সরকারের তৈরি রাজ্যপালের বাজেট- ভাষণে জায়গা পেল না ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রসঙ্গ।
গত তিন- চার মাস ধরে কলকাতা থেকে দিল্লি পর্যন্ত যা নিয়ে তোলপাড় চলল, তা উপেক্ষিত হল বিধানসভায়! বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটমুখী বাজেট আর ভোটের তরজা হল ঠিকই কিন্তু কার্যত এলই না এসআইআর নিয়ে মৃত্যু, হয়রানি আর ষড়যন্ত্রের কথা। সরকারি তরফে পরিষদীয় মন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের আনা এই সংক্রান্ত প্রস্তাব আনা হলেও সুপ্রিম কোর্টে ‘বিচারাধীন বিষয়’ বলে বিধানসভায় আলোচনা করতে দিলেন না স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়।
মতবিরোধের কারণে আগে বেশ কয়েক বার রাজ্য বাজেটে রাজ্যপালের উপস্থিতি ঘিরে নবান্ন ও রাজভবনের মধ্যে টানাপড়েন তৈরি হয়েছিল। তবে এ বার ভোটের বছরে অন্তর্বর্তী বাজেটে পরিবেশ ছিল অন্য রকম। পরিষদীয় আমন্ত্রণে বৃহস্পতিবার রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোস বাজেটের আগে সরকারের কাজকর্ম নিয়ে বক্তৃতা করেন। তাতে এসআইআর নিয়ে সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কোনও প্রতিফলন ছিল না। বরং, সরকারের সাফল্যের বিবরণে ভরা রাজ্যপালের নির্বিবাদ বক্তৃতা নজর কেড়েছে শাসক বিধায়কদেরও। তৃণমূল তথা মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দ্বিচারিতার অভিযোগ করেছেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। তাঁর বক্তব্য, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এসআইআর নিয়ে বাইরে নাটক করছেন। কিন্তু রাজ্যপালের ভাষণে এসআইআর-হয়রানি নিয়ে কথা নেই!”
রাজনৈতিক শিবিরের ধারণা, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে লড়াইয়ে নিজেদের তৈরি আখ্যানকে ( ন্যারেটিভ) প্রশ্নহীন রাখতে বিধানসভার বাজেট অধিবেশনকে এ ভাবেই কাজে লাগাতে চেয়েছে রাজ্যের শাসক শিবির। জনসভা তো বটেই, সর্বশেষ কমিশন ও সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে ভাবে সাধারণ ভোটারের মন পেতে চেয়েছেন, তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক এড়াতেই শাসক শিবির এই কৌশল নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে রাজ্যপালের ভাষণ নিয়ে আলোচনায় বিজেপির তোলা ‘অনুপ্রবেশ’ প্রসঙ্গে জবাব দিতে এই প্রসঙ্গ ছুঁয়ে গিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
বিধানসভায় নিজের ঘরে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন, ‘‘রাজ্যপাল প্রথম সাড়ে চার মিনিট পড়েছেন। সেখানে কেন্দ্রের কাছে রাজ্যের পাওনার কথা লেখা ছিল, কোনও অসুবিধা নেই। এর তথ্য আছে। কিন্তু তথ্য ছাড়া যেখানে অসত্য ভাষণ আছে, সেটা উনি পড়েননি।’’ মুখ্যমন্ত্রী মমতা অবশ্য জানিয়েছেন, রাজ্যপালের দিল্লির উড়ান ধরার তাড়া ছিল। পরে রাজ্যপালের ভাষণ নিয়ে আলোচনায় শাসক তৃণমূলকে আক্রমণ করে বিরোধী দলনেতা বলেছেন, ‘‘সীমান্ত সুরক্ষায় জমি দিচ্ছে না রাজ্য সরকার। বাংলাদেশ ও বর্মা (মায়ানমার) থেকে অনুপ্রবেশকারী, রোহিঙ্গারা এ রাজ্যে এসে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাচ্ছে।’’ সীমান্ত নিয়ে এই প্রসঙ্গে পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলির বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অসহযোগিতার অভিযোগ করেন তিনি। বিজেপির সচেতক শঙ্কর ঘোষ বলেন, ‘‘রাজ্য কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা, নারী সুরক্ষার চেষ্টা ছিল না সরকারের। বরং সর্বাত্মক চেষ্টা ছিল অনুপ্রবেশকারীদের বাঁচানোর।’’ শুভেন্দুর কথায়, ‘‘রাজ্যপালের ভাষণে অনুপ্রবেশ সমস্যা নেই। তাই আমরা তাঁর ভাষণ গ্রহণ করছি না।’’
পাল্টা বিজেপিকেই কাঠগড়ায় তুলে সরকার পক্ষের একমাত্র বক্তা মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘নেই কাজ তো খই ভাজ! মাথায় শুধু অনুপ্রেশকারী!’’ তাঁর প্রশ্ন, ‘‘২০২৪ সালে আপনারা যে সরকার গড়েছেন, তা কি ভুয়ো তালিকায়? চোরের মায়ের বড় গলা!’’ বিজেপি শাসিত রাজ্যে বাংলা ভাষা ও বাঙালিদের উপরে অত্যাচারের অভিযোগ করে শুভেন্দুদের উদ্দেশে তাঁর প্রশ্ন, ‘‘তখন আপনারা কোথায় ছিলেন? আমাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী- টন্ত্রী দেখাবেন না!’’ সেই সূত্রেই মমতার মুখে এ দিন ফের শোনা গিয়েছে ফোনে আড়িপাতার অভিযোগ। তিনি বলেন, ‘‘জাতীয় গ্রন্থাগারের মতো কয়েকটি জায়গায় পেগাসাস যন্ত্র বসানো হয়েছে। দেশটাকে শেষ করে দিচ্ছেন!’’ তাঁর দাবি, বিজেপির অনেকেই আসন হারাবেন। ‘জিরো’ ছিল ‘জিরো থাকবে!
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)