আদিবাসী-মূলবাসীদের প্রধান উত্সব ‘মকর-পরব’কে ঘিরে জঙ্গলমহলের সর্বত্রই উত্সবের মেজাজ। জঙ্গলমহলে পৌষ সংক্রান্তির আগের রাতটা টুসু পুজোর রাত। বুধবার সকাল থেকে ঝাড়গ্রাম, বেলপাহাড়ি, লালগড়ের মতো বিভিন্ন জনপদের হাটেবাজারে শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা সারতে উপচে পড়েছিল জনজোয়ার। রাতভর আদিবাসী-মূলবাসীদের বাড়িতে টুসু পুজোর আয়োজন করা হয়। ফল-মূল, পিঠে ও খই-মুড়কির নৈবেদ্য সাজিয়ে এক রাতে ষোলোবার টুসুমণির পুজো করেন কুমারী ও এয়োতিরা। সারারাত গান শুনিয়ে ‘জাগিয়ে রাখা’ হয়েছিল সমৃদ্ধির দেবী টুসুমণিকে। এদিন বাড়ি-বাড়ি ‘আউছি’ চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি হয়েছিল পিঠে।
আজ, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে জঙ্গলমহলের বিভিন্ন নদি ও জলাশয়ে টুসুমূর্তি বিসর্জন দেওয়া শুরু হবে। টুসু ভাসানের পরে নদী-জলাশয়ে স্নান সেরে নতুন জামাকাপড় পরেন এলাকাবাসী। প্রথামতো বাড়ি-বাড়ি তিলজাত মিষ্টি ও রকমারি পিঠে তৈরি করা হয়। এদিন সাবেক প্রথা মেনে আদিবাসী, কুর্মি-সহ মূলবাসীদের বাড়িতে তৈরি করা হয় মাংসের পুর দেওয়া সুস্বাদু ‘মাঁস পিঠা’।
কাল, শুক্রবার পয়লা মাঘ। কুর্মি বা মাহাতো সম্প্রদায়ের নতুন বছর (কুর্মালি নববর্ষ)। এই দিনটি ‘এখ্যান যাত্রা’ অর্থাত্ যে কোনও শুভ কাজের জন্য প্রশস্ত বলে মনে করা হয়। বছরের প্রথম দিনটিতে কুর্মি-কৃষকেরা জমিতে ‘হালচার’ করেন। তিনবার লাঙল চালিয়ে প্রতীকী কর্ষণ করা হয়। পয়লা মাঘের দিনটিতে আবার ‘গরাম থানে’ অর্থাত্ গ্রাম-দেবতার স্থানে পশু-উত্সর্গেরও রেওয়াজ আছে।
কিন্তু এত আনন্দের মধ্যেও মন ভাল নেই ঝাড়গ্রামের কাশিয়া গ্রামের লাগদু হাঁসদা, ধোবাধোবিন গ্রামের শঙ্কর মাহাতো, বেলপাহাড়ির আনন্দ মুড়া, রসময় কালিন্দির মতো অনেক চাষির। কারণ, রাজ্য সরকারের তরফে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এখনও বেশির ভাগ জায়গায় সরকারি সহায়ক মূল্যে চাষিদের কাছ থেকে ধান কেনা শুরুই হয়নি।
অনেক কম দামে চাষির ঘর থেকে ধান কিনে নিচ্ছে ফড়েরা। উত্সবের আয়োজন করতে এবং ছেলেপুলে-পরিজনদের নতুন জামা-কাপড় কেনার জন্য ফড়ে ও মহাজনদের কাছে কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন অনেক প্রান্তিক ও ছোট চাষিরা। চাষিদের বক্তব্য, “সরকারি সহায়ক মূল্যে ধান কেনা শুরুর আগেই আমরা অভাবী বিক্রি করতে বাধ্য হই। ধান বেচে যে দুটো পয়সার মুখ দেখব তা আর হচ্ছে কোথায়?”
এত কিছুর মধ্যেও কোথাও চলছে মোরগ-লড়াই। কোথাও আবার পার্বণী-মেলা। অভাবের বারোমাস্যার মধ্যেও কয়েকটা দিনের জন্য দুঃখ ভুলে আনন্দে মেতেছেন সকলেই।