ভারী বৃষ্টিতে উত্তরবঙ্গে কোথাও ভেসে গিয়েছে সেতু, কোথাও ধস নেমেছে পাহাড়ি রাস্তায়! ফুলেফেঁপে উঠেছে তিস্তা, তোর্সা, রায়ডাক-সহ নদীগুলি। শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং যাওয়ার ১১০ নম্বর জাতীয় সড়কে ধস নেমে বন্ধ হয়েছে টয় ট্রেন পরিষেবা। বিকল্প রাস্তা থাকায় উত্তরবঙ্গের কোনও অঞ্চল এখনও পর্যন্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েনি। তবে দুর্যোগ এ ভাবে চলতে থাকলে সেই আশঙ্কার বাস্তবায়ন হয়ে যেতে পারে। যার সম্ভাবনাও রয়েছে।
আলিপুর আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস, শনিবার উত্তরবঙ্গের তিন জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে উত্তরবঙ্গের নদীগুলি। জলের তোড়ে ভেঙে যেতে পারে সেতু। ভারী বৃষ্টিতে ধস নামতে পারে পাহাড়ি সড়কেও। শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিংগামী রোহিণী সড়কে গত বছর ধস নেমে বিপর্যয় ঘটেছিল। তখন কোনও মতে মেরামত করা হয়েছিল। এ বার ফের সেখানে ধস নামলে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে গোটা দার্জিলিং। কারণ, ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে সেখানে যাওয়ার অন্যতম প্রধান পথ ১১০ নম্বর জাতীয় সড়ক। এ বার রোহিণীতে ধস নামলে দার্জিলিঙে আটকে পড়তে পারেন পর্যটকেরা। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী উত্তরবঙ্গের পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে জানিয়েছেন, প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে। দুর্যোগের কারণে হাসিমারার ভোলানালায় চা-বাগানে চার বছরের একটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তার পরিবারকে চার লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য করার কথা জানিয়েছেন শুভেন্দু।
আবহাওয়া দফতরের সতর্কতা
আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, শনিবার আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার এবং জলপাইগুড়িতে ভারী থেকে অতি ভারী (৭ থেকে ২০ সেন্টিমিটার) বৃষ্টি হতে পারে। ওই তিন জেলার কিছু অংশে অত্যন্ত ভারী (২০ সেন্টিমিটারের বেশি) বৃষ্টি হতে পারে শনিবার। জেলাগুলিতে লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে। অন্য দিকে দার্জিলিং, কালিম্পং-সহ উত্তরবঙ্গের বাকি জেলাগুলিতে কমলা সর্তকতা জারি করা হয়েছে। আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখে জেলার বিভিন্ন প্রশাসনিক দফতরকে বন্যা পরিস্থিতির জন্য তৈরি থাকতে বলা হয়েছে। দার্জিলিং, কালিম্পং এবং সিকিমের ক্ষেত্রে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগেভাগেই হেল্পলাইন নম্বর চালু করা হয়েছে। যাতে পর্যটক বা স্থানীয়েরা বিপাকে পড়লেই যোগাযোগ করতে পারেন।
গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
সিকিম আবহাওয়া দফতরের ডিরেক্টর দেবপ্রিয় রায় বলেন, ‘‘আগামী চার দিন উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সতর্কতা রয়েছে। জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার এবং কোচবিহারে অতি ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এই তিন জেলার ক্ষেত্রে জারি করা হয়েছে লাল সর্তকতা। বাকি জেলাগুলির ক্ষেত্রে ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি করা হয়েছে। চার দিন পর থেকে আবহাওয়া স্বাভাবিক হতে শুরু করবে।’’
ভুটান এবং সিকিম পাহাড়ে এখনও ঘন কালো মেঘ থাকায় ফের ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ভুটানের আমোছু-সহ বিভিন্ন নদীতে আবারও জলস্ফীতি দেখা দিতে পারে। যার প্রভাব পড়তে পারে ডুয়ার্সের নদীগুলিতেও। ফলে সমতল এলাকায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
দুধিয়ার সেতু
এখন দার্জিলিং, কালিম্পং, সিকিমে প্রচুর পর্যটক রয়েছেন। গরমের ছুটিতে সেখানে সমতল, দক্ষিণবঙ্গ থেকে বেড়াতে গিয়েছেন পর্যটকেরা। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত পাহাড়-সহ উত্তরের জেলাগুলিতে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। ফলে কিছুটা হলেও বিপাকে পড়েছেন পর্যটকেরা। বালাসন নদীর জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছে কার্শিয়াং জেলার দুধিয়ার বিকল্প সেতু। গত বছরের বিপর্যয়ের পরে পাইপ দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল সেই অস্থায়ী সেতু। ভারী বৃষ্টির জেরে সেই সেতুই আবার ভেঙে পড়েছে। ফলে শিলিগুড়ি থেকে এখন সরাসরি আর মিরিক যাওয়া যাচ্ছে না। হয় পতং-পানিঘাটা হয়ে অথবা সুখিয়াপোখরি-ঘুম ঘুরে পাঙ্খাবাড়ি হয়ে শিলিগুড়ি নামতে হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে প্রায় দু’ঘণ্টা অতিরিক্ত সময় লাগছে। খরচও পড়ছে বেশি। এর ফলে কিছুটা হলেও বিপাকে পড়েছেন পর্যটকেরা। শুক্রবার সকালে দুধিয়া সেতুর কাছে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে যান দার্জিলিঙের সাংসদ রাজু বিস্তা। তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রশাসনিক কর্তারাও। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু প্রশ্ন তুলেছেন, কী ভাবে নির্মাণের সাত-আট মাসের মধ্যে ওই সতু ভেঙে পড়ল? তাঁর কথায়, ‘‘নির্মাণের সাত-আট মাসের মধ্যে ভেসে চলে গেল সেতু। কাটমানি ছিল কি না, তদন্ত হবে। তবে প্রাথমিক লক্ষ্য, ওই সেতু চালু করা।’’ তিনি জানিয়েছেন, সেতুর কাজের জন্য অর্থ বরাদ্দ হয়েছে। পিডব্লিউডি কাজ শুরু করেছে। আরও চার-পাঁচ দিন সময় লাগবে।
সড়কে ধস — নিজস্ব চিত্র।
জাতীয় সড়কে ধস
শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিংগামী ১১০ নম্বর জাতীয় সড়ক ধস নেমেছে। যার কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে টয় ট্রেন পরিষেবা। সেই পরিষেবা কবে চালু হবে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। এর ফলে সমস্যায় পড়েছেন পর্যটকদের একাংশ। তবে শিলিগুড়ি থেকে রোহিণী সড়ক ধরে কার্শিয়াং হয়ে দার্জিলিঙে যাতায়াতের রাস্তা এখনও অক্ষত। আগামী কয়েক দিন ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তার জেরে রাস্তায় নতুন করে ধস নামলে সমস্যা তৈরি হতে পারে। শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং যাওয়ার জন্য পাঙ্খাবাড়ি সড়ক রয়েছে। কিন্তু সেই সড়ক বেশ দুর্গম হওয়ায় তা দিয়ে যাতায়াতের অনুমোদন খুব একটা দেওয়া হয় না। পর্যটন দফতর থেকে পর্যটকদের স্থায়ী জায়গায় থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে। তাঁদের প্রশাসনের নির্দেশিকা মেনে চলাফেরা করতেও বলা হয়েছে। শুভেন্দু জানিয়েছেন, পাহাড়ে এখনও কোনও পর্যটকের আটকে থাকার কোনও খবর নেই। কিছু জায়গায় ছোট ছোট ধস নেমেছে। প্রশাসন কাজ করছে। তাঁর কথায়, ‘‘সকল পর্যটককে নামিয়ে আনতে পারব নিরাপদে, এটাই আশ্বস্ত করতে চাই।’’
নির্দেশিকা
গাড়ি চলাচল একাধিক নির্দেশিকা জারি করল দার্জিলিং জেলা প্রশাসন। শুক্রবার বিকেলে একটি নির্দেশিকা জারি করে দার্জিলিং জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে জানানো হয়, মিরিক থেকে যে সমস্ত গাড়ি শিলিগুড়ির উদ্দেশে রওনা দেবে, সেগুলি মিরিক থেকে সুখিয়াপোখড়ি, ঘুম, কার্শিয়াং হয়ে শিলিগুড়ির উদ্দেশে যাবে। অন্য দিকে, শিলিগুড়ি থেকে যে সব গাড়ি মিরিকের উদ্দেশে রওনা দেবে সেগুলি ঘুরপথে শুকনা টিসিপি থেকে রোহিণী মোড়, কার্শিয়াং হয়ে ঘুমে পৌঁছোবে। কার্শিয়াং থেকে শিলিগুড়ির উদ্দেশে যে গাড়িগুলি রওনা দেবে, সেগুলি পাঙ্খাবাড়ি রোড ধরে গাড়িধুরা হয়ে শিলিগুড়ি পৌঁছোবে। অন্য দিকে, শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং বা কার্শিয়াঙে যেতে হলে শুকনা টিসিপি মোড় হয়ে রোহিনী মোড় হয়ে কার্শিয়াং ও দার্জিলিঙের উদ্দেশে রওনা দেবে।
ফুলেফেঁপে উঠেছে নদী। — নিজস্ব চিত্র।
কালিম্পঙের পরিস্থিতি
কালিম্পঙে এখনও পর্যন্ত তেমন কোনও বড় ধসের খবর নেই। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, উত্তরবঙ্গের নদীগুলি ফুলেফেঁপে উঠলেও তা এখনও নিয়ন্ত্রণে। সিকিমের বেশ কয়েকটি জায়গায় বিক্ষিপ্ত ভাবে ধস নামলেও তা সরিয়ে আবার রাস্তাগুলিতে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়েছে। তবে সিকিম প্রশাসন আগেভাগেই সতর্কতা অবলম্বন করেছে। বেশ কয়েকটি হেল্পলাইন নম্বর চালু করা হয়েছে। বিভিন্ন জেলার প্রশাসনকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। গত অক্টোবর মাসে উত্তরবঙ্গে যে বানভাসি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা যাতে এড়ানো যায়, সেই চেষ্টাই করছে প্রশাসন, জানিয়েছেন শুভেন্দু। তিনি জানান, কলকাতায় বসে কাজ করছেন মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব। তাদের সঙ্গে একযোগে সহযোগিতা করছে উত্তরবঙ্গের প্রশাসন। শুভেন্দু বলেন, ‘‘মানুষের যতটা কম ক্ষতি হয়, তার জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। ২০২৫ সালে যে বিপর্যয় হয়েছিল, তা যাতে না ঘটে, লক্ষ্য রাখব। মানুষ যাতে বাস্তুচ্যুত না হন, তার জন্য ব্যবস্থা নিয়েছি।’’