Advertisement
২৬ নভেম্বর ২০২২
দেরিতে ছুটছে ট্রেন, ভরসন্ধ্যায় বন্ধ দোকানপাট

পৌষের দিনরাত্রি

বড়দিন কিংবা বর্ষশেষের রাতে তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে কল্যাণী থেকে কালিয়াচক। সে বিনে জিরেন রসে ‘তাড়’ আসে না। নলেন থাকে গন্ধহীন। দার্জিলিং লেবু হারায় মায়াবী স্বাদ। শেষ পৌষে এসে দেখা মিলল তার। শুধু দেখা নয়, তার দাপটে কাঁপছে তামাম নদিয়া-মুর্শিদাবাদ। সেই শীতযাপনের খোঁজ নিল আনন্দবাজার।বড়দিন কিংবা বর্ষশেষের রাতে তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে কল্যাণী থেকে কালিয়াচক। সে বিনে জিরেন রসে ‘তাড়’ আসে না। নলেন থাকে গন্ধহীন। দার্জিলিং লেবু হারায় মায়াবী স্বাদ। শেষ পৌষে এসে দেখা মিলল তার। শুধু দেখা নয়, তার দাপটে কাঁপছে তামাম নদিয়া-মুর্শিদাবাদ। সেই শীতযাপনের খোঁজ নিল আনন্দবাজার।

স্কুল-পথে: শুক্রবার কৃষ্ণনগরে। ছবি: সুদীপ ভট্টাচার্য

স্কুল-পথে: শুক্রবার কৃষ্ণনগরে। ছবি: সুদীপ ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ০৬ জানুয়ারি ২০১৮ ০২:৩৩
Share: Save:

ঝাঁপ বন্ধ সাঁঝেই

Advertisement

ডিসেম্বর জুড়ে হালকা সোয়েটার-মাফলারেই দিব্যি চলে যাচ্ছিল। বড়জোর একটা টুপি। প্রমাদ গুনছিলেন শীতপোশাকের ব্যবসায়ীরা। পনেরো-ষোলো নীচে তাপমাত্রা যে নামতেই চাইছে না। এ বছরের মতো শীত পাততাড়ি গোটালো কি না, তা নিয়ে যখন জল্পনার শেষ নেই, ঠিক তখনই তার শীতল প্রত্যাবর্তন। থরথরিয়ে কম্পমান নদিয়া-মুর্শিদাবাদ। রোদে দাঁড়িয়েও কাঁপুনি সামাল দিতে না পেরে কোথাও সাতসকালে রাস্তার ধারে জ্বলেছে আগুন, কোথাও সন্ধ্যা নামতেই দুয়ার এঁটেছেন দোকানদার। রাত ন’টায় সুনসান মোড়ের মাথা। দোকানদার বলছেন, ‘‘এই ঠান্ডায় খরিদ্দারই তো নেই। খামোখা দোকান খুলে রেখে কী করব, বলুন তো!’’

বৃহস্পতিবার নবদ্বীপে রাতের তাপমাত্রা নেমেছিল ৯ ডিগ্রিতে। কনকনে হাওয়ার দাপটে চোখে পড়ার মতো ফাঁকা ছিল মায়াপুর মন্দির। নদিয়া জেলা বাস মালিক সমিতির তরফে অসীম দত্ত জানান, শীতের জন্য সকালের দিকে বাসে যাত্রী কম থাকছে। সন্ধ্যার পরে বেশির ভাগ রুটে যাত্রীর অভাবে বাস চলাচল কমে যাচ্ছে। নিরুপায় নিত্যযাত্রী ছাড়া রেল স্টেশনেও তেমন ভিড় চোখে পড়েনি।

বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়েছে নবদ্বীপ বইমেলা। কিন্তু ঠান্ডার দাপটে প্রথম দিনে প্রকাশকেরা স্টলই সে ভাবে গুছিয়ে উঠতে পারলেন না। নবদ্বীপের শীত পোশাকের কারবারি রাজেশ অগ্রবাল অবশ্য হাসছেন, ‘‘এ বারে মনে হচ্ছে বাজার জমে যাবে।’’

Advertisement

নৈশ অভিযান

বৃহস্পতিবার রাত তখন দু’টো। হাড়হিম করা ঠান্ডার মধ্যে করিমপুর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের গেটের সামনে বসে রয়েছেন বেশ কয়েক জন মহিলা ও পুরুষ। তাঁদের সঙ্গে বছর দশ-এগারোর কয়েক জন মেয়ে। সকলেই শীতে ঠকঠক করে কাঁপছেন। কেউ আবার আগুন জ্বালিয়ে বসেছেন গোল হয়ে। সকলেই রাতজেগে এ ভাবে বসে ছিলেন মেয়েকে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি করাবেন বলে। রাত ১.৫০ নাগাদ এসে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন মুর্শিদাবাদের কামড়দিয়ারের আব্দুল জাব্বার মণ্ডল। তাঁর কথায়, ‘‘আসলে প্রতিদিন ৫০জন করে ভর্তি নিচ্ছে তো। তাই সকাল সকাল নয়, একেবারে রাত থাকতেই চলে এসেছি।’’

হোগলবেড়িয়ার যাত্রাপুরের সুদীপ ঘোষ, মজলিসপুরের প্রসেনজিৎ দাসেরা বলছেন, ‘‘মেয়েকে ভর্তি করাতে এসে বৃহস্পতিবার অনেকেই বাড়ি ফিরে গিয়েছেন। তাই বাধ্য হয়েই গভীর রাতেই চলে এসেছি।’’ সকাল সাড়ে এগারোটায় অবশ্য প্রথম পঞ্চাশ জনের মুখে এভারেস্ট জয়ের হাসি। রাতজাগার ক্লান্তি উধাও। করিমপুরের প্রণয় চট্টোপাধ্যায়, রিন্টু হালদার বলছেন, ‘‘ওই রাতে ওঁদের দেখে প্রথমে ভেবেছিলাম, কোনও সমস্যা হয়েছে বোধহয়। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, মেয়েদের স্কুলে ভর্তি করাতেই এই নৈশ অভিযান।’’

করিমপুর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ইন্দ্রানি সিকদার জানাচ্ছেন, এ ভাবে বাচ্চাদের সঙ্গে নিয়ে এসে অভিভাবকদের রাত জাগার কোনও মানেই হয় না! স্কুলে কর্মীসংখ্যা কম। সেই কারণে প্রতিদিন ৫০ জনের বেশি ভর্তি নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অভিভাবকদের ফর্ম দেওয়ার সময়েই জানানো হয়েছিল, সবাইকে ভর্তি নেওয়া হবে।

ঝাপসা: বহরমপুরে। নিজস্ব চিত্র

স্নান-সংক্ষেপ

শুক্রবার বহরমপুরের একটি স্কুলে ক্লাস নিচ্ছিলেন শিক্ষক। হঠাৎ তিনি ছাত্রদের বলেন, ‘‘আজ যারা স্নান করে স্কুলে এসেছে, হাত তোলো।’’ এক জনেরও হাত উঠল না। বেশ কিছুক্ষণ পরে একজন অর্ধেক হাত তুলল। কী ব্যাপার। সেই ছাত্র উত্তর দেয়, ‘‘হাফ স্নান, স্যার। মানে, শুধু মাথাটা ধুয়েছি।’’ গোটা ক্লাসে হাসির রোল ওঠে। সকাল থেকেই ঠান্ডা আর কুয়াশার দাপট। কনকনে ঠাণ্ডায় স্কুলে অনুপস্থিতির হার বেড়েছে। পূর্ব রেলের শিয়ালদহ ও হাওড়া ডিভিশনের লালগোলা-শিয়ালদহ ও আজিমগঞ্জ-হাওড়া লাইনের ট্রেন দেরিতে চলছে। বাস মালিক সংগঠনের পক্ষে রথীন মণ্ডল জানান, কুয়াশা ও ঠান্ডার জন্য বাসে তেমন যাত্রী হচ্ছে না। মুর্শিদাবাদের পুলিশ সুপার মুকেশ কুমার বলেন, ‘‘কুয়াশা থাকায় এই সময়ে দ্রুত ও বেপরোয়া যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে পুলিশ’’ এ দিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় এক নেটিজেন আবার লিখে দিয়েছেন, ‘‘ছাদে গিয়েই সেরে নিলাম গরিবের দার্জিলিং ভ্রমণ।’’

(প্রতিবেদন: দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়, কল্লোল প্রামাণিক ও শুভাশিস সৈয়দ)

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.