গ্রাম পঞ্চায়েতের তৈরি বাঁধ ভেঙে তিস্তার জল ঢুকছে বসতি এলাকায়। কাঠের পাটাতনের উপর তৈরি ঘরের নিচ দিয়ে বইছে স্রোত। সকালের দিকে জলস্তর সামান্য নামলেও বিকেলের পরে ফের রুদ্র মূর্তি ধরছে নদী। ময়নাগুড়ি ব্লকের বর্মণ পাড়া, চাতরার পাড়, মালবাজার মহকুমার মাস্টার পাড়া, কেরানি পাড়া, ঠাকুরদাস পাড়ার অন্তত পাঁচশো পরিবার তাই আতঙ্কে দিশেহারা। নিরুপায় হয়ে অনেকে সেচ দফতরের বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দু’দশক আগে চাষের জমি ও বসতি এলাকা রক্ষার জন্য সেচ দফতরের উঁচু বাঁধ থেকে আধ কিলোমিটার দূরে গ্রাম পঞ্চায়েতের পক্ষ থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ তৈরি করা হয়। বাসুসুবা সেন পাড়া এলাকায় কিছুদিন আগে ওই বাঁধের বিরাট অংশ নদী গর্ভে তলিয়ে গিয়েছে। জলের তোড়ে ভেসে আসা বালির আস্তরণে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে ধান, বাদাম ও পাট চাষের জমি। জলবন্দি হয়ে রয়েছে বাঁশ বাগান। বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে ফের বর্মনপাড়া এলাকায় বাঁধে ফাটল দেখা দিতে গ্রামে আতঙ্ক জাঁকিয়ে বসেছে।
রাত জেগে এলাকার মানুষ বাঁশ ও গাছের ডাল কেটে জলের পাকে ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। খবর পেয়ে সেচ দফতরের কর্তারা বাঁশের খাঁচা তৈরি করে বাঁধ রক্ষার কাজে নামেন। উত্তরবঙ্গ বন্যা নিয়ন্ত্রণ কমিশনের চেয়ারম্যান গৌতম দত্ত বলেন, “অবৈজ্ঞানিক ভাবে গ্রাম পঞ্চায়েতের তৈরি করা বাঁধে ফাটল দেখা দিয়েছে। বাঁশের খাঁচা তৈরি করে বাঁধ রক্ষা করার চেষ্টা চলছে। জানি না শেষ পর্যন্ত কি দাঁড়াবে।”
বাঁধের তদারকিতে ব্যস্ত মালবাজার মহকুমার চাঁপাডাঙা গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান রমণীকান্ত রায় জানান, বৃহস্পতিবার রাত থেকে ভাঙা বাঁধ দিয়ে হুহু করে বসতি এলাকায় জল ঢুকছে। পাকা রাস্তার সেতুর তলা গিয়ে পলি ভরা ঘোলা জল ছড়িয়ে পড়ছে মাস্টার পাড়া, কেরানি পাড়া, ঠাকুরদাস পাড়ায়। অন্তত তিনশো পরিবার সেখানে জলবন্দি হয়েছে। পনেরোটি পরিবার সেচ দফতরের উঁচু বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে। পানীয় জলের জন্য উঁচু এলাকায় দুটি নলকূপ বাসানো হয়েছে। ১৬ কুইন্ট্যাল চাল বিলি করা হয়েছে। জলপাইগুড়ি পুরসভা থেকে চারটি ট্যাঙ্কে পানীয় জল সরবরাহের কাজ চলছে।
প্রায় একই ছবি ময়নাগুড়ি ব্লকের বর্মনপাড়া, চাতরার পাড় এলাকার। জলপাইগুড়ি জেলা পরিষদের সভাধিপতি নূরজাহান বেগম বলেন, “বাঁধ ভেঙে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সেচ দফতর এবং জেলা প্রশাসনের কর্তাদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ত্রাণ সামগ্রী বিলির কাজও চলছে।” ময়নাগুড়ি পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি সুভাষ বসু জানান, বাঁধ ভেঙে শতাধিক পরিবার বিপন্ন হয়েছে। ব্লকের ইঞ্জিনিয়র এলাকা ঘুরে দেখেছেন।
চাতরার পাড় এলাকার বাসিন্দা বিমল দাস জানান, তাঁর ২৫ বিঘা ধানের জমি জলে তলিয়ে গিয়েছে। নদী ক্রমশ পূবে ধেয়ে আসায় গ্রাম পঞ্চায়েতের তৈরি বাঁধ বিপন্ন হয়েছে। নেদা দাসের ৩০ বিঘা, বীরেন দাসের ২০ বিঘা, হরিবালা দাসের ২৫ বিঘা বাদাম চাষের জমি বালির আস্তরণে চাপা পড়েছে। শঙ্কর দাস জানান, বাঁধের ভাঙন ঠেকানো সম্ভব না হলে পাকা রাস্তার পাশে প্রাথমিক স্কুল বিপন্ন হবে।
বাসুসুবা গ্রামের বাহাদুর রায় জানান, বিকেলের পর থেকে নদী ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। দীপু রায়ের কাঠের পাটাতন করা ঘরের তলা দিয়ে জলের স্রোত বইছে। তিনি বলেন, “রাতে জলের গর্জন শুনে বুক কাঁপে। ঘরে থাকতে না পেরে বাঁধে আশ্রয় নিয়েছি।” তিস্তার জলে ভেসেছে রাজগঞ্জের টাকিমারি চর এলাকাও।