষের পরে ভোট-প্রক্রিয়া শুরু, চূড়ান্ত তালিকা থেকে ভুল করে বাদ পড়া যোগ্য ভোটারদের ফের আবেদন ও অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া স্পষ্ট করে জানানোর মতো বিভিন্ন দাবিকে সামনে রেখে এ দিন জাতীয় নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস। মীর ও শুভঙ্করের সঙ্গে মালদহ দক্ষিণের কংগ্রেস ইশা খান চৌধুরী, দলের পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-কমিটির চেয়ারপার্সন প্রসেনজিৎ বসু, দলের নেতা বি পি সিংহ, আশুতোষ চট্টোপাধ্যায়, মুনীশ তামাং প্রমুখ তথ্য দিয়ে জানিয়েছেন, রাজ্যে ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত ভোটার তালিকার মোট ভোটারের প্রায় ৮.৫ শতাংশই ‘বিবেচনাধীন’। কমিশনের কাছে লিখিত দাবি, পশ্চিমবঙ্গে ফর্ম ৬ গ্রহণের হার অত্যন্ত কম। কিন্তু ফর্ম ৭-এর মাধ্যমে নাম বাদ দেওয়ার হার অত্যন্ত বেশি। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগে এই দু’ধরনের ফর্ম ফের যাচাই করা হোক। ‘বিবেচনাধীনে’র মীমাংসা করে তবেই ভোট করার জন্য এ দিন সিইও দফতরে গিয়ে দাবি জানিয়েছেন আইএসএফের চেয়ারম্যান নওসাদ সিদ্দিকী এবং ‘আম জনতা উন্নয়ন পার্টি’র হুমায়ুন কবীরও।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

CPIM Left

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy