Advertisement
E-Paper

কোনও কিশোরী এখনও কি কুড়োয় শিউলি

বাঘাযতীন পার্ক আমার কাছে এক আশ্চর্য বিষয়! জ্ঞান হওয়া ইস্তক গত সাড়ে চার দশকের বদলে যাওয়া পৃথিবীর প্রতিচ্ছবি এই পার্ক! ঋতু ও আর্থ সামাজিক বদলের নানা বৈচিত্র স্পষ্ট ভাবে ধরা যেত এখানে। নর্দমা ছাপানো সঘন বর্ষা থেকে গ্রীষ্মের কৃষ্ণচূড়া গুলমোহর, শীতের যাত্রা, ছোট মেলা, বইমেলা সব ছিল।

সেবন্তী ঘোষ

শেষ আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০২:৩৩
শিশির ভেজা শিউলি জানান দিচ্ছে। এসেছে শরৎ। ছবি: সন্দীপ পাল

শিশির ভেজা শিউলি জানান দিচ্ছে। এসেছে শরৎ। ছবি: সন্দীপ পাল

বাঘাযতীন পার্ক আমার কাছে এক আশ্চর্য বিষয়! জ্ঞান হওয়া ইস্তক গত সাড়ে চার দশকের বদলে যাওয়া পৃথিবীর প্রতিচ্ছবি এই পার্ক! ঋতু ও আর্থ সামাজিক বদলের নানা বৈচিত্র স্পষ্ট ভাবে ধরা যেত এখানে। নর্দমা ছাপানো সঘন বর্ষা থেকে গ্রীষ্মের কৃষ্ণচূড়া গুলমোহর, শীতের যাত্রা, ছোট মেলা, বইমেলা সব ছিল।

ছিল না শুধু দুর্গাপুজো। পুজোর সময় এলেই হঠাৎ করে পাড়াটা কেমন নির্জন হয়ে যেত। কলেজ পাড়ার পুজোয় মা’র সঙ্গে অঞ্জলি দিতে যেতাম। ছোট মাটির হাঁড়িতে বাইরের পাড়ার লোক বলে আমাদের ভোগের প্রসাদ দেওয়া হত। ওদের পাড়ার নিজেদের লোকেদের জন্য বড়ো হাঁড়ি। হাঁড়ির আকৃতির তারতম্যে একটা ‘অপর’-এর তফাৎ ছিল মনোকষ্টের কারণ।

তবে অমন স্থলপদ্ম ফোটা গোলাপি ভোর, নরম মিঠে রোদ আর লুকিয়ে কোনও লাজুক কিশোরের মুখচ্ছবি দেখার দিনে এ সব পাত্তা না পাওয়া দুঃখ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। তবে যাদের যায় আসছিল, তাঁরা অন্য পাড়ায় গিয়ে পুজোর মাতব্বরি দেখতে চাইছিলেন না। উকিল, ডাক্তার, বেকার, অধ্যাপক, কেরানি, ব্যবসায়ী, কর্তা গিন্নি, কুচো-কাচার মহামিলনে বাঘাযতীন পার্কের পুজো শুরু হয়ে গেল।

ঠাকুমার কাঠের বাক্স ভরা কাঁসার পেল্লাই বাসন তেঁতুল দিয়ে মাজতে কুয়ো পাড়ে জড়ো হল। মা আর পাড়ার কাকিমা জেঠিমারা জোগাড়-যন্ত্র শুরু করলেন। আমাদের কাজ ভয়ানক জরুরি! পাশের বাড়ি, তার পাশের বাড়ি এবং তার পাশের বাড়ি শিউলি দোপাটি ফুলের সন্ধানে ঢুঁড়ে ফেলা! তখন সবাই যা দেখাত, তাই দেখার বয়স।

বেশ দেখতাম দেবী প্রতিমার গর্জন তেলে চকচকে মুখে আগমনের হর্ষ। দশমীর সিঁদুর সন্দেশ মাখামাখি মুখে বিষাদের বিষণ্ণতা। দল বেঁধে খোলা ট্রাকে উঠে মহানন্দার কাদাগোলা জলে বিসর্জনে যেতাম। সৌভাগ্যবানরা দেবদেবীর অস্ত্র লাভ করত। ট্রাকের পাশে বয়স্করা হেঁটে যেতেন। কিশোর বয়স্করা ধুনুচি নাচ টাচ কিছু নাচত। তবে তা মোটেই ভাঙ খেয়ে ‘খাইকে পান’ নয়। ফিরে এসে ফাঁকা মণ্ডপে নিস্তেজ একটা হলদে বাল্বের দিকে তাকিয়ে শান্তিজল নিয়ে সদলবলে পাড়ার কাকু কাকিমাদের বাড়ি হইহই করে বিজয়া করতে যাওয়া হত। ছাঁদা বেঁধে নাড়ু সংগ্রহ করার প্রতিযোগিতাও ছিল।

আমাদের পুজোর উদ্বোধন হচ্ছে এমনটা শুনিনি। ঝাড় লন্ঠনও ছিল না। আব্রুহীন বাধাহীন বাঘাযতীন পার্কের পুজোয় কোনও জৌলুস রংবাহার ছিল না। তেমন ভিড়ও হত না। পুজোর চাঁদায় মদ-মহোৎসব, দীঘা-পুরী বা ব্যাঙ্কক যাওয়ার রেওয়াজ ছিল না। স্পর্ধাও নয়।

পার্কের চারপাশ ধরে কৃষ্ণচূড়া রাধাচূড়া গুলমোহর কাঞ্চন বৃক্ষ। শান্ত নির্জন কৃশ একটি পিচঢালা পথ বেড় দিয়ে আগলে রেখেছে তাকে। সাইকেল, কখনও স্কুটার। সবার বাড়ির সামনেই বাগানে কিছু না কিছু জবা যুঁই অতসী অপরাজিতা রঙ্গন দেশ দেশি গোলাপ ঝাড়। পাশে পাশে নারকেল পেঁপে পেয়ারা সুপারি দেবদারু গাছ। শহরের সেরা গুন্ডাদের নাম আমরা জানি। টেস্ট ক্রিকেটের উইকেট পতনের মত তাদের স্বল্পায়ু জীবন। তারা পথের পাশে আট-দশ টুকরোয় বা বন্দুকের গুলির সামনে বিজিত বীরের মত বুক পেতে দেয়। গুন্ডাকে নেতা, নেতাকে প্রোমোটার, শিক্ষককে টিউশনবাজ বলে গুলিয়ে ফেলা ছিল না।

পাড়ার চাঁদা আর ফুলেই পুজো সারা হত। কোনও দাদা যেমন জৌলুস ফোটাতো না, কাটমানিও চাইত না। এটা অবশ্যই লুপ্ত বাঘাযতীন পার্কের গল্প। শহরের অন্য সব পুজোয় এমন সত্যযুগ ছিল কি না, জানি না।

মিত্র সম্মেলনী, স্বস্তিকা, মহানন্দা স্পোর্টিং ক্লাব, হায়দারপাড়া, রথখোলা, নবীন সঙ্ঘের পুজোর আকর্ষণ ছিন জন সমাজে। বাঁশ বেত ডালা কুলো প্রদীপ সুপারির খোলা প্রভৃতি প্রকৃতজ জিনিসে থিম পুজোও ছিল। কুমারটুলি থেকে প্রতিমা আনার টক্কর ছিল বিগ বাজেটের পুজোয়। সত্যিই সেই প্রতিমার মত অপরূপ ছাঁচ তখন এদিকে বড় এটা দেখা যেত না। বেশিরভাগ সপ্তমী হেঁটে ঘোরা, অষ্টমীর রাত ন’টায় ভাড়ার গাড়িতে জ্যাঠতুতো খুড়তুতো ঠেসাঠেসি গাদাগাদি, নবমীর ভোরে বাসে চেপে দিগন্ত বিস্তৃত কাশফুল দেখতে দেখতে মামার বাড়ি পূর্নিয়া, এই ছিল আমাদের পুজোর রুটিন।

দিন গেলো। বাইরে পড়তে গেলাম। সেখানে সরস্বতী পুজো হয় না। বিশ্বকর্মা পুজোর দিন শিল্পোৎসব, মহালয়ার নাম আনন্দমেলা। তখন ছুটিতে পুজোর আনন্দের চেয়ে বাবা-মা’র সঙ্গে সময় কাটানোর টান বেশি। পাড়ার বা ইস্কুলের বন্ধুদের চেয়ে হস্টেলের নতুন বন্ধুদের, গোলগোল, গলায় ভাঁজ ফেলা, আয়তচক্ষুর দেবীমূর্তির বদলে ব্রহ্মসঙ্গীত, বেদমন্ত্রর কাচের উপাসনাঘরের আকর্ষণ তীব্র হতে থাকে। দিন বদলায়। দেখার চোখ বদলায়। বাঘাযতীন পার্কের পুজোর জৌলুস বাড়ে। তরুণদের হাতে যায় প্রতিষ্ঠান। বয়স্কদের সঙ্গে তাঁদের মনান্তর, দূরত্ব বাড়ে। পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। পাড়ার মেয়ে বন্ধুদের দূরে দূরে অন্য দেশ, শহর, অন্য পাড়ায় বিয়ে হয়ে যায়।

পাড়ার পুজোর মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে। পুজোর ঢাকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যেমন বাড়ে নিজের জয়ঢাক। মল আসক্তি, নিশিনিলয়, ডেথরেস-নানা নতুন অনুষঙ্গ, শব্দ সংযোজিত হয় শহরের গায়ে।

তবে নিশ্চয়ই অন্য কোথাও, কোনও নিভৃত গঞ্জে, ভবিষ্যতের কোনও শহরের দিকে এগিয়ে যাওয়া এখনও মফস্বলে, এমন কোনও বাঘাযতীন পার্কে কিশোরীর দল ভোরের শিশিরমাখা শিউলি কুড়োয়, সন্ধিপুজোর আরতি দেখে, পরম বিশ্বাসে সদ্য চেনা যুবকের হাতে হাত রেখে ঠাকুর দেখতে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘোরে। কিছু কি আর বদলায়! বদলের মতো দেখায়! হাঙরের দাঁতের সারির মতো একসারি খসে গেলে, নীচে থেকে আরেক সারি উঠে আসে মাত্র!

durga puja
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy