E-Paper

ক্ষোভ সামলানোই চ্যালেঞ্জ তৃণমূলের

অথচ গত পাঁচ বছরে তৃণমূলের বিধায়ক না থাকলেও ঘাটাল কেন্দ্রে উন্নয়নের কাজ যে বন্ধ ছিল তা নয়। তাহলে ক্ষোভের জায়গা তৈরি হল কেন?

অভিজিৎ চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৪১
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

ঘাটালের লড়াইটা এ বার হাড্ডাহাড্ডি।

দু’ফুলের সংগঠনই এখানে নড়বড়ে। যে ফুল ‘অন্তর্ঘাত’ আটকাতে পারবে, বাজিমাত করবে তারাই। নজর থাকবে বাম প্রার্থীর ভোট টানার দিকেও। চায়ের দোকান হোক কিংবা গ্রামের মাচা— সব ঠেকের আলোচনার মোদ্দা বিষয় এটাই।

ঘাটাল বিধানসভার মধ্যে রয়েছে ঘাটাল ব্লকের ১২টি আর দাসপুর-১ ব্লকের তিনটি পঞ্চায়েত ও ঘাটাল ও খড়ার পুরসভা। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে পদ্ম প্রার্থী শীতল কপাট সাড়ে ন’শো ভোটে হারিয়ে দিয়েছিলেন তৃণমূলের শঙ্কর দোলইকে। ২০২২ এর পুর ভোট ও ২০২৩ এর পঞ্চায়েত ভোটে অবশ্য সেভাবে মাথা তুলতে পারেনি পদ্মফুল। ১২টি পঞ্চায়েত ও দু’টি পঞ্চায়েত সমিতি যায় তৃণমূলের দখলে। ঘাটাল ব্লকের সুলতানপুর, ইড়পালা ও মনোহরপুর পঞ্চয়েত পায় বিজেপি। ঘাটাল ও খড়ার পুরসভাও তৃণমূল পরিচালিত। ২০২৪ এর লোকসভা ভোটে এই কেন্দ্রে হাজার পাঁচেক ভোটের ‘লিড’ ছিল জোড়াফুলের। তবে উল্লেখযোগ্য ভাবে সে বার ঘাটাল ও খড়ার পুর এলাকায় এগিয়ে ছিল বিজেপি। যার কারণ হিসেবে তৃণমূলের সমীক্ষায় উঠে এসেছিল নাগরিক ক্ষোভের কথা।

অথচ গত পাঁচ বছরে তৃণমূলের বিধায়ক না থাকলেও ঘাটাল কেন্দ্রে উন্নয়নের কাজ যে বন্ধ ছিল তা নয়। তাহলে ক্ষোভের জায়গা তৈরি হল কেন? রাজ্য সরকার যখন ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান তৈরির ঘোষণা করেছিল তখন মনে করা হচ্ছিল এখানে তৃণমূলের জয় প্রায় নিশ্চিত। তবে দিন যত এগিয়েছে মাস্টার প্ল্যান নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। ঘাটালে ঘুরলেই কানে আসবে, মাস্টার প্ল্যানের কাজের গতি নিয়ে প্রশ্ন। অভিযোগ, নদীর ড্রেজ়িং শুরু হলেও মাটি লুট ছাড়া কিছু হয়নি। মাটি কাটার কাজও বিজ্ঞানসম্মত ভাবে হচ্ছে না। ক্ষোভ রয়েছে আরও। মহকুমার সদর শহর হলেও ঘাটালে কোনও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বা আধুনিক টাউন হল নেই। গেস্ট হাউসও নেই। মাঠের অভাব। সার্কিট হাউস নেই। সুইমিং পুলের দাবি পূরণ হয়নি। এখনও রেলপথহীন এই এলাকায় রাস্তার দু’পাশও জবরদখল হচ্ছে। উড়ালপুল হয়নি। বৈদ্যুতিক চুল্লির কাজও থমকে।

এ বার এই কেন্দ্রে প্রার্থী বদল করেছে তৃণমূল। শঙ্করের দোলইয়ের বদলে টিকিট দেওয়া হয়েছে রাজনীতিতে অনেকটাই আনকোরা তরুণী শ্যামলী সর্দারকে। যিনি এখন ঘাটাল পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি। অন্য দিকে, বিদায়ী বিধায়ক শীতল কপাটই লড়ছেন পদ্মফুল প্রতীকে। কংগ্রেস, সিপিএম, এসইউসি-সহ দু’টি নির্দল প্রার্থীও রয়েছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনুমান, এই কেন্দ্রে লড়াই হবে মূলত তৃণমূল-বিজেপির মধ্যেই। আর দু’দলই ভুগছে অন্তর্ঘাতের আশঙ্কায়।

এই কেন্দ্রে সাংসদ দেবের অনুগামীদের সঙ্গে শঙ্কর দোলই গোষ্ঠীর লড়াই বহুল চর্চিত। টিকিট না পাওয়া শঙ্করকে সেভাবে প্রচারে দেখা যাচ্ছে না। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠকের পরেও বরফ গলেনি বলে সূত্রের খবর। তাঁর অনুগামীদের একাংশও বসে গিয়েছেন। তৃণমূলের অন্দরের খবর, গত বিধানসভা ভোটে সাংসদ অনুগামীরা অন্তর্ঘাত করেছিল। দলের তদন্তে অন্তত তেমনই উঠে এসেছিল। এ বার কী তাহলে শঙ্কর গোষ্ঠী পাল্টা অন্তর্ঘাত করবে? শঙ্কর নিজে অবশ্য বলছেন, ‘‘আমি দলের সঙ্গেই রয়েছি। আমার অনুগামীরা প্রচারেও রয়েছেন।’’

উন্নয়ন নিয়ে ক্ষোভ থাকলেও তৃণমূলের প্রচারে উঠে আসছে বিভিন্ন কাজের কথাই। মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে নানা সরকারি প্রকল্পের বিষয়। ঘাটাল শহর-সহ গ্রামীণ এলাকায় পাকা রাস্তা, বিভিন্ন খালে কালভার্ট, রূপনারায়ণ থেকে জল তুলে শহরে পানীয় জল প্রকল্প, মনসুকার সংযোগকারী রাস্তার জন্য টাকা অনুমোদন, বীরসিংহ উন্নয়ন পর্ষদের আওতায় একাধিক পরিকাঠামো তৈরির তথ্য তুলে ধরছে তারা। তৃণমূল প্রার্থী শ্যামলী সর্দার বলছিলেন, “দিদি টাকা বরাদ্দ করেছেন। মাস্টার প্ল্যানের কাজও শুরু হয়েছে। সেই কাজ শেষ হলেই ঘাটালে বন্যার ঝামেলা থাকবে না।’’ তাঁর দাবি, ‘‘বিজেপি বিধায়ক ঘাটালকে পিছিয়ে দিয়েছেন। এখানে যেটুকু উন্নয়ন হয়েছে, সেটা রাজ্য সরকারের টাকায়।”

কোন্দল-কাঁটা লুকিয়ে রয়েছে পদ্ম বনেও। বিজেপির অন্দরের খবর, বিদায়ী বিধায়ক শীতল কপাট এ বার টিকিট না পান, তা দলের অনেকেই চাননি। তাঁকে হারাতে এক বিজেপি নেতা নির্দল হিসেবে মনোনয়ন দিলেও তা অবশ্য বাতিল হয়েছে। শীতল বলছেন, ‘‘আমাকে উন্নয়ন করতেই দেওয়া হয়নি। তার পরেও বাধা টপকে একাধিক কাজ হয়েছে।’’ একই সঙ্গে তিনি ভাসিয়ে দিচ্ছেন রেলপথের প্রতিশ্রুতিও। বলছেন, ‘‘ঘাটালে রেলপথ শুধু সময়ের অপেক্ষা।”

লড়াইয়ে রয়েছেন সিপিএম প্রার্থী শান্তিনাথ সাতিক। তিনি বলছিলেন, “ঘাটালের মানুষ দুই ফুলের উপরেই বিরক্ত। ঘাটাল ফের সিপিএমেই ভরসা রাখবে।” কংগ্রেসের কাবেরী দোলই ও এসইউসির নাড়ুগোপাল দোলইদেরও দাবি, ঘাটালে তাঁরা ভাল ফল করবেন।

লড়াইটা সত্যিই হাড্ডাহাড্ডি।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

ghatal TMC

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy