ভোট ঘোষণা এখনও হয়নি। কিন্তু হিসেব কষা শুরু হয়ে গিয়েছে।
তৃণমূল ধরেই নিয়েছে, রানাঘাট লোকসভা আসন তারা জিতছে। কিন্তু কত মার্জিনে, সেই হিসেব তারা করে উঠতে পারেনি এখনও। যতটুকু হিসেব কষা হয়েছে, তার মধ্যেও জল থাকার সম্ভাবনা যথেষ্ট।
হবিবপুরে তৃণমূলের বুথস্তরের সভায় বৃহস্পতিবার তেমনই কিছু হিসেবের নমুনা পাওয়া গিয়েছে।
মঞ্চে তখন বসে অনুব্রত মণ্ডল, বিধায়ক শঙ্কর সিংহ, জেলা সভাপতি গৌরীশঙ্কর দত্ত, রানাঘাটের সাংসদ তাপস মণ্ডলেরা। একপাশে হাতে কয়েকটা কাগজ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন রানাঘাট শহর তৃণমূলের সভাপতি অসিত দত্ত। তাঁর পাশে রানাঘাটের পুরপ্রধান পার্থসারথী চট্টোপাধ্যায়।
হেডস্যরের ঢঙে অনুব্রত জানতে চাইলেন, আগামী লোকসভা নির্বাচনে রানাঘাট শহরে কত ‘লিড’ থাকবে? অসিত হিসেব দিলেন, “রানাঘাটের ২০টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৯টি আমাদের দখলে। গত পুর নির্বাচনে আমাদের লিড ছিল ১৫ হাজার। সেটা অনেক বেড়ে যাবে। আমাদের হিসেবে, ২০ হাজার ছাড়িয়ে যাবে।”
অসিত-পার্থসারথীর যুক্তি, গত বিধানসভা নির্বাচনে কেউ তাঁদের ভোটব্যাঙ্কে ভাগ বসাতে পারেনি। সিপিএম ও কংগ্রেস জোট করায় তাঁরা হেরে যান। তখনকার কংগ্রেস নেতা শঙ্কর সিংহ এখন তৃণমূলে। ফলে তাঁদের শক্তি আরও বেড়ে গিয়েছে। মঞ্চে আসীন নেতারা কিন্তু আশঙ্কা করছেন, যত সহজে দাবি করা হচ্ছে, খেলাটা তত সহজ না-ও হতে পারে। সে কথা জানিয়ে রানাঘাটের কর্মীদের তাঁরা সতর্ক করেছেন।
পরে ডাক পড়ল রানাঘাট ২ ব্লকের সভাপতি দেবাঞ্জন গুহঠাকুরতার। হাতে ফাইল নিয়ে তিনি মঞ্চে উঠে এলেন। বললেন, “আমার ব্লকে ১৪টি গ্রাম পঞ্চায়েত। এর মধ্যে রানাঘাট দক্ষিণে আটটি ও রানাঘাট উত্তর-পূর্ব বিধানসভা এলাকায় বাকি ছ’টি গ্রাম পঞ্চায়েত রয়েছে। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে এর সব ক’টিতেই আমরা জয়ী হয়েছি।” লোকসভা নির্বাচনে ৩৫-৪০ হাজার ভোটে লিড দেবেন বলে তিনি দাবি করেন।
শান্তিপুর ব্লকের সভাপতি তপন সরকার বলেন, “আমাদের ব্লকে ১০টি গ্রাম পঞ্চায়েত রয়েছে। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে আমরা এর সব ক’টি দখলে রাখতে পেরেছি। ২২-২৫ হাজার ভোটে লিড দেব।”
মঞ্চের সামনেই বসেছিলেন দলের তাহেরপুর শহর সভাপতি স্বপন সরকার। তিনি হিসেব দেন, তাহেরপুর পুরসভায় ১৩টি ওয়ার্ডের মধ্যে আটটি তাঁরা হেরেছিলেন। তবু লোকসভা নির্বাচনে এক হাজারের বেশি ভোটে লিড দেবেন। তাঁর হিসেব শুনে একটু থমকে গিয়ে অনুব্রত বলেন, “মাত্র এক হাজার লিড!”
বীরনগর শহর তৃণমূলের সভাপতি স্বপন দাস জানান, তাঁদের পুরসভায় ১৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে দু’টি হাতছাড়া হয়েছিল। তাঁরা সচ্ছন্দে চার হাজার ভোটে লিড দেবেন। হাঁসখালি ব্লকের সভাপতি কল্যাণ ঢালি বলেন, “আমার ব্লকে দু’জন দক্ষ সংগঠক, দুলাল বিশ্বাস এবং বিধায়ক সত্যজিৎ বিশ্বাস খুন হয়েছেন। তা সত্ত্বেও ৩৮ হাজার লিড রাখার চেষ্টা করব।”
রাজনীতিতে মলুখে যা বলা হয়, আর ভিতরে-ভিতরে যা অঙ্ক কষা হয় তার মধ্যে প্রত্যাশিত ভাবেই ফারাক থাকে। যেমন সে দিন সভার শেষে সাংবাদিকদের কাছে অনুব্রত ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে দেন, ‘‘আড়াই লক্ষ ভোটে জিতব।’’ গৌরীশঙ্কর দত্তও ‘উন্নয়ন’কে বাজি ধরে বলেন, “গত লোকসভা নির্বাচনে দু’লক্ষ ভোটে জিতেছিলাম। পাঁচ বছরে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। মার্জিন গত বারের থেকে বাড়বে।”
রানাঘাট লোকসভা কেন্দ্রে যা সবচেয়ে বড় ‘ফ্যাক্টর’ অর্থাৎ তৃণমূলে অন্তর্দ্বন্দ্ব, সভায় নেতাদের সামনেই যা দাঁত-নখ বার করেছে, তা কতটা ক্ষতি করতে পারে, তা অবশ্য কেউই হিসেবে আনছেন না। অন্তত প্রকাশ্যে।
বিজেপির দক্ষিণ জেলা সভাপতি বিধায়ক খুনের মামলায় সিআইডি-র ডাকাডাকি এবং অসুস্থতার সাঁড়াশি চাপে আপাতত অন্তরালে। দক্ষিণ জেলা অফিস সম্পাদক রাখালরঞ্জন সাহার কটাক্ষ, “ভোটের ফল প্রকাশের পরেই দেখবেন, এ সব হিসেব কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়! ওরা নিজেরা খুনোখুনি করে মরছে, আর মামলায় আমাদের নাম জড়াচ্ছে। এতে কিন্তু আমাদেরই লাভ হচ্ছে!” মানুষের মধ্যে যে ভাবে ‘সাড়া’ পাচ্ছেন, তাতে তাঁরাই দু’লক্ষ ভোটে জিতবেন বলে তিনিও ‘হিসেব’ দিতে ছাড়েননি!