সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ইংরেজির শিক্ষক ঠিক করেছিলেন, পড়ুয়াদের নিয়ে ইংরেজি নাটক করবেন। কারা উৎসাহী, জানতে চাইলে পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির কোনও পড়ুয়াই সাহস করে হাত তোলেনি। মুর্শিদাবাদের নশিপুর হাই মাদ্রাসার মাদ্রাসার ২১৮৪ জন পড়ুয়ারই ইংরেজি বলা নিয়ে এমন ভয় আর সংকোচ দেখেও হাল ছাড়েননি ইংরেজির শিক্ষক মাসুদ আলম। তিনি এবং অন্য শিক্ষকরা আমন্ত্রণ করেন মাদ্রাসায় আহ্বান করেন বহরমপুরের কাতলামারি হাইস্কুলের ইংরেজির শিক্ষক সন্দীপ বাগচীকে। নাটকের মাধ্যমে ইংরেজি শেখানোতে সুনাম রয়েছে সন্দীপবাবুর।
গত ৩ নভেম্বর সন্দীপবাবু নশিপুর মাদ্রাসার ৭৬ জন ছাত্র-ছাত্রীকে নিয়ে শুরু করেন ইংরেজি বলতে শেখানোর চার দিনের শিবির। ছোট ছোট বাক্যে সংলাপের মাধ্যমে চলতে থাকে ইংরেজি শেখানো। নাচ-গান, অভিনয়ের মাধ্যমেও ইংরেজি বলার পালা চলে। শুক্রবারই দেখা গেল, একেবারে বদলে গিয়েছে ছবিটা। আগে যারা ইংরেজিতে নাটক করার নামে মুখ লুকোত, সেই ছেলেমেয়েরাই এখন নাটকের দলে নাম দিতে এগিয়ে আসছে।
কী করে এমন হল? শিক্ষকরা বলছেন, ছোট ছোট সংলাপ আও়ড়াতে আওড়াতে ছোট-মেয়েরা এখন নিজেদের মধ্যে ইংরেজিতে কথা বলার চেষ্টা করছে পড়ুয়ারা। শিবির শেষ হওয়ার পরেও নিজেদের মধ্যে ইংরেজিতে কথা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। যে ছাত্ররা ইংরেজির নাম শুনলেই পিছনের বেঞ্চে ভিড় করত, তারাই এখন সামনের সামনে বসার জন্য হুটোপাটি করছে। ইংরেজিতে কথা বলার জন্য লাফিয়ে উঠছে।
কী ভাবে এটা সম্ভব হল? শিক্ষকরা বলছেন, পড়ুয়াদের বিভিন্ন রকমের ‘গেম’ খেলানো হচ্ছে। যেমন, ‘ট্রাস্ট গেম’, ‘লিডার গেম’, ‘মিরর গেম।’ এই সমস্ত ‘গেম’ পড়ুয়ারা খেলছে। আর শিক্ষক ছোট ছোট বাক্যে খেলার নিয়ম বাতলে দিচ্ছেন। ‘টেক ইয়োর সেফ পজিশন’, ‘বি কেয়ারফুল’ — এমন ছোট ছোট বাক্য বলছেন শিক্ষক। বুঝিয়ে দিচ্ছেন, কী ভাবে দৈনন্দিন জীবনের বিষয়গুলিকে ইংরেজিতে প্রকাশ করতে হয়। অনায়াসেই ধরে ফেলছে ছাত্ররা।
সন্দীপবাবু বলছেন, ‘‘আমরা অকারণে ইংরেজির প্রতি ভীতি তৈরি করি। মজা করে নাচ-গান, নাটক, বা খেলার ছলে পড়ুয়াদের শেখালে খুব সহজেই ওরা ইংরেজিটা রপ্ত করতে পারে। জেলার বিভিন্ন প্রান্তে শিবির করে সেই চেষ্টাই করছি।’’
২০১৬ সালের ১-৩ জানুয়ারি নশিপুর হাই মাদ্রাসার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠান হবে। চার দিনের শিবির শেষ হওয়ার পরেই তাই ইংরেজির শিক্ষক মাসুদ আলম উৎসাহী পড়ুয়াদের নিয়ে নাটকের মহড়ার প্রস্তুতি শুরু করবেন। তিনি বলেন, ‘‘ছেলে-মেয়েদের উৎসাহটা ধরে রাখতে নিয়ম করে ক্লাসের বাইরে ইংরেজি শেখার পাঠ দেব। তারপর কয়েকজনকে নিয়ে নাটক করা হবে।’’ কী নাটক হবে, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। প্রাথমিক ভাবে স্থির হয়েছে, সদ্য প্রয়াত প্রাক্তন রাষ্টপতি এপিজে আব্দুল কালামের জীবনের উপর নাটক পরিবেশন করা হবে। লিখবেন সন্দীপবাবু নিজেই।
সন্দীপবাবুর এমন উদ্যোগ অবশ্য এই প্রথম নয়। নিজের স্কুল, কাতলামারি হাইস্কুলের পড়ুয়াদের নিয়েও তিনি ইংরেজি শেখানোর শিবির করেছেন। সেই শিবিরের ছাত্র ইয়া মাতিন এখন নিজেই প্রশিক্ষক। ইংরেজি নিয়ে লেখাপড়ার করার তিনিও অনেককে অভিনয়ের মাধ্যমে ইংরেজি শেখাচ্ছেন। তাঁর কথায়, ‘‘সীমান্তের গ্রামে বাস করে ইংরেজি বলা অসম্ভব বলে মনে হত। স্যরের কাছে ইংরেজি শিখতে গিয়ে বুঝলাম, ধারণাটা ভুল। খেলার ছলে ইংরেজি শেখানো যায়।’’
নসিপুর মাদ্রাসার চারদিনের শিবিরে অংশ নেওয়া মোবাসসির হোসেন, রুমানা ইয়াসমিনরা বলছে, ‘‘ইংরেজি ক্লাসের নাম শুনলেই ভয় হত, অথচ চার দিনে মনে হচ্ছে অনেকটাই শিখেছি। সকলের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলছি।’’ আরও কয়েকটা দিন শিবির হলে ভাল হত, বলছে ওই পড়ুয়ারা।
মুর্শিদাবাদের সহকারি বিদ্যালয় পরিদর্শক গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায় শিবির দেখতে শুক্রবার ওই মাদ্রাসায়
যান। সব দেখে তাঁর প্রতিক্রিয়া, ‘‘সীমান্তের এই মাদ্রাসায় অভিনব কায়দায় ইংরেজি শেখানো হচ্ছে। অন্য স্কুলগুলিও পড়ুয়াদের ইংরেজি ভীতি কাটাতে এ রকম উদ্যোগ নিলে
ভাল হবে।’’