প্রসূতি ও শিশুদের পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার জন্য জেলার প্রায় প্রতিটি গ্রামে এক বা একাধিক অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র চালু রয়েছে। তা সত্ত্বেও পূর্ব মেদিনীপুর জেলার মোট শিশুর এক চতুর্থাংশ শিশু স্বাভাবিক ওজনের চেয়ে কম। সম্প্রতি (গত ৪ সেপ্টেম্বর) জেলা পরিষদের সভাকক্ষে আয়োজিত জেলার উন্নয়ন পর্যালোচনা বৈঠকে জেলার অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলিতে আসা শিশুদের ওজন ও পুষ্টি নিয়ে এমনই তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য বলছে, চলতি বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত জেলার সব কটি অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলি থেকে পাওয়া সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় অঙ্গনওয়াড়িগুলিতে ৩ লক্ষ ৬২ হাজার ৯০১ জন শিশু ওজন করা হয়েছে। এদের মধ্যে ২ লক্ষ ৬৮ হাজার ৭৯৬ টি শিশু স্বাভাবিক ওজনের। কিন্তু বাকি শিশুদের মধ্যে ৯১ হাজার ১১৭ জন তুলনামূলকভাবে কম ওজনের। আর ২ হাজার ৫৯৪ জন বেশ কম ওজনের। এদের মধ্যে জেলার মোট ৩৯৪ জন শিশু বৃদ্ধি জনিত সমস্যায় ভুগছে। এদের মধ্যে তমলুক, রামনগর-১, কাঁথি-১, মহিষাদল-১ (নন্দকুমার) প্রভৃতি ব্লকের পরিস্থিতি বেশ খারাপ ।
রিপোর্ট অনুযায়ী, তমলুক ব্লকের ২০ হাজার ৩৩৮ টি শিশুর মধ্যে ১৫ হাজার ৩১৭ জন শিশুর ওজন স্বাভাবিক হলেও বাকি শিশুদের মধ্যে ৪ হাজার ৮৯৮ জন শিশু মাঝারি রকমের কম ওজনের। আর ৮৩ জন শিশুর মারাত্মক কম ওজনের। এদের মধ্যে ৪০ জন বৃদ্ধিজনিত সমস্যায় ভুগছে। একইভাবে কাঁথি-১ ব্লকের ১১ হাজার ৭৬৩ জন শিশুর মধ্যে ৮ হাজার ৯৫০ জন শিশু স্বাভাবিক ওজনের হলেও ২ হাজার ৪৬৭ জন শিশু মাঝারি ধরণের কম ওজনের। আর ২৩১ জন শিশু মারাত্মক কম ওজনের। এদের মধ্যে ৫৫ জন শিশু বৃদ্ধিজনিত সমস্যায় ভুগছে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, প্রসূতি মা ও ৫ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের অপুষ্টি রোধ করতে জেলার প্রায় প্রতিটি গ্রামে ও শহরাঞ্চলে প্রতিটি ওয়ার্ডে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র রয়েছে। তারপর জেলার মোট প্রায় এক চতুর্থাংশ শিশু কেন কম ওজনের রয়েছে। ফলে মা ও শিশুদের পুষ্টিকর খাবার দেওয়া থেকে শুরু করে তাঁদের স্বাস্থ্যের প্রতি নজরদারি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রশাসনিক এক আধিকারিকের মতে, জেলার অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলিতে আসা শিশুদের পুষ্টি খাবার দেওয়ার কথা বলা হলেও খাবারের পরিমাণ ও গুণগত মান নিয়ে নজরদারির ক্ষেত্রে পরিকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে।
জেলার ২৭ টি অঙ্গনওয়াড়ি প্রকল্পে যেখানে মোট ২৭ জন শিশুবিকাশ প্রকল্প আধিকারিক থাকা সেখানে রয়েছে মাত্র ১৬ জন আর জেলায় মোট ৫৯৬৯ টি অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে নজরদারির জন্য মোট ২৫০ জন সুপারভাইজার থাকার কথা সেখানে রয়েছে মাত্র ১১৫ জন। জেলার বিভিন্ন ব্লক মিলিয়ে মোট প্রায় ৫০০ টি অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে স্থায়ী কর্মী এবং প্রায় সাড়ে ৯০০ টি অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে সাহায্যকারী নেই। ফলে এইসব অঙ্গনঅয়াড়ি কেন্দ্রে মা ও শিশুদের দেখভাল করা ও তাঁদের পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। অঙ্গনওয়াড়ি প্রকল্পের জেলা প্রকল্প আধিকারিক জাফর ইমাম বলেন, ‘‘জেলায় অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলিতে কর্মী ও সাহায্যকারী নিয়োগের পরীক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে বর্তমানে আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকায় শূন্য পদ পূরণ হচ্ছে না। তবে জেলায় কম ওজনের শিশুদের চিহ্নিত করে তাঁদের পুষ্টিকর খাবার দিয়ে স্বাভাবিক ওজনের করে তোলার জন্য চেষ্টা চালানো হচ্ছে।’’
জেলায় শিশুদের একাংশের অপুষ্টির সমস্যার কথা স্বীকার করে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদের সভাধিপতি মধুরিমা মণ্ডল, ‘‘জেলার কয়েকটি ব্লকে এখনও শিশুদের একাংশের পুষ্টির সমস্যা রয়েছে। এইসব এলাকায় শিশুদের পুষ্টির খামতির কারণগুলি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’ পূর্ব মেদিনীপুরের জেলাশাসক অন্তরা আচার্য বলেন, ‘‘জেলায় শিশুদের অপুষ্টি রুখতে কম ওজনের শিশুদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করে তাদের ওজন বৃদ্ধির জন্য প্রতিদিন ডিম-সহ বিশেষ পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। জেলার অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র গুলিতে প্রসূতিও শিশুদের নিয়মিত পুষ্টিকর খাওয়ার দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের চিকিৎসার উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে । কম ওজনের শিশুদের জন্য মুগবেড়িয়ার মত জেলার শহিদ মাতঙ্গিনী ব্লকে ‘নিউট্রিশনাল রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার’ চালুর অনুমতি পাওয়া গিয়েছে। শীঘ্রই তা চালুর চেষ্টা করা হচ্ছে।’’