মাথার উপরে তখন ঘুরছে গাজনের চরক। শাল কাঠের গুড়ির উপরে বাঁশ আর দড়ির সঙ্গে বাঁধা স্টিলের বড়শির সঙ্গে গেঁথে আছে মানুষটার পিঠের পুরু চামড়া। মেলা প্রাঙ্গণে তখন কয়েক হাজার মানুষের ভিড়। বড়শিতে গাঁথা মানুষটা তখন ঘুরছেন মাথার উপর। বনবন করে।
অবাক বিষ্ময়ে তাকিয়ে আছেন কেউ। কেউ আবার ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলেছেন। বাকি সন্ন্যাসীরা কিন্তু নিশ্চিন্ত। কারণ প্রতি বছর এমন ভাবে গাজন মেলায় পিঠে বড়শি গেঁথে ঘোরেন দুই থেকে তিন জন। ইনিও তাঁদের এক জন। কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে আচমকা মাটিতে ছিটকে পড়লেন মানুষটা। নাকাশিপাড়ার তৈবিচারার গাজন মেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ উত্তর বহিরগাছির বাসিন্দা কেশরী মন্ডল(৫২)।
বছরের পর বছর ধরে তিনি এ ভাবেই গাজনমেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠেছিলেন। অভিজ্ঞতায় ছিলেন বট বৃক্ষের মত। সেই মানুষটাই কি না ছিটকে পড়ল মাটিতে।
ভয়ে-আতঙ্কে শুরু হয় ছোটাছুটি। চিৎকার করে ওঠেন অনেকেই। তারই মধ্যে ছুটে আসেন অন্যান্য সন্ন্যাসীরা। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে নিয়ে আসা হয় বেথুয়াডহরি গ্রামীণ হাসপাতালে। সেখান থেকে শক্তিনগর জেলা হাসপাতাল হয়ে কলকাতার এনআরএসে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হারতে হল মৃত্যুর কাছে। শনিবার মাঝ রাতে সেখানে মৃত্যু হল মানুষটার।
প্রাথমিক তদন্তের পরে পুলিশের অনুমান, মানুষটার শরীর বেশ ভারী হয়ে গিয়েছিল। স্টিলের বড়শি দু’টো সেই ভার নিতে পারেনি। ঘোরার সময় ভার রাখতে না পেরে সোজা হয়ে যাওয়ায় খুলে যায় কেশরী মণ্ডলের পিঠ থেকে। ছিটকে পড়েন তিনি।
অন্যান্য বারের মত এ বারও গাজনের মেলা দেখতে গিয়েছিলেন বেথুয়াডহরির বাসিন্দা অনুপ মণ্ডল। তিনি বলেন, “একটু দূরে দাঁড়িয়েই দেখছিলাম। লোকটা পিঠে বড়শি গেঁথে ঘুরছেন। হঠাৎ চোখের সামনে ছিটকে পড়তে দেখলাম মাটিতে। দৃশ্যটা মনে পড়তেই ভয়ে শিউড়ে উঠছে গা।”
প্রায় ৩০ বছর ধরে এই গাজন মেলা হয়ে আসছে। প্রতি বারই এমন ভাবে বড়শিতে পিঠ গেঁথে ঘোরে সন্ন্যাসীরা। কিন্তু কোনও দিন এমন ঘটেনি। এ বারের ঘটনায় তাই আতঙ্কে মানুষ।