বাম এবং অতিবাম দলগুলিকে এ বার তৃণমূলের সঙ্গে জোট বাঁধার ডাক দিলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপির বিরুদ্ধে সকল রাজনৈতিক দলকে জোট বাঁধার আহ্বান জানালেন তিনি।
শনিবার ব্রিগেডের মাঠে শপথগ্রহণ করেছেন বিজেপি সরকারের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। একই দিনে বিকেলে কালীঘাটে নিজের বাড়িতে রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন করেন তৃণমূলনেত্রী। সেখান থেকেই এই জোটের জন্য তিনি আহ্বান জানান। মমতা বলেন, “চারদিকে সন্ত্রাসের বজ্রাঘাত চলছে। আমি সমস্ত রাজনৈতিক দল, ছাত্র-যুব সংগঠন, এনজিও-কে বলব জোট বাঁধুন। আমরা বিজেপির বিরুদ্ধে একটা মঞ্চ গড়তে চাই।”
মমতা আরও বলেন, “বাম, অতিবাম, যে কোনও জাতীয় দল, যে যেখানে আছেন, আসুন আমরা জোট বাঁধি। কেউ চাইলে আমার সঙ্গে কথা বলতে পারেন। ৪টে থেকে ৬টা পর্যন্ত আমি অফিসেই থাকব। আমাদের প্রথম শত্রু বিজেপি।”
তৃণমূলনেত্রী যেখানে দাঁড়িয়ে এই কথাগুলি বলেন, সেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি ছবি রাখা ছিল। জোটের আহ্বান জানিয়ে মমতা বলেন, “রবীন্দ্রনাথের সামনে দাঁড়িয়ে আমি এই আবেদনটা সকলের কাছে রাখলাম। এখন এটা ভাবার সময় নয় যে আমি কে, ও কে। শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু— এটা ভাবার সময় নয়। রাজনৈতিক ভাবে আমাদের প্রথম শত্রু হল বিজেপি।”
মমতার বামেদের আহ্বানের প্রেক্ষিতে প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উদ্ধৃত করে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বলেন, “জীবন যখন শুকায়ে যায়, করুণাধারায় এসো।”
কালীঘাটের বাড়িতে রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠান থেকে বিজেপি-কে পর পর নিশানা করেন মমতা। তৃণমূলনেত্রীর বক্তব্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে শ্রদ্ধা জানাতে ‘দেশ বাঁচাও গণতান্ত্রিক মঞ্চ’ তিনটি জায়গায়— কালীঘাট মোড়, মুক্তদল এবং দমকলের বিপরীতে অনুমতি চেয়েছিল। কিন্তু সেই অনুমতি দেওয়া হয়নি। এমনকি কালীঘাটে মমতার বাড়িতে রবীন্দ্রজয়ন্তী পালনের অনুষ্ঠানেও বাধা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ তৃণমূলনেত্রীর। তিনি বলেন, “সব ডেকরেটারদের মানা করে দিয়েছে। যাতে কেউ কোনও চৌকি না দেয়, প্যান্ডেল না করে। এগুলো যা দেখছেন, সব আমরা নিজেরা করেছি। সকালে দু’টো চৌকি কেনা হয়েছে। মাইকের বক্সও আমরা নিজেরাই অ্যারেঞ্জ করে নিয়েছি।”
মমতার অভিযোগ, বাইরের ‘গুন্ডা’ নিয়ে এসে পশ্চিমবাংলার মানুষের উপরে অত্যাচার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমার বাড়ির সামনেও সকাল বেলা যা-তা করেছে। অভিষেকের বাড়ির সামনেও ধাক্কা সারাক্ষণ চলছে। এমনকী ওর বাচ্চারা আছে, সেখানে ধাক্কা-টাক্কা মারছে। বলছে, দরজা খোলো, মেয়েকে বের করে দাও।” এমনকি গৃহশিক্ষককেও ওই বাড়িতে প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন তৃণমূলনেত্রী।
নির্বাচনের ফলঘোষণার পর থেকে তৃণমূলের কর্মীদের উপরে ‘লাগামহীন, বল্গাহীন সন্ত্রাস চলছে’ বলে অভিযোগ মমতার। তিনি বলেন, “অনেকের বাড়ির সামনেই হুলিগানিজ়ম করছে। অনেক বেনোজল ঢুকে গিয়েছে। পুলিশ পুরো চুপ।”
২০১১ সালের পালাবদল পরবর্তী পরিস্থিতি এবং ২০২৬ সালের পালাবদল পরবর্তী পরিস্থিতির তুলনাও টানেন মমতা। তিনি বলেন, “আমি ২০১১ সালে জেতার পরে কারও উপর কোনও অত্যাচার করতে দিইনি। আমি নিজের বুলেটপ্রুফ গাড়ি বুদ্ধদেববাবুর কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। জ়েড প্লাস নিরাপত্তা দিয়েছিলাম।” এর পরেই তিনি আরও বলেন, “ওরা যে দিন থেকে জিতেছে, সে দিন রাত থেকে আমাদের সব নিরাপত্তা প্রত্যাহার করেছে। এমনকি গত পরশু আমি অবাক হয়ে গিয়েছি। দেখলাম, আমার ফোন আসছে না, মেসেজ আসছে না। কেউ আমাকে ফোনও করছে না। তার পরে দেখলাম ইন্টারনেটই উইথড্র করে নিয়েছে। আমাকে এক ঘণ্টা আগে জানাতে পারত। আমি তো চাই ওরা উইথড্র করুক। আমি ওদের দয়া নিতে চাই না। আমি কারও ক্ষমাভিক্ষা চাই না। আমি কারও সহানুভূতি চাই না।”
এ বারের নির্বাচনী ফলাফল শনিবার ফের এক বার প্রশ্ন তুলে দেন তিনি। মমতা বলেন, “লড়াইটা আমরা জিতেছি, এটা মাথায় রাখবেন। আমাদের হারানো হয়েছে। এটাই অতীব সত্যি। আগামী দিনে প্রমাণ হবে।” বিজেপি-বিরোধী দলগুলির জাতীয় স্তরের নেতৃত্বেরা যে ইতিমধ্যে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, সে কথাও স্মরণ করিয়ে দেন মমতা। তিনি বলেন, “সনিয়াজি, রাহুল গান্ধী, খড়্গেজি কথা বলেছেন। উদ্ধব ঠাকরে, তেজস্বী মেসেজ পাঠিয়েছেন। অখিলেশ নিজে এসে ঘুরে গিয়েছেন। এ ছাড়াও হেমন্ত সোরেন থেকে শুরু করে কেউ বাকি নেই। অরবিন্দ বলেছে, ‘আমি নিজে জীবনে এত কষ্ট পাইনি, যখন আমি নিজেও হেরেছি।’ এটা হারানো হয়েছে। আমি তাঁদের সকলকে মিটিং থেকে কৃতজ্ঞতা জানাই।”
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ২০৭টি আসনে জয়ী বিজেপি। তৃণমূল জয়ী ৮০টি আসনে। রাজ্যের বিধানসভা আসনের সংখ্যা ২৯৪ হলেও ফলতায় পুনর্নির্বাচন হচ্ছে। সে কারণে ২৯৩টি আসনে ভোটগণনা হয়েছে। তার মধ্যে কংগ্রেস দু’টি, সিপিএম একটি, আইএসএফ একটি এবং আমজনতা উন্নয়ন পার্টি (এজেইউপি) দু’টি আসনে জয়ী হয়েছে।
কমিশনের পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ভোট পেয়েছে ৪৫.৮৪ শতাংশ। তৃণমূলের ভোটের হার ৪০.৮০ শতাংশ। কংগ্রেস পেয়েছে ২.৯৭ শতাংশ ভোট। সিপিএমের ভোটের হার ৪.৪৫ শতাংশ। নোটাতে পড়েছে ০.৭৯ শতাংশ ভোট। অন্যেরা ৪.২৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে।