মূক-বধির কন্যার ধর্ষকদের শাস্তির দাবি তুলেছিলেন তিনি। আঙুল তৎকালীন শাসকদলের এক কর্মীর দিকে। প্রায় তিন দশক আগে তাঁর অভিযোগ ঘিরে তপ্ত হয়েছিল রাজ্য রাজনীতি। বিচারের দাবিতে মা-মেয়েকে নিয়ে মহাকরণ অভিযান করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই মা ফেলানি বসাকের মৃত্যু হল সোমবার। বয়স হয়েছিল প্রায় ৯১ বছর।
নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকের ঘটনা। ফেলানি তাঁর মূক ও বধির মেয়ের ধর্ষণের বিচার চাইতে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। নদিয়ার কংগ্রেসনেতারা তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলেন মমতার কাছে। পিভি নরসিংহ সরকারের মন্ত্রিমণ্ডলীর সদস্য মমতা ফেলানি এবং তাঁর কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে মহাকরণে যান। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁদের সাক্ষাতের অনুমতি দেয়নি পুলিশ। নাছোড় মমতা মহাকরণের অলিন্দে অবস্থান শুরু করেছিলেন। সেই অবস্থানের পাশ কাটিয়েই পুলিশি প্রহরায় মুখ্যমন্ত্রী বসু মহাকরণ ছেড়ে যান। রাত পর্যন্ত অবস্থানের পরে সেখান থেকে পুলিশ টেনেহিঁচড়ে বার করে মমতা-সহ ফেলানিদের লালবাজারে নিয়ে গিয়েছিল। গভীর রাতে মমতাকে লালবাজার থেকে বার করে দেওয়া হয়। তিনি হাঁটতে হাঁটতে চলে যান মেয়ো রোডে গান্ধীমূর্তির পাদদেশে। সেখানেই রাত থেকে অবস্থান শুরু করেন তিনি। পরদিন সকালে প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি গিয়ে বুঝিয়েসুজিয়ে অবস্থান প্রত্যাহার করান।
২০০৯ সালে ফেলানির ‘ধর্ষিতা’ মেয়ের মৃত্যু হয় সাপের কামড়ে। তার পরে থিতিয়ে যায় মামলার গতিপ্রকৃতিও। নদিয়ার ফুলিয়ার বাসিন্দা ফেলানির পরিবার সূত্রে খবর, গত দু’বছর ধরে একপ্রকার শয্যাশায়ী ছিলেন বৃদ্ধা। সোমবার জীবনাবসান হয় তাঁর। শেষ দিন পর্যন্ত দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই ছিল তাঁর। প্রতিবেশীদের দাবি, বাম আমলে ফেলানির বিপিএল কার্ড ছিল না। পরিবারের দাবি, তৃণমূল আমলে বার্ধক্যভাতাও পাননি। সুতো কেটে দিন গুজরান করতেন। তাঁর পুত্র নিখিলের বয়স প্রায় ষাট ছুঁইছুঁই। শ্রমিক ছিলেন। এখন অসুস্থ। পুত্রবধূ শান্তিরানি ছোটখাটো কাজ করে কোনও ভাবে সংসার টানেন।
আরও পড়ুন:
ফেলানির মৃত্যুর খবর পেয়ে শান্তিপুরের তৃণমূল বিধায়ক ব্রজকিশোর গোস্বামী তাঁর বাড়িতে গিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। বছর কয়েক আগে ফেলানি বলেছিলেন, ‘‘আশা করেছিলাম, তিনি (মমতা) বিচার পাইয়ে দেবেন। কিন্তু তিনি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেও ধর্ষকের বিরুদ্ধে কোনও মামলা শুরু হয়নি।’’ প্রসঙ্গত, ফেলানির ‘ধর্ষিতা’ কন্যাকে দীর্ঘ দিন রাখা হয়েছিল ইএম বাইপাসের কাছে একটি সরকারি হোমে। সেখানে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন তিনি। হোম কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিলেন, শিশুকে বড় করার মতো শারীরিক বা মানসিক অবস্থা এবং আর্থিক সঙ্গতি, কোনওটাই তার মায়ের নেই। তাই মা-মেয়ের মধ্যে বন্ধন তৈরি হওয়ার আগে তাঁদের আলাদা করা দেওয়া হয়েছে।’’ তবে মমতার রাজনৈতিক যাত্রায় ফেলানি এক উল্লেখযোগ্য নাম। মহাকরণ অভিযানের পরে সিঙ্গুর আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণআন্দোলনে তাঁকে সামনের সারিতে রেখেছিল তৃণমূল।