অভিযোগ, বার বার নথি চেয়ে হয়রান করা হচ্ছে। তাই জমির দলিলের পাশাপাশি, দাদুর কবরের মাটি নিয়ে এসআইআর শুনানিতে হাজির এক যুবক। মালদহের হরিশ্চন্দ্রপুরের ওয়াড়ি-দৌলতপুরে। বছর তিরিশের সালেক সোমবার শুনানিকেন্দ্রে ব্যাগ থেকে মাটি বার করে বলেন, ‘‘দাদুর নামে জমির দলিলও এনেছি। তিনি ভারতীয়। আর এই মাটিতে তিনি মিশে আছেন। এই মাটির সঙ্গে মিলিয়ে ডিএনএ পরীক্ষা করে দেখা হোক, আমরা তাঁর বংশধর কি না।’’
সালেক প্রথম বার শুনানিতে ডাক পান বাবার নামের সঙ্গে অমিল থাকায়। এক বার নথি নিয়ে হাজির হলেও, ফের জমির দলিল আনতে বলা হয়। সালেকের ক্ষোভ, ‘‘দাদুর নামে জমির দলিল, বাবার নামে জমির দলিল আর দাদুর কবর থেকে মাটি এনেছি।’’ স্থানীয় ইআরও তথা মহকুমাশাসক (চাঁচল) ঋত্বিক হাজরা বলেন, ‘‘কমিশনের নির্দেশ মেনে কাজ করছি। এর বাইরে কিছু বলার নেই।’’ স্থানীয় বিধায়ক তথা মন্ত্রী তজমুল হোসেন বলেন, ‘‘আতঙ্কের পাশাপাশি ক্ষোভ থেকে সালেক এমন করেছেন।’’ যদিও উত্তর মালদহের বিজেপি সাংসদ খগেন মুর্মু বলেন, ‘‘যাদের নামে ত্রুটি রয়েছে, তাদেরই নোটিস পাঠাচ্ছে কমিশন। তৃণমূল উস্কানি দিয়ে নাটক করাচ্ছে।’’
শুনানিতে দ্বিতীয় বার ডাক পেয়েছেন মালদহেরই ইংরেজবাজারের অভিজিৎ সরকার। প্রথম বার নামের বানানের সমস্যা, দ্বিতীয় বার বাবার নামের সঙ্গে একাধিক জনের নামের মিল থাকায়। অভিজিৎ বলেন, ‘‘এত দুর্ভোগ! এর থেকে নাম কেটে দিলেই ভাল হয়!”
শুনানি নিয়ে এমন ছবির পাশাপাশি, আতঙ্কে পাঁচ জনের মৃত্যু, আত্মহত্যার চেষ্টার অভিযোগও মিলেছে। বিএলও, শুনানির লাইনে দাঁড়ানো মানুষ অসুস্থ হয়েছেন। গণ-ইস্তফা দিয়েছেন বিএলও-রা। অবরোধ-বিক্ষোভও হয়েছে।
এই আবহে আতঙ্কে-মৃত্যুর অভিযোগও উঠছে। উত্তর ২৪ পরগনার হিঙ্গলগঞ্জে হৃদ্রোগে মৃত ছয়েদ শেখের (৬২), রবিবার মুম্বইয়ে মৃত সাবির হোসেন ব্যাপারী (৩৬) নামে দক্ষিণ ২৪ পরগনার মথুরাপুরের এক পরিযায়ী শ্রমিকের ক্ষেত্রে এমনই দাবি পরিবারের। হাসপাতাল সূত্রের খবর, হৃদ্রোগে মৃত্যু। এসআইআর-শুনানিতে স্ত্রীর নামে নোটিস এসেছিল। স্ত্রী পারভিনা বিবিকে নিয়ে শুনানিতেও গিয়েছিলেন নদিয়ার হোগলবেড়িয়ার ফিজুর খান (৪৭)। রবিবার রাতে বাড়িতে তাঁর ঝুলন্ত দেহ মেলে। নদিয়ারই নাকাশিপাড়ায় এসআইআর-আতঙ্কে সামির আলি শেখ (৬২) নামে এক বৃদ্ধের হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর দাবি করেছে পরিবার। আতঙ্কে পুরুলিয়ার মানবাজারের দেবরাজ ওরাং (৩২) নামে এক দিনমজুর আত্মঘাতী হন বলে অভিযোগ তুলেছে তার পরিবার ও তৃণমূল। শুনানির নোটিস পেয়ে উদ্বেগে বিষ খেয়ে করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন হরিশ্চন্দ্রপুরের সিমরাহা এলাকার এক প্রবীণ বাসিন্দা, দাবি করেছে পরিবার।
বাবা ‘ভারতীয় নাগরিক নন’—এই মর্মে জমা পড়েছিল ৭ নম্বর ফর্ম। হুগলির পোলবা-দাদপুর ব্লক অফিসে এ দিন গিয়ে সে কথা জানতে পেরেছিলেন সংশ্লিষ্ট বিএলও। তাঁর বাবার দাবি, ওই ফর্ম-সহ ৩৩৪ জনের ফর্ম এক দিনে ‘আপলোড’ করতে হবে জেনে অসুস্থ হন তাঁর মেয়ে। শুনানির লাইনে দাঁড়িয়ে হাওড়ার উলুবেড়িয়া ১ ব্লক অফিসে জ্ঞান হারান প্রৌঢ়া, পরিযায়ী শ্রমিক ছেলের হয়ে শুনানিতে গিয়ে অসুস্থ হন পূর্ব বর্ধমানের মন্তেশ্বরের রাইগ্রামের বৃদ্ধ, শুনানিতে গিয়ে অসুস্থ হন মন্তেশ্বরের এক অন্তঃসত্ত্বাও। রামপুরহাট ২ ব্লক অফিসে শুনানিতে আসা আজিজা খাতুনের তিন বছরের শিশুকন্যা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে অসুস্থ হয়ে পড়ে। বিডিওর গাড়িতে শিশুটিকে মায়ের সঙ্গে রামপুরহাট মেডিক্যালে পাঠানো হয়।
মালদহের হরিশ্চন্দ্রপুর-১ ব্লকে শুনানিতে হয়রানির অভিযোগে তৃণমূলের বিক্ষোভে পুলিশ লাঠি চালায় বলে অভিযোগ। শুনানিতে আসা এক প্রসূতি জখম হন বলে দাবি। দক্ষিণ ২৪ পরগনার উস্তিতে এ দিন সন্ধ্যায় তাদের মিছিলে পুলিশ লাঠি চালানোয় অন্তত ১৫ জন জখম হন বলে সিপিএমের দাবি।
কোচবিহারের দিনহাটায় ১৪২ জন, বীরভূমের রামপুরহাটে অন্তত ১০০ জন, মুর্শিদাবাদের ভগবানগোলায় প্রায় ১০০ জন, বোলপুর-শ্রীনিকেতন ব্লকে ৮০ জন, হুগলির চণ্ডীতলা ১ ব্লকে প্রায় ৭৫ জন বিএলও এ দিন গণইস্তফা দেন। দক্ষিণ ২৪ পরগনায় প্রায় ৬০ জন বিএলও কাজ থেকে অব্যাহতি চেয়েছেন।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)