জেলার সদর শহর, অথচ সেখানে প্রেক্ষাগৃহ রয়েছে হাতেগোনা। যে কটি আছে, তা-ও মান্ধাতা আমলের, সংস্কারের অভাবে ন্যুব্জ। মেদিনীপুরে সভা-সমাবেশ বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করাটা যা কতটা ঝক্কির, তা আয়োজকরা হাড়েহাড়ে জানেন।
পরিস্থিতি দেখে অবশেষে নড়েচড়ে বসল প্রশাসন। মেদিনীপুর শহরের অরবিন্দনগরে অত্যাধুনিক প্রেক্ষাগৃহ তৈরির সিদ্ধান্ত হয়েছে। নাম হবে ‘রবীন্দ্র ভবন’। প্রেক্ষাগৃহ তৈরির প্রয়োজনীয় অর্থ দেবে তথ্য সংস্কৃতি দফতর। প্রস্তাবিত ভবনে আর্ট গ্যালারি তৈরির ভাবনাও রয়েছে। এই প্রেক্ষাগৃহের জন্য জমির সংস্থানও হয়ে গিয়েছে। সব কিছু ঠিক থাকলে বুধবার জেলা ভূমি দফতরের কাছ থেকে জমি তথ্য সংস্কৃতি দফতরের হাতে চলে আসবে।
মেদিনীপুর শহরে এই প্রেক্ষাগৃহ তৈরির তোড়জোড় শুরু হয় বছর দেড়েক আগে। প্রস্তাবিত ভবনের জন্য তথ্য-সংস্কৃতি দফতর প্রায় ১৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। অরবিন্দনগরে সরকারি খাস জমি রয়েছে। সেখানেই ৩.৭৫ একর জমিতে গড়ে উঠবে এই রবীন্দ্র ভবন। ইতিমধ্যে প্রকল্পটি নিয়ে জেলাশাসক জগদীশপ্রসাদ মিনার সঙ্গে কথা হয়েছে জেলা তথ্য ও সংস্কৃতি আধিকারিক কৌশিক নন্দীর। মেদিনীপুরের বিধায়ক তথা মেদিনীপুর-খড়্গপুর উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যান মৃগেন মাইতির সঙ্গেও তাঁর কথা হয়েছে। মৃগেনবাবু বলেন, “এ বার শহরে রবীন্দ্র ভবন তৈরির কাজ শুরু হবে। প্রয়োজনীয় জমির সংস্থান হয়েছে। ভবনটি হলে শহরে সংস্কৃতি চর্চার প্রসার ঘটবে।”
ঠিক কেমন হবে এই প্রেক্ষাগৃহ? প্রস্তাবিত ‘রবীন্দ্র ভবন’-এ মোট তিনটি সভাঘর থাকবে। সব থেকে বড় সভাঘরে আসন থাকবে প্রায় দু’হাজার। বাকি দু’টিতে যথাক্রমে এক হাজার এবং পাঁচশো জন বসতে পারবেন। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সভাঘরে উন্নত মানের শব্দ ও আলোর ব্যবস্থা থাকবে। একই চত্বরে আর্ট গ্যালারি তৈরির ভাবনাও রয়েছে। সুন্দর করে সাজানো ভবনে থাকবে বাগান। দুর্ঘটনা মোকাবিলার ব্যবস্থাও থাকবে। জেলা প্রশাসন সূত্রে খবর, সবই এখন পরিকল্পনাস্তরে রয়েছে। প্রকল্পের চূড়ান্ত নকশা তৈরি হয়নি। তবে জমির সংস্থান হয়েছে। এ বার নকশা তৈরির কাজ শুরু হবে। মেদিনীপুরের বিধায়ক মৃগেনবাবু বলেন, “এখনও কিছু প্রস্তাব আসছে। সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আশা করি, অত্যাধুনিক পরিকাঠামো-সহ এই ভবন তৈরি হলে তা মেদিনীপুরের সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে নতুন পালক হিসেবে যুক্ত হবে।”
রবীন্দ্র ভবনের নকশা
• একই চত্বরে তিনটি সভাঘর।
• একটিতে দু’হাজার ও বাকি দু’টিতে যথাক্রমে হাজার এবং পাঁচশো আসন।
• প্রতিটি সভাঘর বাতানুকূল।
• উন্নত মানের আলো ও শব্দ।
• ভবন চত্বরে আর্ট গ্যালারি।
• আপত্কালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যবস্থা।
• ভবন চত্বরে বাগান।
বর্তমানে মেদিনীপুর শহরে হাতেগোনা কয়েকটি প্রেক্ষাগৃহ রয়েছে। এর মধ্যে একটিই অত্যাধুনিক। সেটি হল জেলা পরিষদের সভাগৃহ ‘প্রদ্যোৎ স্মৃতি সদন’। এক সময় এই প্রেক্ষাগৃহও সংস্কারের অভাবে ধুঁকছিল। বৃষ্টি হলে ছাদ চুঁইয়ে জল পড়ত। কয়েক বছর আগে সংস্কার কাজ শুরু হয়। সংস্কারের পর অবশ্য হলের হাল ফিরেছে। প্রেক্ষাগৃহে উন্নত মানের আলো এবং শব্দের ব্যবস্থা হয়েছে। শহরের অন্য প্রেক্ষাগৃহগুলির মধ্যে রয়েছে বিদ্যাসাগর স্মৃতি মন্দির, ফিল্ম সোসাইটি হল, স্পোর্টস কমপ্লেক্স। জেলা পরিষদ হলে প্রায় এক হাজার আসন রয়েছে। বিদ্যাসাগর হল কিংবা ফিল্ম সোসাইটি হলে আসন সংখ্যা কম। কিন্তু এই হলগুলিতে ভাল মানের অনুষ্ঠান পরিবেশন করতে খুবই সমস্যা হয় বলে অভিযোগ সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের। মেদিনীপুরের মতো শহরে অত্যাধুনিক প্রেক্ষাগৃহ খুব প্রয়োজন রয়েছে বলে মানছেন সঙ্গীতশিল্পী অলোকবরণ মাইতি। তাঁর কথায়, “প্রদ্যোৎ স্মৃতি সদন ভাড়া করতে ১০ হাজার টাকার মতো লাগে। আমরা যাঁরা বছরের বিভিন্ন সময় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করি, তাঁদের পক্ষে এত টাকা জোগাড় করা অনেক সময় মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। আর অন্য হলগুলোতে আলো-শব্দের ভাল ব্যবস্থা নেই।”
মেদিনীপুর লিটল ম্যাগাজিন অ্যাকাডেমির সম্পাদক ঋত্বিক ত্রিপাঠী বলেন, “দুই মেদিনীপুর থেকে প্রায় তিনশো লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়। এগুলো সংগ্রহের জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করা হলে লিটল ম্যাগের সংগঠক থেকে পাঠক, সকলেই উপকৃত হবেন। আর আর্ট গ্যালারি থাকলে চিত্রশিল্পীরা ছবির প্রদর্শনী করতে পারবেন।” মেদিনীপুর ফিল্ম সোসাইটির অন্যতম সদস্য সিদ্ধার্থ সাঁতরারও বলেন, “সংস্কৃতির এই শহরে ভাল অনুষ্ঠান হয়। তার জন্য ভাল প্রেক্ষাগৃহের চাহিদা থাকবেই।”
প্রস্তাবিত রবীন্দ্র ভবন তৈরির কাজ কবে শুরু হয়, সেটাই দেখার।