Advertisement
E-Paper

মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাস, আস্থা তবু ফড়েতেই

বাজার দরের থেকে সরকার চাষিদের ধানের কুইন্ট্যাল প্রতি অন্তত তিনশো টাকা করে বেশি দিচ্ছে। এ বছর সরকার চাষিকে কুইন্ট্যাল প্রতি ধানের দর দিচ্ছে ১৭৫০ টাকা।

মনিরুল শেখ এবং কার্তিক সরকার

শেষ আপডেট: ০৫ জানুয়ারি ২০১৯ ০৫:২৯
চাষির কাছে দু’দিন কাজ কামাই করে মান্ডি যাওয়া মানে আর্থিক ক্ষতি। ছবি: সংগৃহীত।

চাষির কাছে দু’দিন কাজ কামাই করে মান্ডি যাওয়া মানে আর্থিক ক্ষতি। ছবি: সংগৃহীত।

ফড়েদের রুখে দিয়ে সরকারি ভাবে ধান বিক্রির কথা বলেছেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী। গত বৃহস্পতিবার বীরভূমের ইলমবাজারে বাউল ও লোক উৎসবের সূচনা করতে করতে এসে চাষিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘‘ফড়েদের কাছে কোনওমতেই কম দামে ধান বিক্রি করবেন না। নিজের ধান দিন, নিজে চেক নিন।’’

বাজার দরের থেকে সরকার চাষিদের ধানের কুইন্ট্যাল প্রতি অন্তত তিনশো টাকা করে বেশি দিচ্ছে। এ বছর সরকার চাষিকে কুইন্ট্যাল প্রতি ধানের দর দিচ্ছে ১৭৫০ টাকা। আর প্রতি কুইন্ট্যালে সরকার ২০ টাকা করে অতিরিক্ত ভাতাও দিচ্ছে। খোলা বাজারে সেই ধানের দর খুব বেশি হলে হাজার দেড়েক টাকা। তা সত্ত্বেও সমস্ত চাষি সরকারের কাছে ধান বেচছেন না কেন? কেন ধান ক্রয়ের মান্ডি বা সমবায়ের কাছে যেতে তাঁদের একাংশের অনীহা?

চাষিরা অনেকেই জানাচ্ছেন, প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে সরকারি ধান মন্ডিতে উজিয়ে আসতে যা খরচ হয় তার সঙ্গে বাড়ি বসে ফড়েকে ধান বিক্রি করে যে রোজগার তার তেমন তফাৎ নেই। বরং ধানের বোঝা বয়ে মান্ডিতে গিয়ে চাষিকে বাড়তি সমস্যায় পড়তে হয়। প্রথমের দিকে জেলায় মাত্র ১৬টি মান্ডির মাধ্যমে ধান কেনা হচ্ছিল। সমবায় ছিল মেরেকেটে ১১টি। আর প্রায় সব মান্ডির অবস্থান জাতীয় সড়কের ধারে। গোটা পনেরো পঞ্চায়েত-পিছু রয়েছে একটি করে মান্ডি। চাষির বাড়ি থেকে মান্ডির দূরত্ব বেশ কয়েক কিলোমিটার। সেখানে পৌঁছনোটা একটা বড় সমস্যা।

তার উপরে সরকারের ধান কেনা একটা দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়া। অনেক মান্ডির নিয়ম, প্রথমে চাষিকে নাম নথিভুক্ত করতে হবে। অন্য এক দিন এসে ধান বেচতে হবে। চাষির কাছে দু’দিন কাজ কামাই করে মান্ডি যাওয়া মানে আর্থিক ক্ষতি। চাপড়ার এক চাষি বলছেন, ‘‘আমাদের বাড়ির কাছাকাছি মান্ডিতে তো প্রথমের দিকে রাতেও ধান নিয়ে লাইন দিতে হয়েছে। গরীব চাষি এত অপেক্ষা করতে পারেন না। কারণ, ঋণ করে জল ও সার কিনতে হয় চাষিকে। সেই ঋণ দ্রুত মেটাতে হয়। মাঠ-শ্রমিকের মজুরি দিতে হয় নগদে। ফলে ছোট জোতের চাষি কখনও ধান মজুত রাখতে পারেন না। সমবায়ের ভরসায় বসে থাকতে পারেন না। ধান ঝাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফড়েদের কাছে তিনি তা দ্রুত বেচে টাকা নিয়ে নেন।’’

নাকাশিপাড়ার চাষি ওহিদ মণ্ডল জানান, মান্ডিতে সব সময়ই বসে থাকেন চালকল মালিকেরা। জেলার ৯টি চালকল সরকারের কাছ থেকে ধান কিনছে। এক কুইন্ট্যাল ধান নিয়ে গেলে মিলের লোক প্রথমেই ধানের নানা রকমের খুঁত ধরেন। বলেন, ‘‘ধানের মান খারাপ। ধানে নোংরা-আবর্জনা রয়েছে।’’ এই সব নানা অছিলায় তাঁরা চাষিদের কাছ থেকে কুইন্ট্যাল পিছু অন্তত ১০ কিলোগ্রাম করে বেশি ধান নেন।’’ মিল মালিকেরা জানাচ্ছেন, এক কুইন্ট্যাল ধান কিনলে সরকারকে ৬৮ কিলোগ্রাম চাল দিতে হয়। সেই চাল ভাঙা বা হলুদ হলে সরকার শোনে না। ফলে চাষিদের কাছ থেকে ধান কেনার সময়ে ভাল করে ধানের মান যাচাই করতে হয়। কৃষি আধিকারিক শ্যামাপ্রসাদ মজুমদার অবশ্য বলেন, “এই খুঁত ধরা এবং বেশি ধান নিয়ে নেওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই। এটি এগ্রিকালচার মার্কেটিং ডিপার্টমেন্ট নিয়ন্ত্রণ করে।’’

গয়েশপুর সরকারি পলিটেকনিক কলেজের এক ছাত্র দিন কয়েক আগেই যেমন বলছিলেন, ‘‘আমার বাড়ি পলাশিতে। চাষিদের থেকে স্থানীয় মান্ডি বেশি করে ধান নিচ্ছিল। পরে প্রশাসনের দ্বারস্থ হওয়ার কথা বলায় আপাতত তা বন্ধ হয়। কিন্তু সব চাষি তো আর প্রশাসনের কাছে যেতে পারে না। তাঁরা অনেকে প্রশাসনিক ভবনও চেনেন না। ফলে ঝামেলা এড়াতে ধান নিয়ে মান্ডিতে যান না। বাড়িতে ফড়ের কাছে বিক্রি করলে এ সব সমস্যা থাকে না।’’ যদিও নগরউখরার এক ধান ব্যবসায়ী বলেন, ‘‘আসলে চাষিরা বোঝেন না ফড়েরা ধান কেনার সময় হাতের কারসাজিতে ঠিক বেশি ধান বের করে নেন।’’

মান্ডিতে যাওয়ার ঝক্কি থেকে চাষিকে বাঁচানোর উপায়, বেশি করে সমবায় সমিতিকে ধান কেনার কাজে নামানো। অবশ্য প্রথমের দিকে মাত্র কয়েকটি সমিতি ধান কেনা শুরু করলেও সমবায় দফতর জানাচ্ছে, এই মুহূর্তে ৩৫টি সমিতি ও মহিলাদের কয়েকটি গোষ্ঠী ধান কিনছে। জেলার আরও ৫০টি সমিতিকে এ কাজে নামানো হবে বলে দাবি দফতরের কর্তাদের। এ নিয়ে চলতি মাসের ৮ তারিখে কলকাতার নজরুল মঞ্চে বৈঠক রয়েছে।

করিমপুর এলাকার ফড়ে বিশ্বনাথ মন্ডল। তাঁর দাবি, “নানা কারণে চাষি সরকারি ধান ক্রয়কেন্দ্রে যায় না। কেউ আমাদের ধান বিক্রি করলে আমরা কিনি, কিন্তু আমরাও সরাসরি সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে বিক্রি করতে পারি না। আমরা বড় ফোড়েকে বিক্রি করি।’’ তাঁর আরও বক্তব্য, ‘‘ আমরা ১১৮০ টাকায় চাষিদের কাছ থেকে কিনলে ১২২০ টাকায় অন্য বড় ফরেকে দিই। মাঝের টাকাটা আমাদের কমিশন। এ ভাবেই হাত বদল হতে হতে চাষির ধান সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে যায়।’’

Mamata Banerjee
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy