কোনও অভিযোগ ছিল না। রুটিন মাফিক নজরদারি চালাতে গিয়েই অপহৃত এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ীকে উদ্ধার করল পুলিশ। ওই ব্যবসায়ীর নাম মহম্মদ ইলিয়াস। বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল থানার বাগান গ্রামে। সচ্ছল কৃষক পরিবারের ছেলে এলাকায় কাপড়ের ব্যবসা করেন। ২০ দিন আগে তাঁকে অপহরণ করা হয়েছিল। মুক্তিপণ না পাওয়ায় অপহৃত ব্যবসায়ীর উপরে যৌন নির্যাতনও হয়েছে বলে পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের হয়েছে।
বুধবার বিকেলে মাটিগাড়া থানার পাচকেলগুড়ি লাগোয়া মেচিয়াবস্তি এলাকা থেকে তাঁকে উদ্ধার করা হয়। অপহরণে জড়িত সন্দেহে পাঁচ জনকে পুলিশকে গ্রেফতারও করেছে। এর মধ্যে একজন নেপালের বাসিন্দা। ১২ জানুয়ারি দক্ষিণ দিনাজপুরের হিলি সীমান্ত দিয়ে তিনি এ দেশে ঢুকেছিলেন। দালালকে টাকা দিয়ে ব্যবসার কাজের জন্য তিনি নেপালের কাঁকরভিটা যাচ্ছিলেন। কাঁকরভিটা যাওয়ার দু’দিন পরেই তাঁকে অপহরণ করে বাড়িতে চার লক্ষ টাকা মুক্তিপণের জন্য টেলিফোন করা শুরু হয়। তিন দিন আগে নেপাল থেকে মাটিগাড়া এলাকায় একটি বাড়িতে আটকে টাকার জন্য মারধর এবং যৌন নির্যাতন চালানো হয় বলেও অভিযোগ। ধৃতদের হেফাজত থেকে বাংলাদেশ, নেপালের সিম, দু’টি মোবাইল ফোন এবং ১৫ হাজার টাকার জাল ভারতীয় টাকা
উদ্ধার হয়েছে।
পুলিশ ধৃতদের বিরুদ্ধে মুক্তিপণের জন্য অপহরণ, যৌন নির্যাতন, জাল নোটের মামলা রুজু করেছে। সেই সঙ্গে বেআইনি ভাবে এ দেশে ঢোকার অপরাধে ইলিয়াসের বিরুদ্ধেও মামলা করা হচ্ছে। আজ, বৃহস্পতিবার ধৃতদের আদালতে পেশ করা হবে। শিলিগুড়ির পুলিশ কমিশশনার মনোজ বর্মা বলেন, ‘‘বিভিন্ন এলাকায় নজরদারি চালাতে গিয়ে আমরা ঘটনাটি জানতে পারি। সেই মতো এ দিন ওই বাংলাদেশি যুবককে উদ্ধার করা হয়েছে। ধৃতদের জেরা করা হচ্ছে।’’ এই চক্রে আরও কেউ জড়িত কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে শিলিগুড়ি পুলিশের ডিসি শ্যাম সিংহ জানিয়েছেন। বাংলাদেশ হাইকমিশনে বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলেও কমিশনারেট সূত্রের খবর।
বাড়িটি থেকেই সেই সময় শিলিগুড়ির মাল্লাগুড়ির অর্জুন শাহ, মাটিগাড়ার বানিয়াখাড়ির সুশান্ত মাহত এবং নেপালের কাঁকরভিটার মহম্মদ সাগরকে ধরা হয়। পরে তাদের জেরার পর রাতে উত্তরায়ন উপনগরী এলাকা থেকে পালপাড়ার পঙ্কজ রায় এবং বানিয়াখাড়ির সঞ্জয় চৌধুরীকে ধরা হয়েছে। পঙ্কজের মাটিগাড়ায় ঝুপড়ি হোটেল রয়েছে। সঞ্জয় কাঠের পালিশ মিস্ত্রি, অর্জুনের রুটির হোটেল রয়েছে। সাগরের কাঁকরভিটায় দোকান রয়েছে। সুশান্ত লোহার মিস্ত্রি। পুলিশের দাবি, বাংলাদেশ থেকে কাগজপত্র ছাড়া লোকজনকে ঢুকিয়ে নেপালে পারাপারের কাজ করছিল চক্রটি। মেচিয়াবস্তির ঘরটির ভিতরে মাটি খুঁড়ে গর্ত করা হয়েছিল। সেখানেই শৌচকার্য করা ছাড়াও সেখানে ইলিয়াসকে মাঝেমধ্যে ঢুকিয়েও রাখা হত। মই দিয়ে তাতে নামতে হত।
ইলিয়াস পুলিশকে জানিয়েছে, টাকার জন্য মারধর, সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়া ছাড়াও মদ খেয়ে যৌন নির্যাতনও করা হয়েছে। টাকা না পেলে প্রাণে মেরে গর্তে পুঁতে রাখার হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। সঙ্গে মোবাইল, ২৫ হাজার টাকাও নেপালে নিয়েই কেড়ে নিয়েছিল অভিযুক্তরা। ১২ জানুয়ারিই হিলি দিয়ে ঢোকার পর সোজা কাঁকরভিটা নিয়ে একটি হোটেলে তোলা হয়েছিল তাঁকে। ব্যবসার কাজের যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার কথা বলে দু’দিন পরে সেখান থেকে বার করে একটি বাড়িতে আটকে রাখা হয়। কয়েকদিন আগে ফের গাড়িতে করে বাংলাদেশ সীমান্তে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে মাটিগাড়ার বাড়িটিতে এনে আটকে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ। এক বেলা খেতে দেওয়া হত। মুক্তিপণের টাকা পেলেই সীমান্ত ছেড়ে দেওয়ার কথা বলা হত। রাতে মদের আসর বসিয়ে অত্যাচার করা হয়েছে। রাতেই ইলিয়াসও পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন।