Advertisement
E-Paper

নগদের স্বাদ চিনির চেয়েও মিষ্টি

‘সুগার মিলে চাকরি করি’ শুনলেই লোকজন সম্ভ্রমের চোখে তাকাতেন। বিস্তর মাইনে। সঙ্গে হাজারও সুখ-সুবিধা। ধোঁয়া ওঠা চিনিকলটার উপরে নির্ভর করত নদিয়া-মুর্শিদাবাদের বিস্তীর্ণ এলাকার অর্থনীতি, সমৃদ্ধি, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ। সেই মসৃণ পথ এমন বন্ধুর হল কী করে? খোঁজ নিচ্ছেন গৌরব বিশ্বাস ও সামসুদ্দিন বিশ্বাস। নবান্নের সময় এলেই খুশি হুটোপুটি করে গঙ্গার দু’পাড়ে।

শেষ আপডেট: ১১ ডিসেম্বর ২০১৬ ০২:০২
খেতে পড়ে আখ। — নিজস্ব চিত্র

খেতে পড়ে আখ। — নিজস্ব চিত্র

নবান্নের সময় এলেই খুশি হুটোপুটি করে গঙ্গার দু’পাড়ে।

নতুন ধান ঘরে উঠেছে সবে। সময় হয়েছে খেতের আখ কাটারও। বছর কয়েক আগেও গৃহকর্ত্রী বাড়ির ছোটদের বলতেন, ‘‘ওরে, এ ক’দিনে যা পারিস, খেয়ে নে আখ, এর পর তো সবই মিলে চলে যাবে।’’

আখের সেই সুদিনে আত্মীয় পরিজনের বাড়ি গেলে সম্পন্ন চাষি মাথায় করে বয়ে নিয়ে যেতেন খেতের টাটকা আখ।

সেই আখের কদর আজও আছে। কিন্তু যে মিলের ভরসায় বিঘের পর বিঘে, আখের ফলনে ভরিয়ে রাখতেন আবাদি মানুষ, সেই চিনি কল আখ সংগ্রহে গরজটাই যেন আঘ্রানের কুয়াশায় হারিয়ে ফেলেছে।

সম্বৎসর চিনি কলের ভরসায় থাকা মানুষগুলোই বা আখ চাষে মন ঢেলে দেন কী করে! আখ চাষে উৎসাহ তাই হারিয়েই ফেলেছেন নদিয়া-মুর্শিদাবাদের বহু চাষি। পলাশির দীপক মণ্ডল যেমন বলছেন, ‘‘খেতের আখ পুষ্ট হতে না হতেই মিলের লোকজন ফোন করে খোঁজ নিত, কবে গাড়ি পাঠাবে। সে সব দিন হারিয়েছে। মিলের গড়িমসিতে এ বারহ আখ চাষটাই তুলে দিলাম।’’

বিকলনগরের আরিফ খানের অভিজ্ঞতা আরও তিক্ত। গত কয়েক বছর ধরে তিনি বিঘা সাতেক জমিতে আখ চাষ করতেন। গত বছর ডিসেম্বর পেরিয়ে গেলেও আখের গাড়ি পাঠায়নি পলাশির চিনিকল। বলছেন, ‘‘বার বার বলার পরে আখ তো নিয়ে গেল। কিন্তু টাকা পাচ্ছি কই! শেষতক সুগার মিলে গিয়ে হইচই করায় বস্তা কয়েক চিনি ধরিয়ে দিল। সেই চিনি কম দামে বাজারে বিক্রি করে কিছু টাকা পেয়েছি।’’ তিনি পণ করেছেন, আর যাই হোক, আখ চাষ আর নয়।

কালীগঞ্জের জমশেদ শেখ এখনও মিল কর্তৃপক্ষের কাছে ২ লক্ষ টাকা পান। হতাশ জমশেদ বলছেন, ‘‘অনেক হয়েছে মশাই। ও টাকা না পেলে জমিতে আর আখ নয়।’’

বছর কয়েক আগে নদিয়ার কালীগঞ্জ, পলাশি-সহ লাগোয়া মুর্শিদাবাদের রেজিনগর, বিকলনগর, বেলডাঙার মতো এলাকায় চাষিদের বাড়ি গিয়ে আখ চাষে উৎসাহ দিচ্ছিলেন পলাশির খেতান সুগার মিল কর্তৃপক্ষ। চাষিরা সাড়াও দিয়েছিলেন। ধান-সর্ষের বদলে জমিতে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল সুঠাম আখ। কিন্তু বছর ঘুরতেই শুরু হয়ে গিয়েছে সমস্যা।

এখন প্রশ্ন, আখের ভরা বাজারে চিনিকল কর্তৃপক্ষ আখ থেকে মুখ ফেরালেন কেন? পলাশির ওই সুগার মিলের জেনারেল ম্যানেজার চন্দ্রশেখর সিংহ জানান, মিলের জমি লিজ নিয়ে যাঁরা চাষ করছেন, সেই চাষিদের বিঘা প্রতি তিন টন আখ মিল কর্তৃপক্ষকে দেওয়ার কথা। কিন্তু চাষিদের অনেকেই সেই আখ চিনিকলে না দিয়ে গুড় মিল মালিককে দিয়ে দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘‘সেই হিসেবে চাষিদের কাছ থেকে মিল কর্তৃপক্ষের বকেয়া টাকার পরিমাণ ৭১ লক্ষ টাকা।’’ আর চাষিরা কত টাকা পাবেন? চন্দ্রশেখর কিঞ্চিৎ ভেবে বলছেন, ‘‘চাষিরা পাবেন, ১ কোটি পাঁচ লক্ষ টাকা। ইতিমধ্যে ত্রিশ লক্ষ টাকা জোগাড় করা হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব বাকি টাকাও মিটিয়ে দেওয়া হবে।’’ তা হলে, বকেয়া টাকা না পেলে চাষিরা চিন কলে আখ দেবেন কেন?

এবং এই সুযোগটাই কাজে লাগাচ্ছেন ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক বরাবর পলাশি, রেজিনগর, বেলডাঙা এলাকায় গজিয়ে ওঠা গুড় মিলগুলি।

চাষিদের দাবি, সেখানে দাম মিলছে নগদে। গুড় মিলে আখ দিলে টাকাটা কিঞ্চিৎ কম মেলে ঠিকই, তবে ফেলো কড়ি মাখো তেলের মতো চাষিরা টাকাটা পাচ্ছেন নগদে। তাঁরা জানাচ্ছেন, চিনি কলের মতো ‘ধানাই পানাই’ সেখানে নেই। জেলার কৃষি কর্মাধ্যক্ষ কমলেশ বিশ্বাস সরাসরিই বলছেন, ‘‘চিনি মিলগুলোর গড়িমসিই এর জন্য দায়ী।’’

পলাশির এক চাষি বলছেন, ‘‘চিনি-গুড়ের স্বাদের ফারাক আছে, তবে কী জানেন, নগদ টাকার স্বাদটাই অন্যরকম, ওর ধারেকাছে কেউ লাগে না!’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy