কেউ পাসপোর্ট-জন্মের শংসাপত্র বার করে দেখাচ্ছেন তো কেউ জমির দলিল। মাঝবয়সি রুস্তম শেখ পলিথিনের প্যাকেট থেকে যত্নে রাখা পাসপোর্ট আর জন্মের শংসাপত্র বার করতে করতে বলেন, “নির্বাচন কমিশন যে ১৩টা নথি দেখাতে বলেছিল তার মধ্যে দুটো তো এখানেই আছে। তার পরেও নাম বাদ? কে উত্তর দেবে? কার কাছে যাব?”
এই উত্তরটাই খুঁজে বেড়াচ্ছেন কৃষ্ণনগর দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রের চুপিপোতার মানুষ। একশো শতাংশ সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এই গ্রামের ১১ নম্বর বুথে বিবেচনাধীনের তালিকায় ১৫২ জনের নাম ছিল। নির্বাচন কমিশন যে অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশ করেছে তাতে তাঁদের সকলেরই নাম বাদ। গোটা গ্রাম জুড়ে ক্ষোভ আর আতঙ্কের পরিবেশ। প্রবীণ বাসিন্দা নুরমান শেখ বলেন, “যাদের নাম বাদ গিয়েছে তাদের অনেকের বাবা-দাদাকে এই গ্রামে জন্মাতে দেখেছি।”
তাঁর ছেলের নাম থাকলেও কাটা গিয়েছে রমজান মণ্ডলের নাম। তাঁর কথায়, “২০০২ সালের তালিকায় আমার নাম ছিল। ভোটও দিয়েছি। ভোটার তালিকায় ছেলের নাম আছে। কিন্তু আমার আর স্ত্রীর নাম বাদ গিয়েছে। আমরা ভারতের নাগরিক না হলে আমার ছেলে কী ভাবে বৈধ ভোটার হতে পারে?” আর এক গ্রামবাসী লস্কর শেখ বলেন, “২০০২ সালের তালিকায় আমার নাম ছিল। বড় ছেলে-স্ত্রীর নাম আছে। অথচ আমার নাম কাটা! এ সবই ইচ্ছা করে করা হয়েছে।” চক্রান্তের গন্ধ পাচ্ছেন জব্বার আলি শেখও। তিনি বলেন, “আমার মেয়ের নাম আছে কিন্তু স্ত্রীর সমস্ত নথি থাকা সত্ত্বেও নাম নেই। আমরা সবাই আতঙ্কে আছি।” আবার মকরেফ শেখ বলেন, “আমার স্ত্রী আর ছেলের নাম উঠেছে, আমার নাম বাদ। এ কেমন বিবেচনা?”
আতঙ্কে রয়েছেন নুরমান শেখের স্ত্রীও। নুরমান বলেন, “আমার বাপ-ঠাকুরদার এই গ্রামে জন্ম। ১৯৪৭ সালের আগে প্রথম ২৩টা ঘর এই গ্রামে বসতি স্থাপন করেছিল। তার মধ্যে আমরা একটা ঘর। জানি না কী কারণে আমার নাম রইল আর ওর নাম বাদ। ও প্রচণ্ড আতঙ্কে রয়েছে, যদি আমাদের ছেড়ে থাকতে হয়!” ওই বুথের বিএলও সঞ্জিমা খাতুন বলেন, “আমার বুথে ভোটার তালিকায় ১২৮৬ জনের নাম ছিল। তার মধ্যে ১৫২ জনের নাম বিবেচনাধীন তালিকায় ওঠে। আমি বিএলও হিসাবে দায়িত্ব নিয়ে বলছি, এঁরা সকলেই যোগ্য ভোটার।”
প্রায় একই অবস্থা আশপাশের একাধিক গ্রামের। জ্যোতিনগর গ্রামে ১৭ নম্বর বুথে ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় নাম থাকা ১১৪ জনের মধ্যে ১১১ জনের নাম বাদ গিয়েছে। রুকুনপুর গ্রামের ১ নম্বর বুথে ৪৫ জনের মধ্যে ৩৭ জন, ২ নম্বর বুথে ৭৯ জনের মধ্যে ৭৬ জন, ৩ নম্বর বুথে ৪৪ জনের মধ্যে ৪৪ জন ও ৪ নম্বর বুথে ৫০ জনের মধ্যে ৫০ জনেরই নাম বাদ। ঘাটেশ্বর গ্রামের ১৩ নম্বর বুথেও ৩৩ জনের মধ্যে ৩৩ জনেরই নাম বাদ গিয়েছে। গ্রামের বাসিন্দা বিএলও দোয়াজ্জেন মণ্ডল বলেন, “আমার মায়ের নামটাই বাদ গিয়েছে। আমি অন্যদের কী বলে সান্ত্বনা দেব? কী দেখে যে বিচার হচ্ছে তা আমার মাথায় ঢুকছে না।”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) শুরু হয়ে গিয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। গ্রাম থেকে শহর, বাড়িতে বাড়িতে পৌঁছোতে শুরু করেছেন কমিশনের বুথ স্তরের আধিকারিকেরা (বিএলও)। শুরু হয়ে গিয়েছে এনুমারেশন ফর্ম বিলিও।
- শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, দেশের আরও ১১টি রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলেও একই সঙ্গে শুরু হয়েছে এসআইআরের কাজ। যাঁরা কর্মসূত্রে বাইরে থাকেন, তাঁদের জন্য অনলাইনে এনুমারেশন ফর্ম পূরণ করার ব্যবস্থা করেছে কমিশন।
-
ট্রাইবুনালে নিষ্পত্তি হওয়া বুথভিত্তিক তালিকা প্রকাশ করে দিল নির্বাচন কমিশন, নাম দেখা যাবে কমিশনেরই ওয়েবসাইটে
-
অন্ধকারে ঢিল ছুড়বে না সুপ্রিম কোর্ট! এসআইআর মামলায় ফর্ম-৬ নিয়ে তৃণমূলের দাবি ওড়ালেন প্রধান বিচারপতি
-
ট্রাইবুনালে কাজই শুরু হয়নি, প্রবেশেও বাধা! নতুন মামলা সুপ্রিম কোর্টে, কী হচ্ছে জানতে চাইবেন প্রধান বিচারপতি কান্ত
-
ভোটার ট্রাইবুনালের কাজ শুরু! মোথাবাড়ি মাথায় রেখে কঠোর নিরাপত্তা, দফতর দর্শনে গিয়ে কী দেখল আনন্দবাজার ডট কম
-
পরিকাঠামো তৈরি, সোমবারেই ট্রাইবুনালে শুরু হয়ে যাবে শুনানি! রবিতে জোকার অফিস ঘুরে দেখে সিদ্ধান্ত নিলেন প্রাক্তন বিচারপতিরা
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)