জিনিসপত্রের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। পুজোর উপকরণ থেকে শুরু করে প্রতিমা, ঢাকি পুরোহিত—খরচ সামলাতে নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড় পুজো কর্তাদের। বড় শহরে তবু বিভিন্ন বাণিজ্যিক সংস্থার ‘স্পনসর’ মেলে। খরচের বিরাট অংশ সেখান থেকে উঠে আসে। কিন্তু শহর ছাড়িয়ে মফস্সলের দিকে গেলে পরিস্থিতি মালুম হয়। চলতি প্রথার বাইরে গিয়ে অন্য রকম কিছু করতে গেলে টান পড়ে ভাঁড়ারে। খরচের কথা ভেবে রাতের ঘুম উড়ে যায় ক্লাবকর্তাদের।
এমন সমস্যা সমাধানে এক অভিনব উপায় নিল রঘুনাথগঞ্জের প্রতাপপুরের জাগ্রত সঙ্ঘ। এ বারে প্রতিমা দেখতে হলে টিকিট কেটে ওই সঙ্ঘের মণ্ডপে ঢুকতে হবে দর্শনার্থীদের। টিকিটের দাম ধার্য করা হয়েছে ৫ টাকা। বুধবার রাজ্য সরকারকে রীতিমতো কর দিয়ে টিকিট আদায়ের অনুমতিও নিলেন তাঁরা।
ক্লাবের সভাপতি মুক্তিপ্রসাদ ধর জানান, উদ্বাস্তু কলোনি প্রতাপপুরে লাখ তিনেক টাকা চাঁদা তুলতে অসুবিধেয় পড়তে হয়নি। কিন্তু এ বারে থিম হিসেবে ক্লাবেরই এক সদস্য সঞ্জিত সরকার সতীর দেহত্যাগ ও ৫১ পীঠের পরিকল্পনার কথা বলেন। হিসেব কষে দেখা যায় সব মিলিয়ে খরচ পড়বে প্রায় ৮ লক্ষ টাকা। তিনি বলেন, ‘‘চাঁদা তুলে এত টাকা সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। তেমন স্পনসরও মেলেনি। তাই অর্থ সংগ্রহের বিকল্প রাস্তা খুঁজতে গিয়ে টিকিট কেটে প্রতিমা দর্শনের চিন্তা মাথায় আসে।’’
ক্লাবের সম্পাদক চন্দ্রশেখর দাস বলেন, ‘‘দুর্গা-সহ মোট ৫৩টি প্রতিমা তৈরির খরচ দিতে রাজি হন ৪০টি পরিবার। বাকি ৫০০ পরিবার সাধ্য মতো চাঁদা দেবেন বলে ঠিক হয়। কিন্তু তারপরেও ঘাটতি কী ভাবে মিটবে সেই চিন্তা ছিল। সব দিক ভেবে টিকিট কেটে প্রতিমা দেখানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।’’ ৫ টাকা দিয়ে প্রতিমা দেখবেন দর্শনার্থীরা। বিনিময়ে তাই মণ্ডপকে আকর্ষণীয় করতে এখন নাওয়া-খাওয়া ভুলেছেন ক্লাবের ৪৫ জন সদস্য। তাঁদের বিশ্বাস, অন্তত ৫০ থেকে ৭০ হাজার দর্শক আসবেন। সেই ভাবে ৫২টি মণ্ডপ প্রায় ১০০০ মিটার এলাকা জুড়ে সাজানো হচ্ছে। তাঁদের কথায়, ‘‘সফল হলে ভবিষ্যতে অন্য ক্লাবগুলিও এ পথেই হাঁটবে বলে বিশ্বাস।’’
ছেলে সন্দীপকে সঙ্গে নিয়ে শহরেরই মৃৎশিল্পী দিলীপ দাস এখন চূড়ান্ত ব্যস্ত প্রতিমায় শেষ তুলির টান দিতে। দিলীপবাবু বলেন, ‘‘দুর্গা ও সতীর মৃতদেহ কাঁধে শিবের বিশাল মূর্তি সহ ৫৩টি মূর্তি তৈরির কাজ শুরু করি গত চৈত্র মাস থেকে। ৫১টি পীঠের ছবি সংগ্রহ করে সেই মতো প্রতিমা গড়তে প্রচুর খাটতে হয়েছে।’’ বাড়িতে অত প্রতিমা রাখার জায়গা নেই। তাই ২০টি প্রতিমা গড়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে ক্লাবের কাছে। সব মিলিয়ে ২ লক্ষ টাকা দাম ধরা হয়েছে প্রতিমা গড়ার জন্য। এখন চলছে জড়ির সাজ পরানোর কাজ। লোকে যাতে টিকিট কেটে প্রতিমা দেখতে আসে তার জন্য কিছু পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে।
উদ্যোক্তাদের এমন পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন অধ্যাপক কাশীনাথ ভকত। তিনি বলেন, ‘‘বাণিজ্যিক সংস্থার সংশ্রব এড়িয়ে চাঁদা সংগ্রহে এই ভাবনা প্রশংসার যোগ্য। এই উদ্যোগ অভিনব হলেও যথেষ্ট বাস্তবমুখী।’’
রঘুনাথগঞ্জ শহরের বাসিন্দা সরকারি আইনজীবী অশোক সাহা বলেন, ‘‘ছোট শহরে মোটা অঙ্কের চাঁদা তোলা বেশ কষ্টকর। দুর্গাপুজোর বিশাল খরচের বোঝা সামলানো যে কত কঠিন যাঁরা আয়োজন করেন তাঁরাই তা জানেন। তাই শহরের দু’একটি ক্লাব পুজোর খরচ তুলতে টিকিট কেটে প্রতিমা দর্শনের যে পথ নিয়েছেন তা কিছুটা অভিনব তো বটেই।’’
তবে ওই ক্লাবই প্রথম নয়, বছর দু’য়েক আগে পরীক্ষামূলক ভাবে এমন রীতি চালু করেছিল রঘুনাথগঞ্জ শহরের কিশোর বাহিনী ক্লাব। ২০১৩ সালে একদিনের জন্য দর্শনার্থীদের কাছ থেকে এই ব্যবস্থা চালু করেছিল ওই ক্লাব পুজোর খরচ সংগ্রহের জন্য। একদিনেই দর্শনার্থীদের কাছ থেকে চাঁদা সংগ্রহ হয়েছিল ৩৮ হাজার টাকা। গত বারে তিন দিনের পুজোয় দর্শনার্থী পিছু ৩ টাকা করে আদায়ের অঙ্ক প্রায় লক্ষাধিক টাকা। সেই দৃষ্টান্তকে সামনে রেখেই জাগ্রত সংঘের উদ্যোক্তাদের আশা টিকিট কেটে প্রতিমা দর্শনের এই ব্যবস্থায় চাঁদা আদায়ের ঝুঁকি ও দায় কমবে অনেকটাই।