E-Paper

মুছে গিয়েছে নাম, প্রশ্নই সম্বল আলমা-শ্যামলীদের

উত্তরবঙ্গের চা বাগানের শ্রমিক জগদেও টোপ্পোর হাল একই। তিনি বলছেন, ‘‘এত দিন তো ভোট দিতাম। ভোটার তালিকায় নাম ছিল।

সন্দীপন চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ১৪ মার্চ ২০২৬ ০৯:১৫
আদিবাসী সম্প্রদায়োর মানুষ।

আদিবাসী সম্প্রদায়োর মানুষ। ফাইল চিত্র।

রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মর্মুর ‘অসম্মান’ যেখানে ঘটেছিল, তার চেয়ে বেশি দূরে নয় সুনীতা ওঁরাওয়ের বাস। যেখানে অনেক দিন ধরে বাস করে আসছেন, সে জমির কোনও কাগজ তাঁর কাছে নেই। তবে দেশ বা রাজ্যের সরকার গড়ায় তাঁর অবদান রেখে এসেছেন এত বছর। এখন ভোটার তালিকায় ‘ডিলিটেড’ ছাপ মেরে নির্বাচন কমিশন জানিয়ে দিয়েছে, তিনি আর ভোটার নন! আদিবাসী রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদীর অসম্মানে সরব হয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ভোটার তালিকা থেকে নাম হারিয়ে সুনীতার সম্বল কেবল চোখের জল।

উত্তরবঙ্গের চা-বাগানের শ্রমিক জগদেও টোপ্পো-র হাল একই। তিনি বলছেন, ‘‘এত দিন তো ভোট দিতাম। ভোটার তালিকায় নাম ছিল। এ বার শুনানিতে ডেকেছিল। আগের ভোটার তালিকা, ভোটার কার্ড, সঙ্গে আধার কার্ড আর প্যান কার্ড দিয়েছিলাম। তার পরে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ।’’ চা-বাগানের নিবাসী শংসাপত্র বা জনজাতি শংসাপত্র ছিল না জগদেওয়ের কাছে। বেলগাছি এস্টেটের আলমা এক্কা একই রকমের নথিপত্র জমা দিয়েছিলেন। পরিণতি হয়েছে একই। আলমা জানেন না, কোথায় ফের আবেদন করতে হবে। তাঁকে কেউ বলেছে, মহিলাদের অনেকেরই এই সমস্যা হয়েছে। আলমা প্রশ্ন করছেন, ‘‘গরিব বলে আমাদের নাম কেটে দিল?’’

সুনীতা, জগদেও, আলমা কয়েক জন উদাহরণ মাত্র। কুলদীপ টোপ্পো, জয়দীপ কুজুর, শর্মিলা ওঁরাও, পিঙ্কি ওঁরাও, কামিনী রাউতিয়া অসুর, লালবাহাদুর অসুর, দিলীপ এক্কা, উর্মিলা ওঁরাও— এই রকম কয়েক হাজার নাম ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) ধাক্কায় মুছে গিয়েছে ভোটার মানচিত্র থেকে। অনেকের নাম বিবেচনাধীন। শিলিগুড়ি মহকুমার মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি, ফাঁসিদেওয়া, ডুয়ার্সের কালচিনি, মাদারিহাট, কুমারগ্রাম, নাগরাকাটার মতো বিধানসভা এলাকার চা-বাগানে ছড়িয়ে রয়েছে ভোটার পরিচয় হারিয়ে ফেলা এই সব আদিবাসী নাম। এঁদের যন্ত্রণার কথা জানিয়ে আদিবাসী রাষ্ট্রপতির কাছেই গণ-আবেদনের প্রস্তুতি নিচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস। সিপিএম দাবি করছে, এই মানুষগুলোর জন্য বিশেয ব্যবস্থা না-করে ভোট করা ঘোরতর অন্যায়। অন্য দিকে, বিজেপি মেনে নিচ্ছে আদিবাসী, চা-শ্রমিকদের সঙ্গে অন্যায় হচ্ছে। তবে তাদের দাবি, প্রয়োজনীয় কাগজ না-দিয়ে রাজ্য সরকারই তাঁদের সমস্যায় ফেলেছে রাজনৈতিক ফায়দার জন্য।

সমস্যা অবশ্য কেবল উত্তরে নয়। প্রান্তিক, সংখ্যালঘু, মতুয়া-সহ নানা অংশের সঙ্গে আদিবাসীদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার ঘটনা ঘটেছে রাজ্যের অন্যত্রও। হুগলির ধনেখালির শ্যামলী মুর্মু যেমন। বাবা-মা গত হয়েছেন অনেক দিন, যে জমিতে থাকেন, তার পাট্টা নেই। এখন নাম তাঁর কাটা গিয়েছে। শ্যামলীর প্রশ্ন, তিনি রোহিঙ্গা নন, বাংলাদেশিও নন। তবে কেন নাম বাদ? শ্যামলীদের নিয়ে ইআরও এবং বিডিও-র কাছে বিক্ষোভ করেছে সিপিএম।

তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠন আইএনটিটিইউসি-র দার্জিলিং জেলা (সমতল) সভাপতি শ্রী নির্জল দে বলছেন, ‘‘আমরা আদিবাসীদের কাছ থেকে গণ-পিটিশন পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছি। আশা করব, এক জন আদিবাসী হিসেবে রাষ্ট্রপতি এই বিষয়টি বিবেচনা করবেন এবং জনজাতি সম্প্রদায়ের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য পদক্ষেপ করবেন।’’ সিপিএমের চা-বাগান মজদুর ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও সিটুর রাজ্য সম্পাদক জিয়াউল আলমের দাবি, যে জমিতে অনেক দিন ধরে এঁরা বাস করেন, তার পাট্টা না-থাকায় সরকারি আবাস যোজনা থেকে শ্রমিকেরা বঞ্চিত। এখন ভোটার তালিকা থেকেও বাদ দেওয়া হচ্ছে। নামের বানান ভুল-সহ যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির (লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি) দায় শ্রমিকদের নয়।

বিজেপির আলিপুরদুয়ারের সাংসদ মনোজ টিগ্গা অবশ্য বলছেন, ‘‘আদিবাসী, চা-শ্রমিকদের সঙ্কীর্ণ রাজনীতির বলি করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন যে সব নথির কথা বলেছিল, তার অনেক কিছুই তাঁদের কাছে নেই। এই নিয়ে দাবি জানানোর পরে কমিশন পরবর্তী নির্দেশিকায় বলেছিল, চা-বাগানে কাজ করা সংক্রান্ত কাগজ দিলেই কাজ হবে। কিন্তু সেই কাগজ দেওয়া হয়নি, জনজাতি শংসাপত্রও অধিকাংশ মানুষ পাননি। রাজনীতির স্বার্থ পূরণ করতে গিয়ে এই মানুষদের বিপদে ফেলেছে রাজ্য সরকার।’’ মনোজের দাবি, ‘‘কোনও বৈধ ভোটারের নাম যাতে বাইরে থেকে না যায়, তার জন্য আমরা অবশ্যই যথাসাধ্য করব।’’

সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর প্রশ্ন, ‘‘জ্ঞানেশ কুমার তো বলে চলে গেলেন কোনও বৈধ ভোটারের নাম বাদ যাবে না। কী ভাবে কাদের নাম বাদ যাচ্ছে, দেখাই যাচ্ছে! কমিশনের উচিত ছিল আধার কার্ড গ্রহণ করা। তা হলে এত সমস্যা হত না। কমিশন আর রাজ্য প্রশাসনের অপদার্থতার ফল সাধারণ মানুষ কেন ভুগবেন?’’

প্রশ্ন অনেক। উত্তর নেই!

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Tribal Malda

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy