পশ্চিমবঙ্গে মৃত্যু হল আরও এক বুথ স্তরের আধিকারিকের (বিএলও)। এ বার কোচবিহার। শুক্রবার রাতে বুকে ব্যথা অনুভব করায় ওই বিএলও-কে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তাঁর। পরিবারের দাবি, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) কাজের চাপে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ভুগছিলেন মানসিক অবসাদেও।
স্থানীয় সূত্রে খবর, মৃত বিএলওর নাম আশিস ধর। বাড়ি কোচবিহার-২ ব্লকের বাণেশ্বরের ইছামারী গ্রামে। ওই এলাকার ১০৩ নম্বর বুথে বিএলওর দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন তিনি। পরিবার জানিয়েছে, এসআইআরের কাজ নিয়ে দিন কয়েক ধরেই মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন আশিস। শুক্রবার বুকে ব্যথা অনুভব করায় পরিবারের লোকেরা তাঁকে তড়িঘড়ি হাসপাতালে নিয়ে যান।
শুক্রবার রাতে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় আশিসকে। সেখানেই চিকিৎসা চলছিল তাঁর। তবে হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় আশিসের। তিনি পূর্ব গোপালপুরের চতুর্থ পরিকল্পনা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক ছিলেন। এসআইআরের কাজ শুরুর পর থেকে স্কুল এবং বিএলওর দায়িত্ব একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছিল তাঁকে। ফলে মানসিক অবসাদ গ্রাস করেছিল আশিসকে, বলে দাবি পরিবারের।
আরও পড়ুন:
শনিবার আশিসের বুথে ৩৯ জনের শুনানি ছিল। তা নিয়ে চিন্তায় ছিলেন তিনি। পরিবারের সদস্যের দাবি, আশিস বার বার বলতেন, এসআইআরের যা কাজ রয়েছে, তা কী ভাবে শেষ করবেন! এই কাজ নিয়ে চাপে থাকতেন। আশিসের ভাই দিলীপ ধরের কথায়, ‘‘কাল (শুক্রবার) রাতে কাজ থেকে ফিরে বাড়িতে খাওয়াদাওয়া করে। তার পরে একটা ফোন আসে। শুনানির কাজ নিয়ে কথা হয় সেটা বুঝতে পেরেছিলাম। ফোন রাখার পরেই আমাদের বলে আমার শরীর খারাপ করছে। বুকে ব্যথা করছিল। ঘামে ভিজে গিয়েছিল শরীর। সঙ্গে সঙ্গে আমরা হাসপাতালে নিয়ে যাই।’’ আশিসের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজাও।
আশিসের মৃত্যুর খবর পেয়ে তাঁর বাড়ি যান তৃণমূলের জেলা সভাপতি অভিজিৎ দে ভৌমিক। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, এসআইআরের কাজের চাপ নিতে পারছিলেন আশিস। পরিবার থেকেও সাহায্য পেতেন। তবে তার পরেও কাজ শেষ করতে না-পারায় মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছিলেন তিনি। অভিজিতের দাবি, ‘‘কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে নির্বাচন কমিশন বাঙালিকে শায়েস্তা করার জন্য এই চাপ দিচ্ছে।’’ যদিও স্থানীয় বিজেপি নেত্বের দাবি, মৃত বিএলও-র পরিবার যা বলছেন তা ভিত্তিহীন। জেলা বিজেপির সভাপতি অভিজিৎ বর্মণ বলেন, ‘‘এসআইআরের প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন তো শুনানি চলছে। শুনানি তো বিএলও করছেন না। আমার মনে হয়, এই পর্যায়ের ওঁর চাপ থাকার কথা নয়।’’
এই নিয়ে রাজ্যে এখনও পর্যন্ত এসআইআর পর্বে ছ’জন বিএলওর মৃত্যু হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এসআইআরের কাজ শুরুর চার দিন পর প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল। গত ৯ নভেম্বর ‘কাজের চাপে’ মৃত্যু হয় পূর্ব বর্ধমানের বিএলও নমিতা হাঁসদার। পেশায় অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী নমিতা ৮ নভেম্বর ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। পরিবারের দাবি, এসআইআরের কাজ করতে করতেই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। পর দিন কালনা মহকুমা হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। এর ১০ দিন পরে জলপাইগুড়িতে এক বিএলও মারা যান। অভিযোগ, কাজের চাপে আত্মঘাতী হন ডুয়ার্সের মাল ব্লকের নিউ গ্লেনকো চা-বাগান এলাকার বাসিন্দা শান্তিমুনি ওঁরাও। ৪৮ বছর বয়সি শান্তিও পেশায় অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ছিলেন। এর পরে ২১ নভেম্বর নদিয়ার কৃষ্ণনগরে আত্মঘাতী হন এক বিএলও। নাম রিঙ্কু তরফদার। ৫১ বছরের ওই বিএলও পেশায় পার্শ্বশিক্ষক ছিলেন। তাঁর দেহের পাশ থেকে একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার করে পুলিশ। তার পরে মুর্শিদাবাদে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান জাকির হোসেন নামে এক বিএলও। গত ২৮ ডিসেম্বর বাঁকুড়ার রানিবাঁধে হারাধন মণ্ডল নামে এক বিএলওর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। শনিবার মৃত্যু হয় কোচবিহারের আশিসের।