পূর্ত দফতরের ভিতরে এসে দাঁড়িয়েছে একটা সাদা গাড়ি। পিছনে খান কুড়ি মোটরববাইক।
সাদা গাড়ি থেকে নামলেন এক সুদর্শন যুবক। পরনে দুধ-সাদা জামা প্যান্ট। পায়েও সাদা চটি। তাঁকে দেখে তটস্থ কর্মী থেকে অফিসারেরা।
নম্বইয়ের দশক।
কৃষ্ণনগর শহরের মানুষের মুখে-মুখে তখন ফেরে ‘দিলু’ নামটা। দিলু ওরফে কালীনগরের দিলীপ শর্মা। কৃষ্ণনগরের কংগ্রেস কাউন্সিলর। সেই বাম আমলেও তিনি ছিলেন ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের বেতাজ বাদশা। তিনিই ঠিক করে দিতেন, কোন কাজের ঠিকা কে পাবে। পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করায় সোমেন মিত্র পর্যন্ত কলকাতা থেকে ছুটে এসেছিলেন। তবে কংগ্রেস ভেঙে তৃণমূল হওয়ার পর দিলুও ডাল বদলেছিলেন। একেবারে শেষ দিকে।
সে দিন আর নেই। দিলু আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছেন কয়েক বছর হল। কিন্তু আজও অনেকের প্রশ্ন, বামেদের প্রবল দাপটের সময়ে কী ভাবে তিনি একচ্ছত্র রাজত্ব চালিয়ে গেলেন? এত বড় আর্থিক লেনদেনের জায়গা কেন সিপিএম ছেড়ে রেখেছিল তাঁর হাতে?
বাম মহলেরই একাংশের ব্যাখ্যা, সিপিএম নেতারা সাধারণত প্রকাশ্যে সিন্ডিকেটের সঙ্গে নিজেদের নাম জড়াতে চাইতেন না। তাঁদের একাংশ দিলুকে সামনে রেখে টাকার ভাগ নিতেন। সেই তালিকায় এক জেলা পরিষদ সভাধিপতি এবং এক শ্রমিক নেতার নামও জড়িয়েছিল। মাসের গোড়ায় তাঁদের হাতে পৌঁছে যেত হিসেবের কড়ি। তাই শাসকেরাও তাঁদের ঘাঁটাতেন না।
শেষ দিকে অবশ্য সমীকরণটা ঘেঁটে যায়। দিলুকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে উঠে আসতে থাকেন এক তৃণমূল কাউন্সিলর। তার আগে সিপিএম ঘনিষ্ঠ কয়েক জন ঠিকাদারও লাগাম হাতে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। সেই ঠিকাদারেরা অনেকেই এখন তৃণমূলে। ক্ষমতার বদল ঘটার সঙ্গেই সিন্ডিকেট রাজের লাগামও হাতবদল হয়েছে। এক সময়ে সিপিএম নেতা বা তাঁদের দলীয় তহবিলে যে ৫ শতাংশ কমিশন জমা পড়ত, এখন তা-ই তৃণমূলের ঘরে যায় বলে অভিযোগ। বিজেপির নদিয়া (উত্তর) সাংগঠনিক জেলা সভাপতি মহাদেব সরকারের দাবি, “সিপিএম আর তৃণমূল একই মুদ্রার এ পিঠ-ও পিঠ। সিপিএম ছিল শিল্পী, নিজেদের গায়ে কাদা লাগতে দিত না। তৃণমূলের সে সব বালাই নেই। ওরা প্রকাশ্যেই যা করার করে।”
তৃণমূল নেতারা আবার বলছেন, ক্ষমতা পাওয়া এখনও দূর অস্ত্, এর মধ্যেই বিজেপির চোখ চলে গিয়েছে সিন্ডিকেটের লাভের গুঁড়োর দিকে। বড়-মেজো নেতারা ঠিকাদারিতে মাথা গলানোর চেষ্টা করছেন। জেলা তৃণমূল সভাপতি গৌরীশঙ্কর দত্তের কটাক্ষ, “ও সব সিপিএমের আমলে চলত। বিজেপি ভাবছে, ওরা ক্ষমতা পেলে সে দিন ফিরিয়ে আনবে। যত অলীক কল্পনা!”
তবে, যে যায় লঙ্কায়, সে-ই হয় সিন্ডিকেটের দাদা, কে না জানে!
(শেষ)