ভোটের আগে শেষ রবিবাসরীয় প্রচারে জঙ্গলমহলে হাজির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এলাকাবাসীর ছোটখাটো চাওয়া-পাওয়া, আবেগ ছুঁয়ে গেলেন তিনি। জনজাতির জল-জঙ্গল-জমির অধিকারের প্রশ্নকে সামনে রেখে আক্রমণ শানালেন তৃণমূলের সিন্ডিকেট রাজের বিরুদ্ধে। সর্বোপরি জনজাতি অধ্যুষিত অন্য রাজ্যে বিজেপি সরকার কী উন্নয়ন করেছে সেই খতিয়ান দিয়ে এ রাজ্যে বিজেপিকে একটি সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানালেন মোদী।
রবিবার বিকেলে ঝাড়গ্রাম স্টেডিয়ামের নির্বাচনী জনসভা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। ঝাড়গ্রাম জেলার চার বিজেপি প্রার্থী লক্ষ্মীকান্ত সাউ (ঝাড়গ্রাম), রাজেশ মাহাতো (গোপীবল্লভপুর), প্রণত টুডু (বিনপুর) ও অমিয় কিস্কুর (নয়াগ্রাম) সমর্থনে আয়োজিত এই সভায় প্রায় আধ ঘণ্টা বক্তৃতা করেন মোদী। তাঁর বক্তব্যের মূলে ছিল জঙ্গলমহলের মূলবাসী মানুষের জমি, সম্পদ ও অধিকার এবং সেই অধিকার খর্ব হওয়ার অভিযোগ। মোদী বলেন, “জনজাতিদের লড়াইটাই জল-জঙ্গল-জমির লড়াই। সেই অধিকার থেকেই মূলবাসীদের উৎখাত করছে তৃণমূলের সিন্ডিকেট রাজ।” এই সিন্ডিকেট-রাজ গ্রামাঞ্চলের দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলছে। তাঁর কথায়, “ছোট বাড়ি বানাতেও তৃণমূলের সিন্ডিকেটের উপর নির্ভর করতে হয়। জনজাতিদের কয়েকশো একর জমি তৃণমূলের সিন্ডিকেট দখল করে রেখেছে।”
এর পরেই প্রধানমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি, “সিন্ডিকেটওয়ালারা আত্মসমর্পণ করো, না হলে গ্রেফতার করা হবে। জল-জমি-জঙ্গলের লুটেরা কাউকেই রেয়াত করা হবে না। তৃণমূলের মন্ত্রী-সান্ত্রী যারা এই লুঠের সঙ্গে যুক্ত, তাদের সকলের হিসাব নেওয়া হবে, এটা মোদীর গ্যারান্টি।” জনজাতি প্রশ্নের সঙ্গে তিনি জুড়েছেন অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গও। মোদীর অভিযোগ, “তৃণমূল অনুপ্রবেশকারীদের সরকার বানাতে চায়। সেই সরকার অনুপ্রবেশকারীদের ভাষা, ধর্ম, রীতির রক্ষা করবে, আর সেই সরকারের শত্রু হবে জনজাতি ও মূলবাসীরা।” ধানচাষিদের ৩,১০০ টাকা ন্যূনতম সহায়ক মূল্য এবং কিসান সম্মাননিধির অর্থ বৃদ্ধির উল্লেখ করে মোদী বলেন, “বাংলার মান্ডি থেকে তৃণমূলের সিন্ডিকেট নির্মূল করা হবে।” পাশাপাশি আলুচাষিদের সমস্যা সমাধানের আশ্বাসও দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের বড় অংশ জুড়ে ছিল, কেন্দ্রীয় সরকার তথা বিজেপি আদিবাসীদের উন্নয়নে কতটা সচেষ্ট, তাঁর বিবরণ। পাশাপাশি রাজ্যের পরিষেবা ও পরিকাঠামো নিয়ে সরব হন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, “তৃণমূলের নির্মম সরকারকে আপনারা ১৫ বছর সময় দিয়েছেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সেচ—সব ক্ষেত্রই বেহাল। বিদ্যুৎ না থাকলেও বিল আসে। মানুষ আঁধারে থাকে, আর তৃণমূলের নেতা মন্ত্রীদের বাড়ি-গাড়ি চকমক করে।” তাঁর দাবি, এই পরিস্থিতিতে রাজ্যের মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে মত দিচ্ছেন। মোদীর কথায়, ‘‘এই লড়াই বিজেপির নয়, বাংলার তথা ঝাড়গ্রামের মানুষের লড়াই।” সঙ্গে আর্জি, ‘‘ঝাড়গ্রামবাসীর কাছে আমার অনুরোধ, সব বুথে বিজেপিকে জয়ী করুন। একটা সুযোগ বিজেপিকে দিন। একটা সুযোগ মোদীকে সেবা করার জন্য দিন।’’
ঝাড়গ্রাম জেলা তৃণমূলের সভাপতি দুলাল মুর্মু বলছেন, ‘‘বিশ্বের সবচেয়ে মিথ্যাবাদী প্রধানমন্ত্রী হলেন নরেন্দ্র মোদী। উনি যতই চেষ্টা করুন জঙ্গলমহলের মানুষকে আর বোকা বানাতে পারবেন না। জঙ্গলমহলের মানুষ বিজেপিকে প্রত্যাখ্যান করবেন।’’ আর ভারত জাকাত মাঝি পারগানা মহলের জিলা পারগানা সূর্যকান্ত মুর্মুর মতে, ‘‘কেউই জনজাতিদের ‘জল-জঙ্গল-জমি’র অধিকার রক্ষার কথা ভাবছেন না। এ রাজ্যে শাসকদলের মন্ত্রী-জনপ্রতিনিধিরা এ বিষয়ে উদাসীন। বিজেপি শাসিত রাজ্যেও জনজাতিদের ‘জল-জঙ্গল-জমি’র অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)