E-Paper

সংখ্যালঘু ভোটের অঙ্কই আসন জয়ের জিয়নকাঠি

আপাতত সাবিনাকে সামনে রেখেই নিজেদের একদা-শক্তিশালী ঘাঁটি কালীগঞ্জে জমি ফিরে পেতে চাইছে বামেরা।

সুস্মিত হালদার

শেষ আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:২৯
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

পড়ন্ত বিকালে ঘাসুড়িয়াডাঙায় জগৎখালি বাঁধের উপর দিয়ে লালঝান্ডা হাতে এগিয়ে চলেছে জনা দশেকের একটা দল। ভাগীরথীর পাশ বরাবর প্রায় সাড়ে চোদ্দ কিলোমিটার চলে গিয়েছে এই বাঁধ। ২০০০ সালের ভয়াবহ বন্যায় এই বাঁধ ভেঙেই নদীর জল ঢুকে ভাসিয়েছিল নদিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা।

মিছিলের সামনে কালীগঞ্জ কেন্দ্রের সিপিএম প্রার্থী সাবিনা ইয়াসমিন— গত বছর উপনির্বাচনের ফল প্রকাশের দিন দুষ্কৃতীদের ছোড়া বোমায় নিহত বছর দশেকের তামান্না ‌শেখের মা। বাঁধের উপর রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রামবাসীর হাত ধরে সাবিনা বলছেন, “ওরা আমার তামান্নাকে খুন করেছে। মেয়েটাকে সুবিচার আদায় করতে আমাকে ভোট দিন।” কখনও বা সোজা ঢুকে যাচ্ছেন বাঁধের নীচে কোনও বাড়ির উঠোনে। সেই একই কথা, সেই একই আকুতি।

আপাতত সাবিনাকে সামনে রেখেই নিজেদের একদা-শক্তিশালী ঘাঁটি কালীগঞ্জে জমি ফিরে পেতে চাইছে বামেরা। তৃণমূল নেতারা বলছেন, “রিজ়ওয়ানুরের দাদা রুকবানুর রহমানকে তৃণমূল প্রার্থী করার মতোই তামান্নার মৃত্যুকে হাতিয়ার করতে চাইছে সিপিএম। কিন্তু আমাদের নেত্রী আন্দোলনকে যে পর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন, সিপিএম কি তার একাংশও পেরেছে?” কথাটা ফেলে দেওয়ার নয়। তা ছাড়া সাবিনাকে প্রার্থী করায় প্রবল ক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছিল জেলা নেতাদের। দলের অনেক কর্মীই এখনও তাঁকে পুরোপুরি মেনে নিতে পারেননি।

তবুও আশায় বুক বেঁধে বাম নেতারা ভোটের অঙ্ক কষছেন। ২০১১ সালের পালাবদলের বছরে এই কেন্দ্রে সিপিএম পেয়েছিল প্রায় ৩৬ শতাংশ ভোট। ২০১৬ সালে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে তারা প্রায় ৪৬ শতাংশ ভোট ঘরে তোলে। ২০১৯ সালে জোটের জনভিত্তিতে প্রবল ধস নামে। ভোট নেমে যায় প্রায় ৯ শতাংশে, ২০২১ সালে ফের তা সামান্য বেড়ে প্রায় ১২ শতাংশে উঠে আসে। ২০২৪ সালে লোকসভা ভোটে প্রায় ১৮ শতাংশ ভোট আসে জোটের ঝুলিতে।

উল্টো দিকে, তৃণমূল ২০২১ সালের চেয়ে ২০২৪ সালে প্রায় ৭ শতাংশ ভোট কম পেয়েছে। বিজেপির ভোট বেড়েছে এক শতাংশেরও কম। এই হিসেব সামনে রেখে সিপিএমের এক নেতা বলছেন, “একমাত্র বামেদের ভোটই কিন্তু উল্লেখ যোগ্য ভাবে বেড়েছে।” হয়তো সেই কারণেই সিপিএম প্রার্থীকে পুরোপুরি অস্বীকার করতে পারছে না তৃণমূল-বিজেপি। কারণ জিততে না পারলেও তাদের ভোট কমা-বাড়ার উপর কালীগঞ্জের ভাগ্য অনেকটাই নির্ভর করছে। সিপিএমের ভোট বাড়লে তা সরাসরি তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্কে ধাক্কা মারবে।

এসআইআরে এই কেন্দ্রে প্রায় সাড়ে ২৩ হাজার নাম কাটা গিয়েছে, তার বেশির ভাগই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের যাঁদের বেশির ভাগের ভোট তৃণমূলই পায় বলে ওয়াকিবহাল মহের ধারণা। তার উপর হুমায়ুন কবীরের আম জনতা উন্নয়ন পার্টিও প্রভাব বিস্তার করছে। প্রার্থী দিয়েছে মুসলিম লিগ। আছে কংগ্রেসও। প্রায় ৫৯ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটারের এই কেন্দ্রে মুসলিম ভোট টানতে মরিয়া প্রায় সকলেই।

তবে তৃণমূলের পাল্টা হিসাবও ফেলে দেওয়ার নয়। এই কেন্দ্রে গ্রাম পঞ্চায়েত আছে ১৩টি। তার মধ্যে হাঁটগাছা, বড়চাঁদঘর ও পলাশি ১ গ্রাম পঞ্চায়েতের মতো সংখ্যালঘু-প্রধান এলাকায় তারা ৩০-৩২ হাজার ভোটের লিড পাবে বলে তৃণমূলের বিশ্বাস। ও দিকে কালীগঞ্জ, ফরিদপুর, গোবরা ও দেবগ্রাম পঞ্চায়েত থেকে বিজেপি লিড পেলেও তা সংখ্যালঘু এলাকার লিডের তুলনায় কমই হবে বলে মনে করা হচ্ছে। বাকি ছ’টি গ্রাম পঞ্চায়েত মিশ্র এলাকা, জোর টক্কর হবে। কিন্তু হাটগাছা, মীরা ২ ও পলাশি ২ গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় কান পাতলে অন্তর্ঘাতের চোরা শব্দও শোনা যাচ্ছে! মাত্র আট মাস আগে উপনির্বাচনে প্রায় ৪৭ হাজার ভোটে জিতেছেন তৃণমূল প্রার্থী আলিফা আহমেদ। তিনি বলছেন, “ও সব বিরোধীদের বানানো গল্প। দলের সবাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য খাটছেন।”

২০১৯ সাল থেকে এই কেন্দ্রে বিজেপির ভোট প্রায় একই আছে— ৩১ থেকে ৩২ শতাংশের আশপাশে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বিজেপির একমাত্র ভরসা হবে সংখ্যালঘু ভোট কাটাকুটির খেলা। তবে দলের প্রার্থী বাপন ঘোষের দাবি, “গত লোকসভা ভোটে তৃণমূল প্রায় সাত শতাংশ ভোট কম পেয়েছিল। তার উপর এসআইআর যা ভোট খেয়েছে, সেটাও যোগ করুন। জয় আমাদের হবেই।”

তপ্ত দিনের শেষে রাস্তায় পাক খাচ্ছে ধুলো। হাওয়ার গতিক যেমন।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Kaliganj Minority

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy