লেখাপড়ার ফাঁকে সময় পেলেই হইহই করে গ্রামের মেঠোপথ ধরে চলে আসে ছেলেমেয়েগুলো।
তাদের স্কুল থেকে মাইলখানেক দূরে বনগ্রাম। এ গ্রামের মেয়ে বিজয়া সর্দার, মায়ারানি সর্দার। প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়া তারা। বেশ ভাব হয়ে গিয়েছে ভালুকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ইমরান শেখ, অয়ন শীলদের সঙ্গে। ওরা সবাই মিলে মাটিতে চাটাই পেতে বসে পড়ে আদিবাসী ঝুপড়ির সামনে। তার পর শুরু হয় সচেতনতার পাঠ। বনগ্রামকে ‘দত্তক’ নিয়েছে যে তারা।
অক্ষর পরিচয়হীন আদিবাসীদের সাধারণ স্বাস্থ্যবিধির পাঠ দান থেকে শুরু করে বোঝানো হয় কুসংস্কার ও তার ক্ষতির দিকগুলো। বোঝানো হয় সাপে কামড়ালে ওঝা নয়, যেতে হবে হাসপাতালে। ঘরের মেয়েকে সাত তাড়াতাড়ি স্বামীর ঘরে নয়, পাঠাতে হবে স্কুলে। হতদরিদ্র সর্দার আগে কোনও দিন ভাবেননি খাবার আগে হাত ধোয়া উচিত। কিংবা শৌচাগার ব্যবহারের কথা। কিন্তু এখন ভাবছেন।
২০১৬ সালে ভালুকা উচ্চ বিদ্যালয় বনগ্রামকে দত্তক নেওয়ার পর থেকেই দ্রুত বদলে যাচ্ছে পুরানো অভ্যাস। নতুন জীবনধারায় রপ্ত হচ্ছেন আদিবাসীরা।
কিন্তু গ্রাম দত্তক নেওয়া মানে কী? উত্তরে ভালুকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রতনদুলাল নাথ বলেন, “পড়াশুনার পাশাপাশি সেবার মানসিকতা এবং সামাজিক দায়বব্ধতা গড়ে তোলা হয়, এটাই হল উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে পড়ুয়াদের মাধ্যমে সমাজের পিছিয়ে পড়া শ্রেণীর জীবনযাপনের মানোন্নয়ন ঘটানোর চেষ্টা করা।’’ এই প্রকল্পের অধীনে স্কুল পাঁচ বছরের জন্য একটি গ্রাম বা অঞ্চলকে ‘দত্তক’ নেয়। যেমন, ভালুকা উচ্চ বিদ্যালয় ২০১৬ সালে বনগ্রামকে দত্তক নিয়েছে।
নদিয়া জেলায় ১৮টি স্কুল এই জাতীয় সেবা প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ভালুকা উচ্চ বিদ্যালয় ইউনিটের প্রোগ্রাম অফিসার তথা ওই স্কুলের শিক্ষক রাজু প্রামানিক বলেন, ‘‘আগ্রহী স্কুলের তরফে উচ্চ-মাধ্যমিক কাউন্সিলের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ওই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য শিক্ষক ও পড়ুয়াদের নিয়ে একশো জনের একটি দল গড়ে আবেদন করতে হয়। স্কুলের পরিকাঠামো খতিয়ে দেখে তবেই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।’’
ভালুকা স্কুলের শিক্ষক সুখেন্দুবিকাশ রায়ের কথায়, “দত্তক গ্রাম চিহ্নিত হওয়ার পরে বনগ্রামের সর্দাররা ছেড়েছেন পুরনো অভ্যাস। ছেলেমেয়েদের কাজে গোটা গ্রামের আট থেকে আশি, সবাই ভীষণ খুশি।”
বনগ্রামের সুকুরমনি সর্দার, মনিমালা সর্দার কিংবা হরিপদ সর্দার যেমন জানালেন, ছেলেমেয়েগুলো আসার পর থেকে গ্রামের অনেক উপকার হয়েছে। “রাস্তা হয়েছে, নিকাশিনালা সাফ হয়েছে, কমেছে পোকামাকড়ের উৎপাত।”
পড়ুয়াদের আয়োজন করা স্বাস্থ্য শিবিরে বিনা খরচে রক্ত পরীক্ষা করিয়েছেন সুকুরমনি। বললেন “এই ভাবে ঘরের কাছে ডাক্তার এসে চিকিৎসা করবে, আগে কোনও দিন ভেবেছি? ওদের ভাল হোক।”