Advertisement
E-Paper

মরা ময়দানে দীপাই জিয়নকাঠি

বাবার হাত ধরে সাদা কিট কাঁধে গুটি-গুটি পায়ে ক্রিকেট কোচিং ক্যাম্পে যায় ক্লাস ফোরের ছেলে।হাতে বুট আর মোজা ঝুলিয়ে ফুটবলে যায় কলেজের ছোকরা।কেউ সাঁতারে যায়।কেউ যায় ক্যারাটে শিখতে (এটা এখন নতুন চল)।তা বলে জিমন্যাস্টিকস?

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ১১ অগস্ট ২০১৬ ০২:০৬

বাবার হাত ধরে সাদা কিট কাঁধে গুটি-গুটি পায়ে ক্রিকেট কোচিং ক্যাম্পে যায় ক্লাস ফোরের ছেলে।

হাতে বুট আর মোজা ঝুলিয়ে ফুটবলে যায় কলেজের ছোকরা।

কেউ সাঁতারে যায়।

কেউ যায় ক্যারাটে শিখতে (এটা এখন নতুন চল)।

তা বলে জিমন্যাস্টিকস?

হিহিহিহি... যে শোনে, সে-ই হাসে। সে হাসি শুনে কচি মুখগুলো শুকিয়ে যায়।

মলিন ভাঙাচোরা ক্লাবঘর। বেশির ভাগ সাজ-সরঞ্জাম নেই। আর এ দিক ও দিক থেকে উড়ে আসা উপহাস।

সেই মলিন মুখগুলোই এই ক’দিন হল নতুন আশায় ঝলসে উঠেছে। সে আশার নাম দীপা কর্মকার। প্রতিটি মুখ রাতদিন মনে-মনে প্রার্থনা করছে, দীপা যেন পদক পায়!

এই আকুল চাওয়ার ছবিটা ধরা পড়ছে নবদ্বীপের ছাত্রী প্রজ্ঞাপারমিতা সাহার কথায়— ‘‘দীপা মূল পর্বে উঠে যাওয়ার পর থেকে যতবার অনুশীলন করতে নামছি, কেমন একটা অদ্ভূত অনুভুতি হচ্ছে। এখন মনপ্রাণ দিয়ে ঠাকুরকে ডাকছি, ও যেন মেডেল পায়। ওই মেডেল আমাদের সকলের মেডেল হয়ে উঠবে।’’

কেন?

প্রজ্ঞা বলছে, ‘‘এত দিন যে সব সুযোগ পাইনি, ওই মেডেলের জোরে সেগুলো হয়ত পাব। আর ঠিকঠাক প্রশিক্ষণ, ঠিক সুযোগ যদি পাই, আমরাই বা কেন পারব না? দীপাকে বারবার এই কথাটাই মনে হচ্ছে।’’

আসলে জিমন্যাস্টিকসের গল্পটা দীর্ঘদিন ধরেই বঞ্চনার গল্প।

একটা সময় ছিল যখন নদিয়া জেলা জুড়ে জিমন্যাস্টিকসের যথেষ্ট জনপ্রিয়তা ছিল। আগ্রহ ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সরকারি উপেক্ষা আর বঞ্চনার কারণে উৎসাহ শুকিয়ে গিয়েছে। একে একে কৃষ্ণনগর, রানাঘাট, শান্তিপুরে বন্ধ হয়ে গিয়েছে প্রশিক্ষণ। অনেক লড়াই করে কোনও মতে টিকে আছে নবদ্বীপ ও চাকদহে। তাও দিন-দিন কমছে খেলোয়াড়ের সংখ্যা। কমছে প্রশিক্ষকের সংখ্যাও।

একই অবস্থা মুর্শিদাবাদেও। নেই আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত প্রশিক্ষণের সুযোগ। সেই পরিকাঠামো। নেতাজি সুভাষচন্দ্র ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশন থেকে জিমন্যাস্টিক়সের প্রশিক্ষণ নিয়ে আসা প্রশান্ত প্রামাণিক বলছেন, ‘‘ক্লাবের মাঠে ঘাসের উপরেই প্রশিক্ষণ দিতে বাধ্য হই আমরা। আগের উৎসাহ এখন উবে গিয়েছে। জিমন্যাশিয়ামে এখন ছেলেমেয়েরা আসে না বললেই চলে। ১৫-১৬ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ছাত্রী। তারা আসে সৃজনশীল নৃত্যে জিমন্যাস্টিকসের কৌশল ব্যবহার করবে বলে। কিছু দিন প্রশিক্ষণ নিয়ে চলে যায়।’’

প্রায় বিশ বছর ধরে নিজেদের মাঠে প্রশিক্ষণ শিবির চালিয়ে আসছে চাকদহের শিমুরালি সাংস্কৃতিক সঙ্ঘ। এখন শিক্ষার্থী-সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মোটে তেরোয়। এক সময়ে জাতীয় স্তরেও সাফল্য পেয়েছিল এখানকার শিক্ষার্থীরা। এখন কেন এমন হাল? কোচ পার্থ রায়ের পাল্টা, “খেলার জগতে তো জিমন্যাস্টিকসকে গুরুত্বই দেওয়া হয় না! দীপা কর্মকারের জন্যই অনেক দিন পরে মানুষের মুখে জিমন্যাস্টিকসের নাম শুনছি।”

শিমুরালির সঙ্ঘে জিমন্যাস্টিকস করার কোনও ঘর নেই। যে দশ রকম সরঞ্জাম লাগে, তার বেশির ভাগটাই টাকার অভাবে কেনা যায়নি। ‘‘অনুশীলনের জন্য একটা ভাল ম্যাট পর্যন্ত কিনতে পারি না। সরকারি স্তরে কোনও সাহায্য পাই নি।’’ — হতাশ পার্থবাবু।

নবদ্বীপে ৪০ বছর ধরে প্রশিক্ষণ শিবির চালিয়ে আসা রতনলাল সাহা বলছেন, “খড়ের উপরে চট বিছিয়ে বাঁশ, দড়ি আর গাড়ির টায়ার হল আমাদের সম্বল। সামান্য ম্যাট কিনতে আমাদের ছেলেমেয়েদের রিয়্যালিটি শো করতে হয়!” তিনিও চেয়ে আছেন দীপার সাফল্যের দিকে। তাঁর কথায়, ‘‘এ বার যদি সরকারের নজর মফস্সলের এই সব ছেলেমেয়েদের উপরে পড়ে।’’

এই ছেলেমেয়েদের অনেকেই কিন্তু দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করে এখনও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

বহরমপুর গাঁধী কলোনির ইটের গাঁথনি দেওয়া টালির ছাউনির নিচে ঘুপচি ঘরে বেড়ে ওঠা হৃদয় দত্ত যেমন। জিমন্যাস্টিকসে তার আগ্রহ সেই চতুর্থ শ্রেণি থেকে। এখন সে প্রথম বর্ষের ছাত্র। বাবা হারাধন দত্ত লালদিঘি পাড়ায় বড় রাস্তার ধারে ঠেলাগাড়িতে সকাল থেকে দুপুর রুটি-তরকারি বিক্রি করেন। অন্ধকার থাকতে উঠে পড়ে বহরমপুর ব্যারাক স্কোয়ার ময়দানে একা জিমন্যাস্টিকস প্র্যাকটিস করে চলে হৃদয়। বেলা বাড়লে বাবাকে সাহায্য করতে ছুটতে হয়। বিকেলে বিবেকানন্দ ব্যায়াম সমিতি ক্লাবে গিয়ে প্রশান্তবাবুর কাছে পাক্কা ৩-৪ ঘণ্টা অক্লান্ত পরিশ্রম। ‘‘এত খাটে, কিন্তু পুষ্টিকর খাবার ওকে আমরা দিতে পারি না’’— আক্ষেপ বাবা হারাধনবাবুর। তাঁরাও তাকিয়ে আছেন দীপার দিকে।

নবদ্বীপের শুভঙ্কর কুণ্ডুর গলায় ক্ষোভ— ‘‘আমাদের বন্ধুরা কাজাখস্তান এশিয়ান গেমসে টাকার অভাবে যেতে পারেনি। ক্রিকেট ফুটবল ছাড়া আমাদের দেশে তো সব খেলাই দুয়োরানি!’’ তার মতো জয়শ্রী অধিকারী, আকাশ হালদারেরাও তাকিয়ে আছে দীপার দিকে।

শান্তিপুর ব্যায়াম সমিতির বছর তিনেক আগে তাদের শিবির বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। তাদের প্রশিক্ষক প্রশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “না আছে সম্মান, না আছে অর্থ। ছেলেমেয়েরা কেন আসবে বলতে পারেন?” রাজ্যস্তরে সংগঠকদের দু’টি গোষ্ঠীর কোন্দলও পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে। জাতীয় স্তরেও প্রায় একই অবস্থা। পার্থবাবু বলেন, “এ বছর তো জাতীয় প্রতিযোগিতাটুকুও করতে পারল না। ভাবুন এক বার!”

ফলে, ক্লাবের কর্তারাও আর এ নিয়ে বিশেষ উৎসাহ দেখাচ্ছেন না। বহরমপুর বিবেকানন্দ ব্যাম সমিতির কর্তা বিশ্বরূপ মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘টাকা খরচ করে সরঞ্জাম কিনে দেওয়ার পরে যদি ছাত্রছাত্রী না আসে, তা হলে পড়ে সব নষ্ট হবে।’’

তবে এর মধ্যেও আশার আলো এক দম কচি কিছু মুখ। বহরমপুরের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী প্রমিতা সিংহ যেমন সবে জিমন্যাস্টিকস শেখা শুরু করেছে। সে বলছে, ‘‘দীপাদি যদি জেতে আমরাও জিতব।’’

দীপাই আপাতত পরের প্রজন্মের ‘রোল মডেল’। প্রায় কোমায় চলে যাওয়া একটা খেলার ফুসফুসে এক ঝলক তাজা অক্সিজেনও বটে!

Deepa karmakar
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy