বড় শিল্প দূরের কথা, ছোট- মাঝারি শিল্পেও যে তেমন ভাবে সাড়া মিলছে না, সেই কথা মেনে নিলেন প্রশাসনিক কর্তারা। তাও আবার বাংলার প্রথম বিজনেস রিয়্যালিটি শো ‘এগিয়ে বাংলা’র এক প্রস্তুতি সভায়। ছোট-মাঝারি শিল্পের প্রসারে উদ্যোগপতিদের উৎসাহ দিতে এই শো হতে চলেছে। বুধবার মেদিনীপুরে জেলা শিল্প কেন্দ্রে ওই শো-এর এক প্রস্ততি সভার আয়োজন করা হয়। সভায় জেলার ক্ষুদ্রশিল্প কর্মাধ্যক্ষ অমূল্য মাইতি বলেন, “আগে তিনটে এ ধরনের বৈঠক করেছি। যেখানে বণিকসভার প্রতিনিধিরা ছিলেন। উদ্যোগপতিরা ছিলেন। যারা নতুন করে শিল্প করতে চান, তারাও ছিলেন। তবে আমি খুব হতাশ। এই জেলার মানুষ হিসেবেই এ কথা বলছি।”
ছোট- মাঝারি শিল্পের জন্য জমি পড়ে রয়েছে জানিয়ে কর্মাধ্যক্ষ বলেন, “আমরা কেরানিচটির কাছে প্রায় ২৫ একর জমি চিহ্নিত করে রেখেছি। প্লট করে ১৬৮ জন উদ্যোগপতিকে এই জমি দেওয়া যেতে পারে। অবশ্য এই সময়ের মধ্যে আমি দু’টি দরখাস্ত পেয়েছি, যারা ওখানে শিল্প করতে চান। দুঃখের কথা এর বেশি সাড়া পাইনি। ইউনিট সম্প্রসারণ করার একটি দরখাস্ত পেয়েছি।”
সভায় উদ্যোগপতিরাও তাঁদের নানা সমস্যার কথা জানান। কারও বক্তব্য সরকার ছোট- মাঝারি শিল্প গড়ার কথা বলছে, অথচ মার্কেটিং- এর ব্যবস্থা করছে না। কারও বক্তব্য, সরকার প্যাকেজিং- এর ব্যবস্থা করছে না। মার্কেটিং- প্যাকেজিং- এর ব্যবস্থা না- হলে আজকের দিনে মফস্সলের ক্ষুদ্র শিল্প চলবে কী করে? সভায় পশ্চিম মেদিনীপুর চেম্বার অফ কমার্সের সম্পাদক চন্দন বসু মেনে নেন, “এখানে প্যাকেজিংয়ের মান সে রকম নয় বলে আমরা পিছিয়ে পড়ি।” তাঁর মতে, “তবে আমরা যদি শুরুটা করি, তাহলেই অনেকটা এগিয়ে যেতে পারব। সেই ক্ষেত্রে এই ধরণের শো- এর পরিকল্পনা অভিনব।”
রাজ্যের ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প উদ্যোগ বিভাগের আয়োজনে এবং আইআইএম ক্যালকাটা ইনোভেশন পার্ক- এর সহযোগিতায় শুরু হতে চলেছে ‘এগিয়ে বাংলা’ শো। প্রশাসন সূত্রে খবর, কারও যদি ভাল কোনও ব্যবসার পরিকল্পনা থাকে (ইউনিক স্টার্ট- আপ বিজনেস আইডিয়া) যার কার্যকরী মডেল আছে কিংবা কেউ যদি গত তিন বছরের মধ্যে নতুন ব্যবসা শুরু করে থাকেন, তাহলে তার ধারণাকে বাস্তবায়িত করার জন্য এই শো এক অভিনব প্ল্যাটফর্ম। যাদের কাছে ভাল ব্যবসার পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও ব্যবসা শুরু করতে পারছেন না, তাদের দিশা দেখানোই এই শো-এর উদ্দেশ্য।
শো- এর প্রস্তুতি হিসেবে এ দিন জেলা শিল্প কেন্দ্রে এক সভা হয়। সভায় উত্সাহী উদ্যোগপতি এবং বণিকসভার প্রতিনিধিদের এই শোর উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানানো হয়। সভায় ছিলেন ‘আইআইএম ক্যালকাটা ইনোভেশন পার্ক’- এর অন্যতম কর্তা দেবপ্রতিম দাস। দেবপ্রতিমবাবু জানান, স্বনামধন্য জুরি এই রিয়্যালিটি শো থেকে বেছে নেবেন সেরাদের, যাদের পরিকল্পনা ভবিষ্যতে বাংলাকে আরও অনেকটা এগিয়ে দেবে। বিজেতারা পাবেন মূলধন প্রাপ্তির সুযোগ, প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতিদের পরামর্শ এবং শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাথমিক সহায়তা।
বস্তুত, রাজ্যে পালাবদলের পরে পশ্চিম মেদিনীপুরে নতুন করে বড় কারখানা সেই ভাবে হয়নি। উল্টে একের পর এক চালু কারখানা বন্ধ হয়েছে। কাজ হারিয়েছেন কয়েকশো শ্রমিক। বিরোধীদের দাবি, রাজ্য সরকারের শিল্পনীতির জন্যই একদিকে যেমন নতুন করে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। অন্য দিকে তেমন হাজার হাজার কর্মরত শ্রমিক রুজিরুটি হারাচ্ছেন। যে সব কারখানা রয়েছে, সিণ্ডিকেট থেকে তোলাবাজি, নানা সমস্যায় জর্জরিত তারাও।
সভায় জেলার ক্ষুদ্রশিল্প কর্মাধ্যক্ষ অমূল্যবাবু মেনে নেন, “স্বনিযুক্তি প্রকল্পে জেলা রাজ্যের মধ্যে সবথেকে বেশি ভর্তুকি পেত। তবে ধীরে ধীরে জেলার ভর্তুকির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নেওয়ার পরে অনেকেই আর ব্যাঙ্কের দরজা দেখছেন না। এটা ট্রেন্ড হয়ে উঠছে।” জমির চরিত্র পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা দেখা দিচ্ছে বলেও উদ্যোগপতিদের সামনে মেনে নেন অমূল্যবাবু। তবে তাঁর বক্তব্য, “যে সমস্যাগুলো রয়েছে সেটা কী ভাবে কাটিয়ে ওঠা যায়, আরও নতুন ইউনিট কী ভাবে গড়ে তোলা যায়, সেই নিয়ে আলোচনা
করতেই হবে।’’
তাঁর বক্তব্য, ‘‘জেলা শিল্প কেন্দ্র থেকে যে উত্সাহী উদ্যোগপতিদের ভর্তুকি দেওয়া হয়, তা অনেকেই জানেন না। যারা ভর্তুকি পেয়েছেন, তারাও পরিচিতদের জানান না।” অমূল্যবাবুর অবশ্য দাবি, শিল্পের প্রসারে বিশেষ করে ক্ষুদ্র শিল্পের প্রসারে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সব রকম পদক্ষেপ, সব রকম চিন্তাভাবনা করছেন। সভার প্রশ্নোত্তর- পর্বেই প্যাকেজিং- মার্কেটিং প্রভৃতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রশ্ন তোলেন উদ্যোগপতিরাই। একাংশ উদ্যোগপতি এও জানান, মফফ্সলের ছোট কারখানা থেকে পণ্য কেনা হয় না। সরকার বরং বড় কারখানা থেকেই পণ্য কেনে। এরফলে, ছোট কারখানাগুলো লাভের মুখ দেখতে পায় না। ধুঁকতে থাকে। সভা শেষে নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক ক্ষুদ্রশিল্পের কর্তা বলেন, “বিরোধী দলে থাকার সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে জমিনীতি ঘোষণা করেছিলেন, ক্ষমতায় আসার পরেও তা আঁকড়ে ধরে থাকায় এ রাজ্য থেকে বড় শিল্প মুখ ফিরিয়েছে। রাজ্যের আর্থিক কর্মকাণ্ড সঙ্কুচিত হওয়ায় চাকরির সুযোগ কমছে। তাই শিক্ষা শেষে চাকরির সন্ধানে ভিন্ রাজ্যে পাড়ি দেওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে।’’
সব শুনে জেলা শিল্প কেন্দ্রের জেনারেল ম্যানেজার প্রহ্লাদ হাজরার বক্তব্য, “যে শো হতে চলেছে, সেই শো প্রচলিত ধারণার থেকে একটু আলাদা। আইডিয়ায় সাফল্যের সম্ভাবনা আছে বলে মনে করলে যে কেউ এগিয়ে আসতে পারেন।” তাঁর কথায়, “কিছু সমস্যা থাকে, যেগুলোর সমাধান তাড়াতাড়ি হয় না।”