Advertisement
E-Paper

বাপের ভিটেয় মলিন চাঁদ

তিনি হাইকোর্টের আইনজীবী। তিনি সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় মন্ত্রিসভার জনপ্রিয় মন্ত্রী, প্রয়াত আব্দুস সাত্তারের ছেলে।

অনল আবেদিন

শেষ আপডেট: ১৪ এপ্রিল ২০১৬ ০১:৩৬

তিনি হাইকোর্টের আইনজীবী।

তিনি সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় মন্ত্রিসভার জনপ্রিয় মন্ত্রী, প্রয়াত আব্দুস সাত্তারের ছেলে।

তিনি সেই সুবাদে টানা ২৫ বছরের ‘নিষ্ক্রিয়’ বিধায়ক।

Advertisement

তিনি সেই সুবাদে কংগ্রেস-তৃণমূল জোটের কয়েক মাস মৎস্যমন্ত্রী (পরে জোট ও মন্ত্রিত্ব দু’টোই ছাড়েন)।

তিনি সেই সুবাদেই মুর্শিদাবাদ জেলা কংগ্রেসের সভাপতি (অবশ্য মনে করিয়ে না দিলে জেলা কমিটির সদস্যেরাও মনে করতে পারেন না)।

তিনি সেই সুবাদে এ বারেও গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকার ‘প্রবাসী’ প্রার্থী। কারও-কারও মতে ‘বহিরাগত’ও।

তিনি আবু হেনা।

লালগোলার ভূমিপুত্র হয়েও তিনি ‘বহিরাগত’ কেন? সেই প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে প্রতিদ্বন্দ্বী আর এক ‘বহিরগাত’ প্রার্থীর যৎকিঞ্চিত পরিচয় নেওয়া যাক।

তিনি বাংলাদেশের সীমানা লাগোয়া পদ্মাপাড়ের ভগবানগোলার ভূমিপুত্র।

তিনি সেই সুবাদে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর একাংশের বিশেষ ‘পেয়ারের লোক’ বলে পরিচিত।

তিনি সেই সুবাদে একদা বামফ্রন্টের মৎস্যমন্ত্রী কিরণময় নন্দের অতি ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠা ভগবানগোলার দু’বারের বিধায়ক।

তিনি সেই সুবাদে দলবদল করে তৃণমূলে ভিড়ে বছর দুয়েক থেকে পরিষদীয় সচিব।

তিনি গৃহবিবাদে ভগবানগোলা ছিটকে গিয়ে এখন লালগোলার ‘বহিরাগত’ প্রার্থী।

তিনি চাঁদ মহম্মদ (তৃণমূল)।

স্বাধীনতা ইস্তক এ পর্যন্ত সব ক’টি বিধাসনভা নির্বাচনে লালগোলায় কংগ্রেসেরই মৌরসি পাট্টা। ১৯৬৭ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত বিধায়ক ছিলেন লালগোলার ভূমিপুত্র আব্দুস সাত্তার। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত সিদ্ধার্থ রায়ের মন্ত্রিসভায় কৃষিমন্ত্রীও ছিলেন তিনি। সেটা ছিল ইন্দিরা গাঁধীর ‘সবুজ বিপ্লব’-এর যুগ। জনশ্রুতি, ওই সময়ে সাত্তারের সৌজন্যে লালগোলার কোনও ‘এইট পাশ’ যুবকও বেকার ছিল না। কৃষি, বিদ্যুৎ, সেচ ও শিক্ষা দফতরে তিনি ডেকে ডেকে চাকরি দিয়েছিলেন বলে আজও লালগোলার প্রবীণেরা মাচায় বসে গল্প করেন, সিগারেটের প্যাকেটে লেখা চিরকুটে চাকরি হয়েছে কত জনের! আর, সেই মিথের সরণি ধরেই ‘সাত্তারের ব্যাটা’ কৃতজ্ঞতার ভোটে পরপর পাঁচ বার বৈতরণী পার হয়েছেন।

কিন্তু বছর দশেক হল, ভোট এলেই লালগোলায় আবু হেনাকে নিয়ে শুরু হয় ‘বহিরাগত’ ও ‘নিষ্ক্রিয়তা’র চর্চা। এ বারও দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেই কথা উঠেছে, তিনি সোম থেকে শুক্র কলকাতায় থাকেন। শনিবার দুপুর থেকে বিকেল থাকেন লালগোলায় কংগ্রেস পার্টি অফিসে। বহরমপুরে রাত কাটিয়ে রবিবারের দুপুরটুকু থাকেন লালগোলার পার্টি অফিসে। বিকেলের ফিরতি ট্রেনে ফেরেন কলকাতায়।

নশিপুর অঞ্চলের এক কংগ্রেস কর্মী উগরে দেন ক্ষোভ, ‘‘অধীর চৌধুরী প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি হওয়ার পরে আবু হেনাকে জেলা কংগ্রেস সভাপতি করা হয়। তার পর থেকে শনিবারও লালগালায় আসা ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। অথচ, বিধায়কের কাছে মানুষের কত কাজ থাকে!’’

চর গয়েশপুরের কংগ্রেস পঞ্চায়েত সদস্য জান মহম্মদ বলে চলেন, ‘‘মাস তিনেক আগে ইজারাদারদের মধ্যে দ্বন্দ্বের জেরে গ্রামে খেয়া পারাপার দেড় মাস বন্ধ ছিল। গোটা গ্রাম গৃহবন্দি। এলাকার প্রধান কংগ্রেসের, পঞ্চায়েত সমিতি কংগ্রেসের, জেলা পরিষদের স্বাস্থ্য কর্মাধ্যক্ষ কংগ্রেসের, বিধায়ক কংগ্রেসের, সাংসদ কংগ্রেসের। বিধায়ক-সাংসদ সবাইকেই বলেছি। তাঁরা কেউ গা করেননি।’’

কয়েক দিন আগে ভাগীরথী পাড়ে নশিপুর প্রচারে গিয়ে ভাঙন নিয়ে দলেরই লোকজনদের ক্ষোভের মুখ পড়েছিলেন আবু। তবু ‘সাত্তার সাহেবের ব্যাটা’ বলেই আজও তাঁকে ভোট দেয় চর গয়েশপুর।

সিকি শতকের বিধায়ক অবশ্য এ সবে পাত্তা দিতে নারাজ। এঝটকায় তিনি বলেন, ‘‘ও সব বোগাস কথার কি কোনও উত্তর হয়!’’ এ ভাবে মাছি তাড়ানোর মতো সব উড়িয়ে দেওয়ার জোর অবশ্য তিনি পাচ্ছেন জোটের অঙ্কে। গত বার তৃণমূলকে জোটসঙ্গী করে ভোট শতাংশে তিনি হাফ সেঞ্চুরি টপকে গিয়েছিলেন। ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে কংগ্রেস-সিপিএমের মিলিত ভোট ছিল ৭৪ শতাংশ। আবু কাকে পাত্তা দেবেন?

ডেভিড বনাম গোলিয়াথের এই ‘অসম’ লড়াইয়ে নেমে তৃণমূল প্রার্থী হাইকোর্টের আইনজীবীর বিপরীত পথে হাঁটছেন। একেবারে মাটিতে নেমে মিশছেন আমজনতার সঙ্গে। ‘বহিরাগত’ তকমার সঙ্গেও তিনি লড়াই করছেন নিজের ভিটেমাটি চিনিয়ে দিয়ে। ‘‘ভগবানগোলার একটি পঞ্চায়েতের নাম কান্তনগর। সেটি তো এই লালগোলা বিধানসভা কেন্দ্রেই অধীন। তা হলে আমি কিসের বহিরাগত? আমার বাড়ি তো পাশের বিধানসভা এলাকায়!’’— সওয়াল করছেন চাঁদ।

এর চেয়েও মোক্ষম যুক্তি দিয়েছেন লালগোলার এক ভ্যানচালক। তাঁর ভ্যানে চাপানো হয়েছিল চাঁদের মুখ আঁকা ফ্লেক্স। ফ্লেক্সের সেই ছবি দেখে ওই ভ্যানচালক অবাক ভঙ্গিতে বলেন, ‘‘আরে এ যে আমাদের চাঁদুরে! চাঁদু! কত দিন কালীপুজোর সিজিনে চাঁদুর সাথে তাস খেলেছি।’’

সীমান্ত শহর লালগোলার তাস খেলার খ্যাতি রয়েছে জেলা জুড়েই। আবার এই সীমান্ত শহরই গোয়েন্দা দফতরের মানচিত্রে হেরোইন ও গরু পাচারের আন্তর্জাতিক ‘ট্রানজিট পয়েন্ট’। কংগ্রেসের দাবি, তৃণমূলের ভোট প্রচারে থাকা অনেকেরই নাম রয়েছে গোয়েন্দা খাতায়।

সেই সঙ্গে টিপ্পনী, ‘‘মমতা এত ভালবাসলে চাঁদকে ভগবানগোলার আকাশ থেকে উপড়ে লালগোলার মতো বিদেশি আকাশে ছুড়ে ফেলতেন না।’’

ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের মতে লালগোলার বাম ও কংগ্রেস ভোটের একটি অংশ এবার ঝুঁকে রয়েছে বিজেপির দিকে।

কিন্তু সে তো নগন্য।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy