Advertisement
E-Paper

করোনা-যুদ্ধের সঙ্গে প্রসূতিদের সেবা

নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস ছিল গত ১১ এপ্রিল। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় এখন স্বাস্থ্যকর্মী ও আশাকর্মীরা ব্যস্ত। এই সময়ে প্রসূতিদের নিয়মিত চিকিৎসা, টিকাকরণ চলছে তো? ‘আশা-দিদি’রা বহু প্রসূতির সুখ-দুঃখের সঙ্গী। কিন্তু করোনা মোকাবিলার পরে সময় পাচ্ছেন তো আশাকর্মীরা? খোঁজ নিল আনন্দবাজার দুই মেদিনীপুর এবং ঝাড়গ্রামে একই ছবি। ঘাটালের দাসপুরের খুকুড়দহ পঞ্চায়েতের এক অন্তঃসত্ত্বার সমস্যা দিনকয়েক তাঁর গর্ভস্থ সন্তান নড়াচড়া করছে না।

শেষ আপডেট: ২০ এপ্রিল ২০২০ ০২:৩৪
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় ব্যস্ত আশাকর্মীরা। অন্য সময়ে সবসময়ে পাশে থাকেন ‘আশা-দিদি’রা। এখন বন্ধ উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র। অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলি বন্ধ। পুষ্টিকর খাবারও অনেকে পাচ্ছেন না। কী করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না ভাবী মা, সদ্য মায়েরা।

দুই মেদিনীপুর এবং ঝাড়গ্রামে একই ছবি। ঘাটালের দাসপুরের খুকুড়দহ পঞ্চায়েতের এক অন্তঃসত্ত্বার সমস্যা দিনকয়েক তাঁর গর্ভস্থ সন্তান নড়াচড়া করছে না। পেটটা শক্ত হয়ে রয়েছে। ঘাটালের মনসুকার এক অন্তঃসত্ত্বার স্বামী গুজরাতে সোনার কাজ করতেন। স্বামী ঘরে বসে। অনেকের স্বামী-শ্বশুরের কাজ বন্ধ। আর্থিক চাপে গার্হস্থ্য হিংসা বাড়ছে। আশাকর্মীরা সরকারি নার্স বা চিকিৎসকদের সঙ্গে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করে তাঁরা প্রসূতিদের পাশে থাকেন।

এখন সবই বন্ধ। গাড়ি বন্ধ। চিকিৎসকদের চেম্বারও বন্ধ। ঘাটাল হাসপাতালের এক স্ত্রীরোগ প্রসূতি বিশেষজ্ঞ জানালেন, এই সময় বাড়তি নজর দেওয়া উচিত অন্তঃসত্ত্বাদের। মানসিক চাপে বাচ্চা ও মা দু’জনেরই সমস্যায় পড়ার সম্ভবনা রয়েছে। আশাকর্মীদের অভিজ্ঞতা বলছে, অনেকে ফোন করে কান্নাকাটি করছেন। ভয়ে অনেকে হাসপাতালে আসতে চাইছেন না। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা স্বাস্থ্য দফতরের দাবি, লকডাউনের মধ্যেও মায়েদের দিকে সমান যত্ন রয়েছে। এ ব্যাপারে রাজ্য থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ এসেছে। সেই নির্দেশ ব্লকস্তরে পাঠানো হয়েছে। পশ্চিম মেদিনীপুরের মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক গিরীশচন্দ্র বেরার দাবি, ‘‘নিয়মবিধি মেনে এএনএম, আশাকর্মীরা অন্তঃসত্ত্বাদের বাড়ি যাচ্ছেন। অন্তঃসত্ত্বারা যাতে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন সে ব্যাপারে উৎসাহ দিচ্ছেন। প্রসবের সময় হয়ে এলে নিশ্চয়যানের ব্যবস্থা করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’’ জেলার স্বাস্থ্য দফতরের দাবি, নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস উপলক্ষে এ বারও সচেতনতার জন্য বিভিন্ন এলাকায় লিফলেট বিলি করা হয়েছে। জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক গিরীশচন্দ্র বেরা বলেন, “প্রসূতিদের জন্য ভাবনা চিন্তা করা হচ্ছে। উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলি খুলে যাবে। সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে নিয়ম মেনে পরিষবা পাবেন প্রসূতিরা।”

করোনা পরিস্থিতিতে সন্তানসম্ভবা ও প্রসূতিদের চিকিৎসা ও দেখভালের উপর কোনও প্রভাব পড়েনি বলে দাবি পূর্ব মেদিনীপুর জেল স্বাস্থ্য দফতরের। এই পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য দফতরের তরফে আশাকর্মীদের মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজ়ার দেওয়া হয়েছে। তবে এখন গায়ে হাত দিয়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে না। আশাকর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে নিরাপদ দরত্ব বজায় রেখে বাড়ি বাড়ি প্রসূতিদের খোঁজ নিতে। পূর্ব মেদিনীপুর জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক নিতাইচরণ মণ্ডল বলেন, ‘‘করোনা পরিস্থিতিতে হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগে প্রতি রোগীর বেডের দূরত্ব বাড়ানো হয়েছে। আশাকর্মীরা আগের মতোই বাড়ি বাড়ি ঘুরে খোঁজ রাখছেন প্রসূতিদের।’’ পূর্ব মেদিনীপুরের খবর, কাঁথি ১, ৩ এবং দেশপ্রাণ ব্লকে আশাকর্মীরাও আগের মতোই কাজ করছেন। প্রয়োজনে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসূতিদের ডেকে পাঠানো হয়। করোনা পরিস্থিতিতে প্রসূতি এবং তার পরিবারের লোকেদের বাড়তি সতর্ক থাকার জন্য পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে সমস্যায় আশাকর্মীরাও। রামনগরের এক আশাকর্মীর দাবি, তাঁর স্বামী নার্সিংহোমের ক্যান্টিনে রান্নার কাজ করতেন। লকডাউনে বাড়ি থেকে আর কাজে যেতে পারেননি। তাই টানাটানিতে সংসার চালাতে হচ্ছে।

পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশিয়াড়ি ও দাঁতন ২ ব্লকে চলছে হাসপাতালে সময় আসন্ন প্রসবাদের চিকিৎসা। দাঁতন ২ ব্লকের ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক নিলয়কুমার দাস জানান, ‘‘নর্মাল ডেলিভারি চলছে। এএনএম ও আশাকর্মীরা নিয়মিত কাজ করছেন। ব্লকের ১৩৪ জন আশাকর্মী আছেন।’’ কেশিয়াড়ির ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক তরণীকুমার শীট জানান, ব্লকে ১৩০ জন আশাকর্মী নিয়মিত খেয়াল রাখছেন প্রসূতিদের। বেলদা গ্রামীণ হাসপাতালের অধীনে দেউলির এক আশাকর্মী সুলেখা সিংহ বলেন, ‘‘ প্রতিদিন দশটি বাড়ি গিয়ে কারও জ্বর, কাশি আছে কিনা দেখতে হচ্ছে। প্রসূতিদেরও খেয়াল রাখতে হচ্ছে।’’ তাঁর স্বামী রাজমিস্ত্রির জোগাড়ের কাজ করেন। তিনিও এইসময় ঘরে বসা। দুই ছেলে-মেয়েকে নিয়ে এই সময়ে খুব কষ্টে দিন চালাতে হচ্ছে।

ঝাড়গ্রামে মোট আটশো জন আশাকর্মী স্বাস্থ্য দফতরের নির্দেশে প্রতিদিনই এলাকা ভাগ করে নিয়ে বাড়ি-বাড়ি যাচ্ছেন। জ্বর-সর্দির রোগী আছেন কি-না সেটা বাড়তি সমীক্ষা করে দেখতে হচ্ছে তাঁদের। বাইরে থেকে কেউ এসেছেন কি-না সেটাও দেখা হচ্ছে। অন্তঃসত্ত্বা ও প্রসূতিদের সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য ব্লক স্বাস্থ্য দফতরের মাধ্যমে জেলা স্বাস্থ্য দফতরকে জানাতেও হচ্ছে।

ঝাড়গ্রাম জেলার আন্তঃরাজ্য সীমানায় ৮টি জায়গায় পুলিশের ‘নাকা’ নজরদারি কর্মসূচিতেও কিছু আশাকর্মীকে রাখা হয়েছে। দু’টি পর্যায়ে ২৪ ঘণ্টা সেখানে আশাকর্মীদের ডিউটি করতে হচ্ছে। এক আশা কর্মী বলেন, ‘‘সপ্তাহে সাতদিনই পরিষেবা দিতে হয় আমাদের। অন্তঃসত্ত্বা, প্রসূতি ও শিশুদের স্বাস্থ্যের প্রতি নিয়মিত নজরদারির কাজের পাশাপাশি, এখন বাড়তি বাড়ি-বাড়ি সমীক্ষার কাজ করতে গিয়ে ফুরসতই মিলছে না।’’ তবে এখন করোনার ভয়ে আশাকর্মীরা বাড়ি-বাড়ি গেলেও অনেক ক্ষেত্রেই আপত্তির মুখে পড়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকছেন না। এখন গাড়ি পেতে সমস্যা হচ্ছে। ফলে জরুরি প্রয়োজনে অন্তঃসত্ত্বাকে হাসপাতালে পৌঁছনোর জন্য আশাকর্মীদের উপরই ভরসা করছেন। সরকারি ভাবে এখনও অনেক আশাকর্মী মাস্ক, গ্লাভস ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার পাননি। নিজেদের সেসব সংগ্রহ করতে হয়েছে। যাঁরা পারেননি তাঁরা রুমাল বা ওড়না মুখে বেঁধে কাজ করছেন। ওয়েস্টবেঙ্গল আশাকর্মী ইউনিয়নের তরফে স্বাস্থ্যভবনে ইমেল করে সমস্যা জানানো হয়েছে। সংগঠনের জেলা সম্পাদিক জ্যোৎস্না মাইতি বলেন, ‘‘সীমানা এলাকায় দূরে ডিউটি দেওয়া হলে আশাকর্মীদের যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হচ্ছে না। নিজেদের উদ্যোগে যেতে হচ্ছে।’’

জেলা স্বাস্থ্য দফতরের এক আধিকারিক জানাচ্ছেন, জরুরি পরিস্থিতিতে সকলকেই পরিষেবা দিতে হচ্ছে। তাই সাময়িক বাড়তি চাপ মেনেই কাজ করতে হবে।

তথ্য সহায়তা: অভিজিৎ ভট্টাচার্য, কেশব মান্না, বরুণ দে, দিগন্ত মান্না, কিংশুক গুপ্ত

Coronavirus Health
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy