পশ্চিম মেদিনীপুরের পঞ্চায়েতের কাজে তিনি সন্তুষ্ট নন, তা আগেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অর্থবর্ষের শেষেও যদি কাজের অগ্রগতি না আসে তা হলে যে পদে আসীন ব্যক্তিদের রদবদল ঘটাতে পারেন, সে ইঙ্গিতও মিলেছিল মুখ্যমন্ত্রীর স্পষ্ট অসন্তোষে। জেলা পঞ্চায়েত সম্মেলনে বিগত চার বছরের কাজের খতিয়ান দেখতে গিয়ে জেলা প্রশাসনও মুখ্যমন্ত্রীর পথেই হাঁটছেন।
কাজের মন্থর গতিতে জেলার প্রশাসনিক কর্তারাও অসন্তোষ গোপন রাখেননি। তাই বুধবার পঞ্চায়েত সম্মেলনের পরেই ফের একই বিষয় নিয়ে আজ অর্থাত্ শুক্রবারও পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি, কর্মাধ্যক্ষ থেকে জেলা পরিষদ সদস্য সকলকে নিয়ে বৈঠক ডেকেছেন তাঁরা। জেলা পরিষদ সূত্রে জানা গিয়েছে, সম্মেলনে যে রূপরেখা তৈরি করে দেওয়া হয়েছে তা কেবল কথার কথা নয়, সেই পথেই যে হাঁটতে হবে তা স্পষ্ট করতেই এক দিনের ব্যবধানে ফের বৈঠকের সিদ্ধান্ত।
কেন এত অসন্তোষ?
চার বছরের (২০১১-১২ থেকে ২০১৪-১৫) কাজের খতিয়ান থেকে দেখা যাচ্ছে, একমাত্র গড়বেতা ২ ব্লক নিজেদের জায়গা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। গত দু’বছরই জেলায় পঞ্চায়েত সমিতির কাজের নিরিখে প্রথম স্থানে রয়েছে এই পঞ্চায়েত সমিতি। ২০১১-১২ আর্থিক বছরে প্রথম স্থান থেকে দাঁতন ১ ব্লক চলে গিয়েছিল শেষের দিকে, ১৭ তম স্থানে। এ বার দ্বিতীয় স্থান পেয়ে গৌরব ফিরে পেয়েছে। ঘাটাল ২১ তম স্থান থেকে কখনও প্রথম, আবার কখনও পঞ্চম স্থানে থেকে এ বার তৃতীয় হয়েছে। জেলার ২৯টি ব্লকের একেবারে ২৯ তম স্থানে থাকা কেশিয়াড়িও ধীরে ধীরে এগোতে এগোতে নিজেকে অষ্টম স্থানে ও ২৪ তম স্থানে থাকা শালবনি পঞ্চম স্থানে ও ১৫ তম স্থানে থাকা কেশপুর সপ্তম স্থানে আনতে সক্ষম হয়েছে।
কিন্তু বিগত তিন বছর ধরে দ্বিতীয় স্থানে থাকা ডেবরা চলতি অর্থবর্ষে চলে গিয়েছে অনেকটা পিছনে। অর্থবর্ষ শেষ হতে আর মাত্র ২ মাস বাকি। এখনও প্রাপ্য টাকার ২৫ শতাংশ অর্থই ব্যয় করতে পারেনি। একই ভাবে পিছিয়ে গিয়েছে সবং, পিংলা। ২০১১-১২ অর্থবর্ষে পঞ্চম স্থানে থাকা সবং এ বার একেবারে ২৯ তম অর্থাত্ শেষ স্থানে! ২০১১-১২ ও ২০১৩-১৪ আর্থিক বছর, দু’বারই চতুর্থ স্থান অধিকার করা পিংলা চলে গিয়েছে ১৪ তম স্থানে!
জঙ্গলমহলের কাজ নিয়েও সন্তুষ্ট নন প্রশাসনিক কর্তারা। জেলার ২৯টি ব্লকের মধ্যে ১১টি ব্লক জঙ্গলমহলের মধ্যে পড়ে। এই ব্লকগুলিতে উন্নয়নের জোয়ার বইছে বলে মুখ্যমন্ত্রী বারেবারেই দাবি করেছেন। কিন্তু প্রশাসনের পরিসংখ্যানই বলছে, তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর জঙ্গলমহলের ব্লকগুলিও টাকা খরচে ব্যর্থ। গত ৪ বছরের মধ্যে ২৯টি ব্লকের মধ্যে দশের মধ্যে নেই বেশির ভাগ ব্লকই। ২০১১-১২ আর্থিক বছরে দশের মধ্যে থেকেছে দু’টি ব্লক। গড়বেতা ২ ও মেদিনীপুর সদর। পরের বছর ছিটকে গিয়েছে মেদিনীপুর সদর ব্লক। গড়বেতা ২ ব্লকের পাশাপাশি সেবার দশের মধ্যে স্থান করেছিল বিনপুর ২ ব্লক। কিন্তু ২০১৩-১৪ আর্থিক বছরে দশের মধ্যে স্থান পায় কেবলমাত্র একটি ব্লক। তা হল গড়বেতা ২।
চলতি বছরে অবশ্য ১১টি ব্লকের মধ্যে ৪টি ব্লক দশের মধ্যে স্থান পেয়েছে। সেগুলি হল, গড়বেতা ২, বিনপুর ২, মেদিনীপুর সদর ও শালবনি। ঝাড়গ্রাম, বিনপুর ১, নয়াগ্রাম, গোপীবল্লভপুর ১, ২, সাঁকরাইলের মতো জঙ্গলমহলের ব্লকগুলি টাকা খরচের দিক দিয়ে পিছনের সারিতেই থেকে গিয়েছে।
কেন এমন ঘটছে? জেলার এক পদস্থ আধিকারিকের কথায়, “ধারাবাহিকতা না থাকার কারণেই এমনটা ঘটছে। যে পঞ্চায়েত সমিতিতে বিগত বছরের পড়ে থাকা টাকা বেশি রয়েছে, সেই সব ব্লকের ক্ষেত্রে টাকা খরচে সমস্যা তো হবেই। পড়ে থাকা টাকা ও চলতি আর্থিক বছরের প্রাপ্য মিলিয়ে ৩০-৩৫ কোটি টাকা হয়ে গেলে তা খরচ করতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। এর জন্য পঞ্চায়েত সমিতি ও গ্রাম পঞ্চায়েতের যতটা সক্রিয় হওয়া উচিত সেই সক্রিয়তা মিলছে না।” এক বিডিও-র কথায়, “পরিকল্পনা তৈরি করতেই তো সময় লেগে যাচ্ছে। এক জন একটি জায়গায় পুকুর খননের প্রস্তাব দিলে অন্য জন বিরোধিতা করছেন। দু’পক্ষকে বোঝাতে সময় লাগছে। যদিও বুঝিয়ে কাজ শুরু করা গেল তো তখন আর একপক্ষ এসে সমস্যা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তা হলে কাজ করব কী ভাবে?”
অভিযোগ, সিন্ডিকেট, তোলাবাজি-র কারণে ঠিকাদারেরাও অনেক জায়গাতেই কাজ করতে রাজি হচ্ছেন না। রাজনৈতিক রং ও গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ফলে পরিকল্পনা তৈরিতেও দেরি হচ্ছে। তার জেরে ধাক্কা খাচ্ছে উন্নয়ন। তারই প্রতিফলন ঘটছে প্রশাসনিক রিপোর্টে।
চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ে রাজ্য পঞ্চায়েত সম্মেলন হবে কলকাতায়। তার আগে যাতে তড়িঘড়ি কাজ করে আরও বেশ কিছু টাকা খরচ করা যায়, তার জন্যই সম্মেলনের এক দিন পরেই ফের বৈঠক ডাকা হল। যে বৈঠকে এগিয়ে থাকা ব্লকগুলিও কেন পিছিয়ে পড়ছে, পিছিয়ে থাকা ব্লকগুলি কেন এগোতে পারছে না তা নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করে নতুন পথ খোঁজা হবে বলে জেলা পরিষদ সূত্রে জানা গিয়েছে। তারই সঙ্গে সম্মেলনের মতোই আরও একবার এই বার্তাও পৌঁছে দেওয়া যে, উন্নয়নের ক্ষেত্রে রঙ নয়, গোষ্ঠী নয়, রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে উন্নয়ন করতে হবে। সারদা কেলেঙ্কারিতে দল জেরবার, তেমনি কাঁধে নিশ্বাস ফেলছে বিজেপি— এর থেকে বাঁচতে উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করতেই হবে। জেলা পরিষদের দলনেতা অজিত মাইতি বলেন, “বারেবারেই আমরা সবার কাছে এই আবেদনই জানাচ্ছি যে, উন্নয়নে গতি আনতে হবে। তার জন্য সব ধরনের সহযোগিতা করার জন্য আমরা প্রস্তুত। আশা করছি, বারবার বৈঠক করে সে বার্তা সব স্তরই পৌঁছতে পেরেছি। চলতি আর্থিক বছরে বেশিরভাগ প্রকল্পই বাস্তবায়িতও করতে পারব।”