ব্রিটিশ আমলের পুরনো ভবন। চুন-সুরকি, কড়ি-বরগায় যেন কথা বলে ইতিহাস। মেদিনীপুর কালেক্টরেটের এই পুরনো ভবনের হেরিটেজ স্বীকৃতি চাইছে জেলা প্রশাসনও। প্রশাসন চায়, ভবনটি হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করা হোক এবং এর সংস্কার ও সংরক্ষণে পদক্ষেপ করা হোক। প্রশাসন সূত্রে খবর, এই মর্মে চিঠি পাঠানো হয়েছে রাজ্য হেরিটেজ কমিশনে। সম্প্রতি কমিশনের সচিবের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলাশাসক রশ্মি কমল। জেলাশাসক মানছেন, ‘‘কালেক্টরেটের পুরনো ভবনটি হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করার আর্জি জানানো হয়েছে।’’
মেদিনীপুরে কালেক্টরেট চত্বরে রয়েছে পুরনো ভবনটি। এখানেই ছিল জেলাশাসক, অতিরিক্ত জেলাশাসকের দফতর। ক’বছর আগে এই চত্বরে নতুন ভবন গড়ে উঠেছে। সেখানে জেলাশাসক, অতিরিক্ত জেলাশাসকের দফতর স্থানান্তরিত হয়েছে। পুরনো ভবনে অবশ্য কয়েকটি দফতর থেকে গিয়েছে। ঠিক কবে এই ভবনের গোড়াপত্তন, সে নথি অনেক খুঁজেও মেলেনি। প্রশাসনিক সূত্র জানাচ্ছে, ১৯৩৪ সালে যে ভবনটির অস্তিত্ব ছিল, সে প্রমাণ মিলেছে। যে নকশা ধরে এই ভবন হয়েছে, তারও খোঁজ নেই। ঘরগুলি উঁচু ছাদের। পুরনো আমলের কিছু আসবাবপত্রও রয়েছে। ইতিউতি ফাটল ধরেছে। কালেক্টরেটের কর্মীদের মতে, এই কাঠামো এখনও কতটা পোক্ত রয়েছে, তা জানতে ভবনের কিছু অংশ কেটে ভিতরের চুন-সুরকি পরীক্ষা করা দরকার। জেলা প্রশাসনের এক আধিকারিকও বলেন, ‘‘সংস্কার মানে শুধু ভাঙাভাঙি নয়। পুরনো চেহারা ফেরানোর কাজে হাত দেওয়ার আগে বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে।’’
মেদিনীপুরের অনেকে মনে করাচ্ছেন, ঐতিহ্য সংরক্ষণে যে আইন রয়েছে, তাতে বিস্তর ফাঁক আছে। তা গলেই নষ্ট হচ্ছে একের পর এক ঐতিহ্যবাহী বাড়ি বা ভবন। প্রশাসন সূত্রে খবর, রাজ্য হেরিটেজ কমিশনে যে চিঠি পাঠানো হয়েছে, সেখানে মেদিনীপুরের ইতিহাস এবং এই ভবনের গুরুত্ব মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে। মনে করানো হয়েছে, ১৭৬০ সালেই মেদিনীপুর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনে চলে এসেছিল। সে সময়ে খাজনা আদায়ের নামে অবাধ লুট ও অত্যাচার করা হয়েছিল। মনে করানো হয়েছে, ১৯৩১, ১৯৩২, ১৯৩৩ পরপর এই তিন বছরে মেদিনীপুরে খুন হন তিন অত্যাচারী জেলাশাসক— পেডি, ডগলাস, পরপর তিন জেলাশাসক খুন হওয়ায় অনেকটাই বেকায়দায় পড়ে গিয়েছিল ব্রিটিশ সরকার। মেদিনীপুরের জেলাশাসকের দায়িত্ব নিতে কাউকে রাজি করানো যাচ্ছিল না।
‘ওয়েস্ট বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস (এগজিকিউটিভ) অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন’- এর পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা শাখার অনেকে মনে করাচ্ছেন, সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গেও মেদিনীপুরের সম্পর্ক কম দিনের নয়। উত্তরাধিকার এবং কর্ম, দুই সূত্রেই গাঁথা রয়েছে ওই সম্পর্ক। কালেক্টরেটের কর্মীদের মতে, ‘‘ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান জানিয়েই ভবনটি সংস্কার ও সংরক্ষণ করা দরকার।’’ প্রশাসনিক সূত্র জানাচ্ছে, রাজ্যের মধ্যে অন্যতম পুরনো জেলা সদর মেদিনীপুরই। ভবনটির সংস্কার ও সংরক্ষণের দাবি দীর্ঘদিনের। জেলাশাসক জুড়ছেন, ‘‘পুরনো ভবনটির স্থাপত্যশৈলীই আলাদা। দেওয়ালে সুক্ষ্ম কারুকাজ রয়েছে।’’