একটা সময়ে রেল-শহর হিসেবেই পরিচিত ছিল আলিপুরদুয়ারের। রেল-নির্ভর অর্থনীতির সুফলও মিলত। আলিপুরদুয়ার জংশন স্টেশন ঘিরেই চলত নগরীর জনজীবন। ট্রেনের পরিষেবাও ছিল ভাল। রাজাভাতখাওয়া থেকে জয়ন্তী পর্যন্ত রেলপথ ছিল। তা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। যেমন ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধের সময় বন্ধ হয়ে গিয়েছে লালমণির হাট হয়ে কলকাতা যাতায়াতের রেলপথ।
১৯৭২ সালের পরে তৈরি হয় নিউ আলিপুরদুয়ার রেল স্টেশন। সেই সময় থেকেই গুরুত্ব কমতে থাকে আলিপুরদুয়ার জংশন স্টেশনের। এক সময় জংশন এলাকার লোকোশেডে কর্মীদের জন্য বাজানো সকাল ৭টার সাইরেনে জেগে উঠত শহর। হাতুড়ি-লোহার আওয়াজে গমগম করত জংশন এলাকা। সত্তরের দশকে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় লোকো শেড। আশির দশকে বন্ধ হয়ে যায় রাজাভাতখাওয়া যাতায়াতের রেল লাইন। ২০০৪ সালে আলিপুরদুয়ার জংশন থেকে শিলিগুড়ি যাতায়াতের মিটার গেজ ব্রডগেজে রূপান্তরিত হয়। তাই আলিপুরদুয়ারকে হেরিটেজ ঘোষণার দাবিও রয়েছে।
আলিপুরদুয়ারের প্রাক্তন বিধায়ক নির্মল দাস বলেন, “আলিপুরদুয়ারের রেল ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নানা কাহিনি। ১৯৪০ সালে মহাত্মা গাঁধীর নির্দেশে বক্সা পাহাড়ের ইংরেজদের জেলে বন্দি থাকা বিপ্লবীদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত। সেই সময় তিনি মিটার গেজ রেলে চেপে নেমেছিলেন আলিপুরদুয়ার স্টেশনে। আমারা ডুয়ার্স রেল উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটি গঠন করে আলিপুরদুয়ার রেল স্টেশনকে ঐতিহ্যশালী স্টেশন ঘোষণার দাবি জানিয়েছি।” সেই সঙ্গে আরও নানা দাবি রয়েছে রেলকে ঘিরে।
যেমন কলকাতার সঙ্গে দূরত্ব কমানোর জন্য আরও দ্রুতগামী ট্রেন চালু করা জরুরি। তাই অতীতের লালমণিরহাট রুটের কথা ঘুরে ফিরে আসছে বাসিন্দাদের মুখে। আলিপুরদুয়ার জংশন থেকে কোচবিহারের বামনহাট হয়ে বাংলাদেশের লালমণির হাট দিয়ে পুরোন পথে ফের রেল পরিষেবা চালু করা যাবে না কেন? এই প্রশ্ন তুলেছেন আলিপুরদুয়ারের ব্যবসায়ী মহল। ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, ওই রুটে ট্রেন চালালে আলিপুরদুয়ার থেকে কলকাতা যেতে সময় লাগবে মাত্র ৮ ঘন্টা।
বর্তমানে নিউ আলিপুরদুয়ার হয়ে অথবা আলিপুরদুয়ার জংশন হয়ে কলকাতা যেতে সময় লাগে ১৩ থেকে ১৮ ঘন্টা। বাংলাদেশ হয়ে ট্রেন চললে আলিপুরদুয়ার সহ কোচবিহারের অর্থনৈতিক চেহারার আমূল পরিবর্তন হবে।
শুধু তা-ই নয়, আলিপুরদুয়ার থেকে দক্ষিণ ভারতগামী ট্রেনের দাবি রয়েছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, গুয়াহাটি অথবা ডিব্রুগড় থেকে ছাড়া দক্ষিণ ভারতগামী ট্রেনগুলি সপ্তাহে নিদিষ্ট কয়েক দিন থামে। দাবি প্রতিদিনের ট্রেনের। তা ছাড়া আলিপুরদুয়ার জংশন থেকে শিলিগুড়ি যাওয়ারও হাতে গোনা কয়েকটি ট্রেন রয়েছে। এলাকার বাসিন্দা স্বপন আচার্য ভাদুড়ির কথায়, “স্টেশনে মাত্র দুটি টিকিট কাউন্টার রয়েছে। তা বাড়ানো দরকার। কারণ, ট্রেনের সময় প্রচন্ড ভিড় হয়।
নিউ আলিপুরদুয়ার থেকে, কামরূপ, কাঞ্চনজঙ্ঘা, তিস্তা তোর্সা, সরাইঘাট, গরিব রথ সহ বেশ কয়েকটি ট্রেন কলকাতায় যায়। তা ছাড়া, আলিপুরদুয়ার জংশন হয়ে কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস কলকাতায় যায়। দ্রুত কাউকে কলকাতায় যেতে হলে ভরসা বাগডোগরা বিমানবন্দর। এতে সময়ের সঙ্গে অর্থ ব্যয়ও প্রচুর হয়। সে জন্যই ব্যবসায়ীদের তরফে আলিপুরদুয়ার চেম্বার অফ কর্মাস অ্যান্ড ইন্ড্রাস্ট্রিজের সাধারণ সম্পাদক প্রসেনজিৎ দে বলেন, “লালমণি হাট হয়ে কলকাতা যাতায়াতের রেল লাইন চালু হলে আলিপুরদুয়ার ও কোচবিহারের ব্যবসা অনেকটাই বেড়ে যাবে। আমরা দীর্ঘ দিন ধরে আলিপুরদুয়ার জংশন থেকে বাংলাদেশের লালমনি হাট দিয়ে কলকাতা যাওয়ার রেলপথ চালুর দাবি জানাচ্ছি।”
তবে আলিপুরদুয়ারের কংগ্রেস বিধায়ক দেবপ্রসাদ রায় মনে করেন, ওই রেল পথ ফের চালু করাটা অনেক ঝক্কির ব্যাপার। তিনি বলেন, “লালমণি হাট হয়ে কলকাতা গেলে সময় কম লাগবে সেটা ঠিক। কিন্তু এতে দুদেশের মধ্যে যাতায়াতের জন্য পাসপোর্ট-ভিসা সহ নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে।” তাঁর মতে, তবে নিউ কোচবিহার পর্যন্ত ইন্টারসিটি নামে আসা পদাতিক এক্সপ্রেসটি নিউ আলিপুরদুয়ার থেকে পদাতিক এক্সপ্রেস করে চালালে একটি সুপার ফাস্ট ট্রেন পেতে পারে আলিপুরদুয়ার।
উত্তর পূর্ব সীমান্ত রেলের আলিপুরদুয়ার ডিভিশনের ডিভিশনাল কর্মাশিয়াল ম্যানেজার অলোকানন্দ সরকার জানান, ডবল লাইনের কাজ শেষ হলে কলকাতা যেতে ১ ঘণ্টা কম সময় লাগবে। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ হয়ে কলকাতা রেল পথ ফের চালুর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারে দু-দেশের সরকার।”
(শেষ)
কেমন লাগছে আমার শহর?
নিজের শহর নিয়ে আরও কিছু বলার থাকলে আমাদের জানান।
ই-মেল পাঠান district@abp.in-এ।
Subject-এ লিখুন ‘আমার শহর-শহরের নাম’।
অথবা চিঠি পাঠান, ‘আমার শহর-শহরের নাম’,
আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৩৬/৮৯ চার্চ রোড, শিলিগুড়ি ৭৩৪০০১