Advertisement
E-Paper

নতুন মঞ্চে নাট্যোৎসব শহরে

এক বছর আগেও যেখানে স্থায়ী মঞ্চ ছিল না, এ বছর সেখানে গোটা শীতকাল জুড়ে নবনির্মিত নাট্যমঞ্চে একের পর এক নাটক মঞ্চায়নের জন্য তৈরি নবদ্বীপ! ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে নবদ্বীপের প্রতিভাস এবং কমিউনিটি থিয়েটারের যৌথ প্রযোজনায় রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’। ৮ ডিসেম্বর নবদ্বীপ সায়কের ‘এসো বসন্ত’। ২২ থেকে ২৭ ডিসেম্বর টানা পাঁচদিন ধরে চলবে পশ্চিমবঙ্গ নাট্য অ্যাকাডেমি আয়োজিত নাট্যোৎসব।

দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৫ নভেম্বর ২০১৫ ০১:০৫
নবনির্মিত রবীন্দ্র সংস্কৃতি মঞ্চে চলছে অনুষ্ঠান। —নিজস্ব চিত্র

নবনির্মিত রবীন্দ্র সংস্কৃতি মঞ্চে চলছে অনুষ্ঠান। —নিজস্ব চিত্র

এক বছর আগেও যেখানে স্থায়ী মঞ্চ ছিল না, এ বছর সেখানে গোটা শীতকাল জুড়ে নবনির্মিত নাট্যমঞ্চে একের পর এক নাটক মঞ্চায়নের জন্য তৈরি নবদ্বীপ!

১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে নবদ্বীপের প্রতিভাস এবং কমিউনিটি থিয়েটারের যৌথ প্রযোজনায় রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’। ৮ ডিসেম্বর নবদ্বীপ সায়কের ‘এসো বসন্ত’। ২২ থেকে ২৭ ডিসেম্বর টানা পাঁচদিন ধরে চলবে পশ্চিমবঙ্গ নাট্য অ্যাকাডেমি আয়োজিত নাট্যোৎসব। রয়েছে নবদ্বীপ নাট্য উন্নয়ন পরিষদ আয়োজিত নাট্য বার্ষিক সম্মেলনও। নতুন বছরের ২৪ জানুয়ারি স্বজনের উদ্যোগে মঞ্চস্থ হবে সায়ক প্রযোজিত মেঘনাদ ভট্টাচার্য নির্দেশিত, অভিনীত নাটক ‘দামিনী হে’। একের পর এক এমন নাটকের আয়োজনে খুশি শহরবাসীও।

শহরে নাটক নিয়ে আবেগ সব সময় চড়া সুরে বাঁধা। আর সেই সুরটি বেঁধে দিয়েছিলেন চৈতন্যদেব স্বয়ং। বলা হয় নবদ্বীপ তো বটেই গোটা বঙ্গদেশেই মঞ্চাভিনয়ের প্রাচীনতম প্রয়াসটি নিয়েছিলেন চৈতন্যদেব।

Advertisement

ইতিহাস বলে সেটা ছিল ১৫০৯ সাল। বর্ষা সবে বিদায় নিয়েছে। গয়া থেকে ফিরেছেন নিমাই পণ্ডিত। শরতের মেঘমুক্ত আকাশে উৎসবের আমেজ। সেই আবহে নাট্যাভিনয়ে উদ্যোগী হলেন বিশ্বম্ভর মিশ্র। চন্দ্রশেখর আচার্যের বাড়ির উঠোনে শামিয়ানা খাটানো হল। তিনি সম্পর্কে চৈতন্যদেবের মেসোমশাই। ফুলমালা দিয়ে সাজানো হল গোটা প্রাঙ্গণ। ‘রুক্মিণীহরণ’ পালা অভিনীত হবে। স্বয়ং নিমাই সেই পালায় অভিনয় করবেন। চারদিকে সাজে সাজো রব।

চৈতন্যজীবনীকার বৃন্দাবন দাস তাঁর ‘চৈতন্য ভাগবতে’ সেই ঘটনার বর্ণনা করে লিখেছেন, ‘একদিন প্রভু বলিলেন সভাস্থানে। আজি নৃত্য করিবাঁও অঙ্কের বন্ধনে। সদাশিব বুদ্ধিমন্ত খানেরে ডাকিয়া। বলিলেন প্রভু কাছে সজ্জ কর গিয়া। শঙ্খ কাঁচলি পাটশাড়ি অলঙ্কার। যোগ্য যোগ্য করি সজ্জ কর সভাকর।’ সেদিন নিমাই রুক্মিণীর চরিত্রে অভিনয় করেন। অনান্য চরিত্রে অদ্বৈত, শ্রীবাস, নিত্যানন্দ, মুরারি প্রমুখ। দর্শকের আসনে শচীদেবী, বিষ্ণুপ্রিয়া, শ্রীবাসপত্নী মালিনী-সহ নবদ্বীপের বৈষ্ণবসমাজ। অভিনয়ের তুঙ্গ মুহূর্তে ভাবাবিষ্ট নিমাই মূর্ছা যান। গবেষকেরা বলেন, সেই নাটকে চৈতন্যদেব তৎকালে প্রচলিত অভিনয় ধারা থেকে বেরিয়ে স্বতন্ত্র এক উন্নত নাট্যধারার প্রবর্তন করেন।

শুরুটা এ ভাবেই। তারপর গঙ্গা দিয়ে গড়িয়েছে অনেক জল। চৈতন্যদেবের নাট্যাভিনয় পরবর্তী পাঁচশো বছরেরও বেশি সময় ধরে নবদ্বীপ মঞ্চাভিনয়ের অনেক বাঁক, অনেক ওঠাপড়া, অনেক ভাঙ্গাগড়ার সাক্ষী থেকেছে। শ্রীচৈতন্য দেশজ নাট্যগীতির আঙ্গিক এবং বিষয় ভাবনার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে ছিলেন। তার তিনশো বছর পরে নবদ্বীপে বসেই যাত্রাভিনয়ের আমূল সংস্কার করেন মতিলাল রায়। তাঁকে বলা হয় আধুনিক যাত্রার রূপকার। এই শহরেই জন্মেছেন প্রখ্যাত পরিচালক নিতাই ভট্টাচার্য, ডাকসাইটে অভিনেতা অমর গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্ব।

নাট্যচর্চার এহেন ঐতিহ্য যে শহর বহন করে চলে সেই শহরে এক বছর আগেও কোনও আধুনিক স্থায়ী নাট্যমঞ্চ ছিল না! এ নিয়ে নবদ্বীপের মানুষের, আরও স্পষ্ট করে বললে সাংস্কৃতিক মহলে ক্ষোভের অন্ত ছিল না। আধুনিক মঞ্চের অভাবে ভাল নাটকের আয়োজন করা যেত না। তাই ভাল নাটক দেখতে না পাওয়ার আক্ষেপ কুরে খেত নবদ্বীপবাসীকে। এ দিকে, নাট্যমঞ্চের অভাব, আলো-শব্দের মান্ধাতার আমলের উপকরণ, স্থানীয় ডেকরেটর দিয়ে কোনও মতে নাটকের ঐতিহ্যকে ধরে রাখছিল নাটকের দলগুলি। শুধুমাত্র ইচ্ছেটুকু সম্বল করে কোনও আধুনিক উপকরণ ছাড়াই নাটক করছিলেন নবদ্বীপের নাট্যকর্মীরা। দেশলাইয়ের বাক্সের মতো ছোট্ট এক টুকরো মঞ্চে ঘেমে নেয়ে স্নান করতে করতে সংলাপে ডুবে যেতেন নাটকের কুশীলবেরা। গরমে হাঁসফাঁস দর্শক এক সময় বাধ্য হয়ে হাট করে খুলে দিতেন হলের দরজা। মঞ্চ থেকে একটু দূরে রাখা অস্থায়ী জেনারেটরের শব্দকে পাত্তা না দিয়ে নাটক দেখতেন। বলা ভাল, দেখতে বাধ্য হতেন।

ছবিটা আমূল বদলে গেল চলতি বছরের মার্চ মাসে। ২ মার্চ, খুলে গেল বহুকাঙ্খিত স্থায়ী নাট্যমঞ্চের দরজা। নবদ্বীপের নাট্যমোদী মানুষের নতুন ঠিকানা হল রবীন্দ্র সংস্কৃতি মঞ্চ। সৌজন্যে নবদ্বীপ পুরসভা। চৈতন্যেদেবের ৫৩০তম জন্মোৎসবের প্রাক্কালে নবদ্বীপ পেয়েছে তার বহু প্রতীক্ষিত নাট্যমঞ্চ। ইতিহাসের শহর নবদ্বীপে গোড়াপত্তন হল নতুন এক ইতিহাসের।

নতুন নাট্যমঞ্চ উদ্বোধনের চারমাসের মাথায় নবদ্বীপে নান্দীকার মঞ্চস্থ করল তাঁদের এ সময়ের অন্যতম প্রযোজনা ‘মাধবী’। প্রায় সাড়ে আটশো আসনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হল উপচে পড়ল দর্শকে। নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার আগে আয়োজক সংস্থা ‘নবদ্বীপ সায়ক’কে মাইক বের করে টিকিট ফুরিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়ে দুঃখ প্রকাশ করতে হয়। মাধবীর ১৫০তম রজনীতে এমন ঘটনায় নান্দীকার প্রধান রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তের মন্তব্য ছিল, “আগেই শুনেছিলাম টিকিটের খুব চাহিদা। তারপর দেখলাম লোকে লম্বা লাইন দিয়েছেন নাটক দেখবেন বলে। নান্দীকারের নাটক দেখতে মানুষের এই আগ্রহ দেখে তৃপ্তি হয়।’’

এরপর কয়েক মাসের ব্যবধানে একে একে নবনির্মিত নাট্যমঞ্চে মঞ্চস্থ হয়েছে ‘উত্তর প্রবেশের’ আয়োজনে গৌতম হালদারের একক অভিনয় সমৃদ্ধ ‘বড়দা বড়দা’ ও নিত্য গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘হাম্বা’। সেখানেও প্রেক্ষাগৃহ ছিল পূর্ণ। নভেম্বরের প্রথম দু’টি সন্ধ্যায় দেবশঙ্কর হালদারের মুখোমুখি হয়ে নবদ্বীপের শীতকালীন নাটকের মরশুমের শুভ সুচনা হয়েছে। সমস্বর এবং ইন-ফরমেশন-এর যৌথ আয়োজনে ব্রাত্য বসুর নাটক ‘রুদ্ধসঙ্গীত’ এবং রাজা ভট্টাচার্যের নাটক ‘ফুড়ুৎ’ নিয়ে মিনি নাট্যোৎসবে তৈরি হয়েছে আরও এক নতুন নজির।

নাটক দেখার জন্য মাসখানেক আগে থেকে হলের অস্থায়ী কাউন্টার থেকে প্রবেশপত্র বিক্রির ব্যবস্থা ছিল। কাউন্টার অবশ্য নামেই। দুটি টেবিল আর খানকয়েক চেয়ার পেতে খোলা আকাশের নিচে বসে এ ভাবে টিকিট বিক্রি আগে কখনও হয়নি বলেই দাবি উদ্যোক্তাদের। নাটকের টিকিট নিয়ে কুণ্ঠিত ভাবে যেচে দর্শকের কাছে যাওয়া নয়। বরং নাটকের টানে দর্শক আসেন কিনা সেটাই পরীক্ষামূলক ভাবে দেখাই ছিল উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্য। তাতে শতকরা ৮০ নম্বর পেয়ে পাশ করেছেন নবদ্বীপের মানুষ। কেন না অধিকাংশ দর্শক প্রবেশপত্র সংগ্রহ করেছেন ওই অস্থায়ী কাউন্টার থেকেই। প্রমাণ হয়েছে কল্যাণী-কলকাতার দর্শকের মতো নবদ্বীপের নাটকপ্রিয় মানুষও একই ভাবে প্রস্তুত নাট্যোৎসবে নিজেকে সামিল করতে।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy