জমি জটে আটকে তেষ্টার জলটুকুও।
জমির মালিকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ না দিয়েই জলপ্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করেছিল জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতর। ফলে প্রকল্পের কাজ শুরু না হওয়ায় গত ১০ বছর ধরেই তার খেসারত দিচ্ছেন জেলার বাসিন্দারা। এ বার কলকাতা হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছে, জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ-সহ দাম মিটিয়ে দিতে হবে রাজ্য সরকারকে। নইলে প্রকল্পের অধীনে তৈরি যাবতীয় নির্মাণ ভেঙে ফেলে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে হবে জমি।
মুর্শিদাবাদের জেলাশাসক ওয়াই রত্নাকর রাও বলেন, ‘‘হাইকোর্টের রায় মেনে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।’’ জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতরের একটি সূত্রের খবর, কয়েক দিনের মধ্যে টাকা মিটিয়ে দেওয়ার জন্য অন্যতম আব্দুর রাজ্জাকের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়েছেন দফতরের কর্তারা। সপ্তাহ খানেক আগে তাঁর সঙ্গে লিখিত চুক্তিও করেছেন কর্তারা। রাজ্জাকও বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘‘ওই প্রকল্পে পাম্প অপারেটরের একটি কাজ দেবে সরকার। তবে প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত জল সরবরাহ বন্ধ থাকবে।’’ জমিদাতাদের সংগঠন, ‘মুর্শিদাবাদ জেলা ওয়াটার প্রজেক্ট পুওর জমিদাতা অধিকার সুরক্ষা সমিতি’-র তরফে জানা গিয়েছে, এখনও অবধি ১১জন জমিদাতা মামলা করেছেন। তাঁদের মধ্যে তিনজনের রায় বেরিয়েছে। সকলকেই ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এ বার অন্য জমিদাতারাও মামলা করবেন বলে জানাচ্ছেন সংগঠনের কর্তারা।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, আইন ভেঙে কী করে জমি নেওয়া হল?
আর্সেনিক-প্রভাবিত মুর্শিদাবাদ জেলায় প্রায় দশ বছর ধরে থমকে রয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ১৩৩টি জল-প্রকল্প। আর্সেনিক-মুক্ত ভূগর্ভস্থ পানীয় জলের প্রতিটি প্রকল্পের জন্য প্রয়োজন প্রায় ৩৩ শতক জমি। অভিযোগ, সেই জমি অধিগ্রহণ না করে স্রেফ ১০ টাকার স্ট্যাম্প পেপারে মালিকের ‘সম্মতি’ নিয়ে ২০০৭ সালে প্রকল্প গড়ার কাজে হাত লাগায় রাজ্যের জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতর (পিএইচই)।
জমি মালিকদের দাবি, পিএইচই-র পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ-সহ জমির দাম দেওয়া ও জমিদাতা পরিবারের একজনকে ওই প্রকল্পে কাজ দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তাই তাঁরা রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু ২০০৬ সালে ওই প্রকল্পের শিলান্যাসের এত বছরেও সরকার প্রতিশ্রুতি পূরণ না করায় তাঁরা কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করেন।
জমিদাতাদের আইনজীবী রবিউল ইসলাম বলেন, ‘‘ওই মামলায় হাইকোর্টের বিচারপতির বিস্ময়কর পর্যবেক্ষণ, ‘অধিগ্রহণও করেনি, কিনেও নেয়নি— এ রকম জমিতে কোটি কোটি টাকার সরকারি প্রকল্প হয় কী করে!’ জমি মালিকদের অবিলম্বে ক্ষতিপূরণ-সহ দাম মিটিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন বিচারপতি সঞ্জীব বন্দ্যোপাধ্যায়। নাহলে, প্রকল্প ভেঙে গুড়িয়ে দিয়ে পূর্বের অবস্থায় জমি ফিরিয়ে দিতে হবে বলেও বিচারপতি রায় দিয়েছেন।’’
বাংলার হাজারো দূষণ সমস্যার মধ্যে আর্সেনিক দূষণ অন্যতম। উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, মালদহ, মুর্শিদাবাদ ও নদিয়ার বিভিন্ন এলাকায় আর্সেনিকমুক্ত পানীয় জলের ব্যবস্থা করতে পারেনি রাজ্য সরকার। এর মধ্যে মুর্শিদাবাদের একটি গ্রামে একই পরিবারের ১৩ জন মারা গিয়েছেন আর্সেনিক-মিশ্রিত জল খেয়ে। অনেকে পঙ্গুও হয়ে গিয়েছেন।
এই সমস্যার সমাধানে আর্সেনিক দূষণমুক্ত বিশুদ্ধ পানীয় জলের জন্য ১৩৩টি পানীয় জল প্রকল্পের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ২০০৬ সালের বিধানসভা ভোটের আগে ঘটা করে রাজ্যের তৎকালীন জনস্বাস্থ্য কারিগরি মন্ত্রী শিলান্যাসও করেন। প্রতিটি প্রকল্পের জন্য খরচ ধরা হয় প্রায় ৩ কোটি টাকা। আড়াই লক্ষ গ্যালন জল সরবরাহ করার ক্ষমতা সম্পন্ন প্রতিটি প্রকল্প থেকে ২৪ ঘণ্টায় তিনবার জল সরবরাহ করার কথা। সরকারি সূত্রে খবর, শিলান্যাস ২০০৬ সালে হলেও, প্রকল্প নির্মাণের জমি মিলেছে তারও বছর খানেক পরে।
কিন্তু তার প্রায় আট বছর পেরিয়ে দেখা যাচ্ছে, কোনও প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ। কোনওটার কাজ অসম্পূর্ণ। কোনওটার কাজ শুরুই হয়নি। এ দিকে পিএইচই-র প্রতিশ্রুতি মতো জমির দাম ও চাকরি না পাওয়ায় ২০১৩ সাল থকে আন্দোলন শুরু করে জমিদাতাদের সংগঠন, ‘মুর্শিদাবাদ জেলা ওয়াটার প্রজেক্ট পুওর জমিদাতা অধিকার সুরক্ষা সমিতি।’ সংগঠনের সভাপতি কানাইলাল বিশ্বাস বলেন, ‘‘আন্দোলনেও কোনও সুরাহা না হওয়ায় কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হই।’’
ওই আইনজীবী জানান, ২০১৪ সালে মামলাটি ছিল হাইকোর্টের বিচারপতি সম্বুদ্ধ চক্রবর্তীর এসজলাসে। তিনি রায়ে বলেন, জমিদাতাদের ক্ষতিপূরণ-সহ বাজারদর অনুসারে জমি কিনে নিতে হবে। তা না নিলে প্রকল্প ভেঙে গুড়িয়ে দিয়ে মালিকের হাতে পূর্বের অবস্থায় জমি ফিরিয়ে দিতে হবে। তখন সরকার পক্ষ রায় মেনে নিতে রাজি হয়।
কিন্তু জমির দাম কত দেবে, সে ব্যাপারে সরকার পক্ষ খোলসা করে কোনও কথা না জানানোয় ফের মামলা করেন জমিদাতারা। এ বার মামলা যায় হাইকোর্টের বিচারপতি সঞ্জীব বন্দ্যোপাধ্যায়ের এজলাসে। মোট ১১ জন জমিদাতা মামলা করেছেন। তাঁদের মধ্যে আব্দুর রাজ্জাক, অসিতকুমার বিশ্বাস ও রেন্টু শেখের মামলার রায় বের হয়েছে।
রানিনগরের বাঁশগাড়া মৌজার চর শিবনগরের আব্দুর রাজ্জাককে জমির দাম বাবদ ২৫ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা এক মাসের মধ্যে মিটিয়ে দেওয়ার রায় দেন বিচারপতি সঞ্জীব বন্দ্যোপাধ্যায় গত ২৭ জুলাই। তাঁর জমিতে জল প্রকল্প নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে ২০১৩ সালে। কিন্তু রাজ্জাক বাধা দেওয়ায় সেই প্রকল্প থেকে জল সরবরাহ শুরু করা যায়নি। রাজ্জাক বলেন, ‘‘জমির দামও দেয়নি। চাকরিও দেয়নি। তাই জল সরবরাহ আটকে দিয়েছি।’’ হাইকোর্টের রায়ের পর এক মাস পার হয়ে গেলেও রাজ্জাককে টাকা মেটানো হয়নি কেন? পিএইচই- র একজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার রূপায়ণ ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘মুর্শিদাবাদের বাইরে থাকায় বিশদে না জেনে এই বিষয়ে কোনও মন্তব্য করা ঠিক হবে না।’’
হাইকোর্টের বিচারপতি গত ১১ অগস্টের রায়ে জলঙ্গি থানা এলাকার অসিত বিশ্বাসকে ৩ মাসের মধ্যে জমির দাম বাবদ ৫৯ লক্ষ টাকা দিতে বলেছেন। গত ১২ অগস্টের রায়ে ইসলামপুর থানা এলাকার রেন্টু শেখকে ৮ সপ্তাহের মধ্যে জমির দাম বাবদ ৪৮ লক্ষ টাকা মিটিয়ে দিতে বলেছেন। রেন্টু শেখ ও অসিত বিশ্বাস বলেন, ‘‘হাইকোর্টের রায় অনুসারে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা মিটিয়ে দেবেন বলে পিএইচই-র কর্তারা আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন।’’ জমি জট কাটিয়ে জল প্রকল্প কবে নাগাদ গতি পায় সেটাই এখন দেখার।