নিউটাউনের হোটেলে গত বুধবার সন্ধ্যার পরে হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। সেই খবর বিদ্যুতের গতিতে ছড়িয়ে পড়তেই তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল সিপিএমের অন্দরে। সেলিমের পক্ষে-বিপক্ষে আড়াআড়ি ভাগ হয়ে গিয়েছিল দুই শিবির। কিন্তু বুধবার সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠকে সেলিমকে একাধিক নেতা জানিয়ে দিলেন, হুমায়ুনের সঙ্গে তাঁর বৈঠক করা এবং তজ্জনিত যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তা ভাল বার্তা দেয়নি।
হুমায়ুন একটা সময়ে কংগ্রেস করতেন। তার পর গিয়েছিলেন তৃণমূলে। তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে গিয়ে লোকসভা ভোটে পদ্মশিবিরের প্রার্থীও হয়েছিলেন। তার পর নরেন্দ্র মোদীর দলের উপর মোহভঙ্গ হওয়ার পরে আবার ফেরেন তৃণমূলে। ২০২১ সালে তৃণমূলের টিকিটে জিতে বিধায়ক হন। এখনও খাতায়কলমে তিনি তৃণমূলের বিধায়ক। যদিও দলগত ভাবে ভরতপুরের বিধায়ককে নিলম্বিত (সাসপেন্ড) করেছে তৃণমূল। সেই হুমায়ুন বাবরি মসজিদ নির্মাণ করছেন মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায়। গত লোকসভা নির্বাচনের আগে ধর্মীয় হিংসায় উস্কানি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে। জনতা উন্নয়ন পার্টি নামক নতুন দল গড়ে তিনি তৃণমূলকে হটানোর ডাক দিয়েছেন। এ হেন হুমায়ুনের সঙ্গে কেন বৈঠক, সেই প্রশ্নে আলোড়িত হয়েছিল সিপিএম। সেলিম বলেছিলেন, তিনি ‘মন’ বুঝতে গিয়েছিলেন। কিন্তু রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সিংহ ভাগ সদস্য সেলিমকে জানিয়ে দিলেন তাঁদের মনের কথা। সে কথা হল, ‘হুমায়ুন হইতে দূরে থাকুন’।
আরও পড়ুন:
সিপিএম সূত্রে খবর, রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর একাধিক সদস্য বুধবারের বৈঠকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, আর যেন হুমায়ুনের বিষয় আলোচনার মধ্যেও না-আসে। আনুষ্ঠানিক ভাবে না-বললেও একাধিক নেতা বৈঠকে বোঝাতে চেয়েছেন, হুমায়ুনের সঙ্গে রাজ্য সম্পাদকের বৈঠক উদ্বাস্তু এলাকায় ‘নেতিবাচক’ প্রভাব ফেলেছে। আলিমুদ্দিন সূত্রে এ-ও খবর, সেলিমও বোঝান, তিনি কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে সেখানে যাননি। বিষয়টি বুঝতে গিয়েছিলেন। রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্যের কথায়, ‘‘সরাসরি না-বললেও সেলিমদার মনোভাবে বোঝা গিয়েছে, একটা বৈঠকের অভিঘাত এই রকম হবে, তা তাঁর বোঝাপড়ার মধ্যে ছিল না।’’
সেলিম-হুমায়ুন বৈঠক নিয়ে সরব হয়েছিল অধিকাংশ বাম শরিকেরাই। যদিও ফরওয়ার্ড ব্লক ও আরএসপির তুলনায় সিপিআই এ প্রসঙ্গে কিছুটা নরম ছিল। তবে বুধবার সিপিআইএমএল (লিবারেশন)-এর সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘‘হুমায়ুনের সঙ্গে দেখা কেন করলেন, জানি না। সেলিমই বলতে পারবেন।’’
হুমায়ুনের সঙ্গে সেলিমের বৈঠকের সাফাই দিতে গিয়ে সিপিএমের রাজ্য কমিটির এক তরুণ সদস্য সংবাদমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে বলেছিলেন, সেলিম যা করেছেন, বেশ করেছেন। দরকার হলে আবার বৈঠক করবেন। সব নৈতিকতার ‘ঠেকা’ একা সিপিএম নিয়ে বসে নেই। ওই তরুণ নেতার বক্তব্য, বাম মহলের ক্ষোভের আগুনে ঘৃতাহুতি দিয়ে দেয়। পাল্টা রাজ্য কমিটির আরএক সদস্য ফেসবুকে পোস্ট করে লেখেন, ‘নীতি নৈতিকতা ছাড়া, আর যা-ই হোক, কমিউনিস্ট পার্টি হয় না।’ সংখ্যালঘু অংশের এই নেতার পোস্ট কার উদ্দেশে তা সিপিএমের কর্মী-সমর্থকদের বুঝতে অসুবিধা হয়নি। তরুণ নেতাদের মধ্যে প্রকাশ্যে এই ‘কথার যুদ্ধ’ নিয়েও রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলী উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বলে খবর। সূত্রের খবর, আলোচনায় একাধিক নেতা বলেছেন, এই তরুণ নেতাদের ডেকে যথাযথ ‘বার্তা’ দেওয়া হোক। কোনও কোনও নেতার পক্ষ নিতে গিয়ে আদতে তাঁরা দলের ভাবমূর্তির ক্ষতি করছেন।
বৃহস্পতিবার রাজ্য বামফ্রন্টের বৈঠক রয়েছে। তার আগে বুধবারের বৈঠকে আসন সমঝোতা কী প্রক্রিয়ায় হবে তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে সিপিএম রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীতে।