এসআইআরের শুনানিতে দুই জেলায় দু’রকম চিত্র দেখা গেল। পশ্চিম মেদিনীপুরের মেদিনীপুর শহরের একটি বুথ থেকেই শুনানির জন্য তলব করা হয়েছে ২৪৮ জনকে। ওই এলাকা সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বলে পরিচিত। অন্য দিকে, হাওড়ায় ডাক পেয়েছেন প্রাক্তন জনপ্রতিনিধি। যিনি দক্ষিণ ২৪ পরগণার জয়নগরের সাংসদ ছিলেন।
আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে মেদিনীপুর শহরের (২৩৬ বিধানসভা) পালবাড়ি এলাকার (২৪০ নম্বর বুথ) সংখ্যালঘু অধ্যুষিত অংশে। অভিযোগ, এই এলাকায় বসবাসকারী ২৪৮ জন ভোটারকে নোটিস পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু প্রতিটি নোটিসেই ঠিকানার তথ্য ভুল রয়েছে। জানা গিয়েছে, সংশ্লিষ্ট বুথে মোট ভোটারের সংখ্যা ১২৪৫ জন। তাঁদের মধ্যে ২৪৮ জন শুনানিতে ডাক পেয়েছেন। তাঁদের ঠিকানা পালবাড়ির পরিবর্তে হয়েছে তালপুকুর। এই তালপুকুর আবার শহরের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের অন্য একটি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা।
পালবাড়ির বাসিন্দা সমীরণ জানান, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় তাঁর নাম আছে। তা সত্ত্বেও শুনানির জন্য ডাকা হয়েছে। তাঁর দাবি, নোটিসে তালপুকুর নামে যে ঠিকানার উল্লেখ রয়েছে সেই জায়গাটি কোথায় তা তিনি জানেন না। তিনি বলেন, ‘‘আমার আধার ও ভোটার কার্ড সহ-সব নথিতেই পালবাড়ির ঠিকানা আছে। হঠাৎ করে নোটিস পেয়ে খুব ভয় লাগছে।’’
খবর পেয়ে পালবাড়ি এলাকায় পৌঁছে সাধারণ মানুষের পাশে থাকার আশ্বাস দেন মেদিনীপুর পুরসভার পুরপিতা সৌমেন খান। তিনি জানান, বিষয়টি জানামাত্রই প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকদের অবহিত করা হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘‘একই এলাকায় এতগুলো নোটিসে কী ভাবে ঠিকানা ভুল হতে পারে তা বোধগম্য নয়। এর ফলে গরীব ও সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অনেকেই আতঙ্কে রয়েছেন। এই এলাকার মানুষের পাশে আমরা আছি।” মহকুমাশাসক মধুমিতা মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘যান্ত্রিক ত্রুটি হতে পারে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’’
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই পালবাড়ি এলাকার মানুষের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছিল। ফর্ম পূরণ, জমা দেওয়ার নিয়ম, শুনানি—সব মিলিয়ে নানা প্রশ্ন নিয়ে ঘুরপাক খেতে হচ্ছে। তার উপর এ বার ভুল ঠিকানা-সহ নোটিস পেয়ে আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন ভোটাররা।
এই প্রসঙ্গে জেলা বিজেপির মুখপাত্র অরূপ দাস বলেন, ‘‘এই সমস্ত এলাকার মানুষের ফর্ম পূরণ করে দিয়েছিলেন তৃণমূলের নেতারা। এই ভুলের জন্য ওঁরাই দায়ী।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘সঠিক নথিপত্র থাকলে কারওরই ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই।’’
আরও পড়ুন:
মেদিনীপুরের বুথে যখন জনতা একাংশের আতঙ্কিত, তখন হাওড়ায় দেখা গেল শুনানিতে ডাক পেয়েছেন এসইউসিআইয়ের প্রাক্তন জনপ্রতিনিধি সাংসদ তরুণ কুমার মণ্ডল-ও। হাওড়া জেলা পরিষদের সহ সভাধিপতি অজয় ভট্টাচার্য, দক্ষিণ হাওড়ার বিধায়ক নন্দিতা চৌধুরীর পরে এ বার শুনানিতে তলব করা হল ওই প্রাক্তন সাংসদকে। তিনি দক্ষিণ ২৪ পরগণার জয়নগরের সাংসদ ছিলেন। এসইউসিআই নেতার বাড়ি হাওড়ার বি গার্ডেন এলাকায়।
মঙ্গলবার দুপুর ১২টা নাগাদ শিবপুরের বি গার্ডেনের কলেজঘাট রোডে পূর্ত দফতরে শুনানি কেন্দ্রে যাবতীয় নথি নিয়ে শুনানিতে হাজির হতে বলা হয়েছিল তরুণকে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ মতো প্রাক্তন সাংসদ এ দিন নথি নিয়ে শুনানিতে অংশ নেন। জানা গিয়েছে, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় তরুণবাবুর নাম না থাকার কারণে তাঁকে তলব করা হয়েছে। তবে তাঁর মায়ের নাম আছে।
আরও পড়ুন:
-
এসআইআর-উদ্বেগের আবহে রাষ্ট্রপতির দ্বারস্থ হচ্ছেন শান্তনু, মতুয়া মহাসঙ্ঘের প্রতিনিধিদের নিয়ে যাচ্ছেন রাইসিনা হিলে
-
‘অভিষেকের সেবাশ্রয় প্রকল্পে ভয় পেয়েছে’, নাম না করে শুভেন্দুকে ‘মেজোখোকা’ বলে কটাক্ষ রাজীবের
-
‘লক্ষ্মীর ভান্ডার চাই না, মর্যাদা চাই’, দেবের এলাকায় তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যোগ দিলেন শতাধিক মহিলা
শুনানিতে অংশ নেওয়ার পরে তরুণ বলেন, ‘‘আমি কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি করতাম। তাই ২০০২ সালে কর্মসূত্রে মহারাষ্ট্রে ছিলাম। ফলে তখন নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধনের সময়ে আমি হাওড়ায় বি গার্ডেনের বাড়িতে না থাকার কারণে কোনও ভাবে আমার নাম ভোটার তালিকায় ওঠেনি।’’ তাঁর বক্তব্য, ‘‘২০০২ সালের ভোটার তালিকায় আমার নাম না থাকতে পারে। কিন্তু ২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত আমি তো লোকসভার সাংসদ হয়েছিলাম। ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে তা হলে কী ভাবে সাংসদ হলাম? তবে কি বাংলাদেশ থেকে এসে ভারতের লোকসভায় সাংসদ হয়ে গেলে কেউ? এই প্রশ্ন আমি নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকদের করেছি।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘প্রথমত আমি সাংসদ ছিলাম। দ্বিতীয়ত আমি কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মচারী ছিলাম। ফলে নির্বাচন কমিশনের কাছে আমার সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য থাকার কথা। যদি না-ও থাকে তা হলেও নির্বাচন কমিশন সহজেই আমার সম্পর্কে তথ্য পেয়ে যেতে পারে।’’ প্রাক্তন সাংসদের অভিযোগ, ‘‘আসলে এ ভাবেই নির্বাচন কমিশন সাধারণ মানুষকে হয়রান করছে। শুধু আমাকে নয় নানা ছোট ছোট বিষয় নিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রান করছে।’’ তাঁর কথায়, ‘‘আমার মায়ের নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় ছিলে। ২০১৩ সালে মায়ের মৃত্যু হয়। শুনানিতে আমি মায়ের মৃত্যু-শংসাপত্র জমা দিয়েছি। মায়ের ভোটার কার্ড দিয়েছি। তা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকেরা আমার নাম ভোটার তালিকায় উঠবে বলে আশ্বস্ত করতে পারেননি। দেখা যাক কমিশন কী করে। অপেক্ষায় রইলাম।’’