‘আস্তে লেডিজ’— কথাটা বাসকর্মীদের মুখে-মুখে ফিরলেও মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণের কোনও বালাই নেই মুর্শিদাবাদ জেলার বেসরকারি বাসে। আগে উঠে জায়গা না পেলে অন্তঃসত্ত্বারা দাঁড়িয়ে থাকেন, শিশু কোলে মায়েরাও। হাঁটুতে অসহ্য ব্যাথা নিয়ে দাঁড়িয়ে প্রৌঢ়া, বৃদ্ধারা। নির্বিকার মুখে আসনে বসে রয়েছেন শক্ত-সমর্থ যুবা।
অমানবিক মানসিকতাটা সাধারণ যাত্রীদের যেমন, তেমনই বাসমালিক-বাসকর্মীদেরও। কারণ ওয়েস্ট বেঙ্গল মোটর ভেহিক্যালস্ অ্যাক্টের ১৯৮৯ সালের ২৩৩ বিধি অনুযায়ী বাসের মোট আসনের ২৫ শতাংশ যে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত রাখতে হবে, তা বিলক্ষণ জানেন বাসমালিকেরা। বাস কেনার পর রেজিস্ট্রেশন করাতে নিয়ে যাওয়া হয় যখন, তখন নিয়ম মেনেই নির্ধারিত আসনের উপর লেখা
থাকে ‘মহিলা’ শব্দটি। কিন্তু কাজ হয়ে যাওয়ার পর সেখান থেকে বেরিয়েই পয়সা দিয়ে বা কালি দিয়ে মুছে দেওয়া হয় ‘মহিলা’।
দফতরে ফাইল-সইয়ের পর বাইরে রাস্তায় কী হচ্ছে—তা নিয়ে কোনও দিনই মাথাব্যাথা ছিল না পরিবহণ দফতরের। বিনা নজরদারিতে তাই আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দৌড়চ্ছে বাস।
বাসমালিকরা অমানবিকতার দায়টা চাপাচ্ছেন সাধারণ যাত্রীদের কাঁধে। তাঁদের বক্তব্য, পুরুষ যাত্রীরা আসন সংরক্ষণ নিয়ে অশান্তি করবে বলে এই ব্যবস্থা। কোনও কোনও বাসমালিক আবার মহিলা আসন সংরক্ষণের আইন জানা নেই বলে দাবি করছেন। খোদ জেলার ফেডারেশন অফ বাস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুব্রত ঘোষালের দাবি, এই আইনের কথা জানা নেই তাঁর। জেলার এক বাস মালিক দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় আবার দাবি করছেন, ‘‘কেবলমাত্র লোকাল বাস ছাড়া আসন সংরক্ষণের নিয়ম নেই। কলকাতাতেও লোকাল বাস ছাড়া ওই ব্যবস্থা থাকে না।’’ আগে থেকে টিকিট কেটে আসন ভর্তি করে দূরপাল্লার বাস ছাড়া হয় বলে মহিলা সংরক্ষণে নাকি অনেক ঝামেলা।
কিন্তু লোকাল বাসেই বা মহিলাদের জন্য আসন ছাড়া থাকছে কই? মুর্শিদাবাদ জেলার একটি মানবাধিকার সংগঠন এই নিয়ে দীর্ঘ দিন আন্দোলন করছে। ওই সংগঠনের সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘‘আইনি অধিকার পরের কথা, মানবিক ভাবেও তো কেউ বিষয়টি ভাবে না। শিশুসন্তানকে কোলে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মা দাঁড়িয়ে থাকে। বসতে চাইলে কেউ শরীর খারাপের অজুহাত দেখায় ভদ্র ভাবে, কেউ অভদ্র গলায় বলে, এতটুকু বাচ্চাকে নিয়ে বাইরে বেরনোর দরকার কী?’’
জেলার একটি মহিলা সংগঠন পরিবহণ দফতরে বারকয়েক স্মারকলিপি দিয়েছে এই বিষয়টি নিয়ে। ওই সংগঠনের নেত্রী শামিমা নাসরিনের মতে, বাসমালিকদের আইনভঙ্গকে নীরবে প্রশ্রয় দিচ্ছে পরিবহণ দফতর। তিনি বলেন, ‘‘যে কোনও সময় জেলা সদর বহরমপুর শহরের যে কোনও বাসে উঠলেই অমানবিক এই ছবি নজরে আসবে। জানি না বলে প্রশাসনের দায়সারা মনোভাব মেনে নেওয়া যায় না।’’
জেলা পরিবহণ দফতরের কর্তা চিরন্তন প্রামাণিক নজরদারির আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘‘লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’
সেই ফাইল-কাগজেই আটকে রইল পরিবহণ দফতর।