Advertisement
E-Paper

নরক দর্শন

মেডিক্যাল কলেজের করিডরে দেখা যায় গরু। দেখা মেলে না ডাক্তারের। অপরিচ্ছন্নতা, অব্যবস্থার ছবি দেখলেন অনির্বাণ রায়।কেউ বাবাকে স্ট্রেচারে শুইয়ে তার একদিক নিজে ধরে, অন্য দিক ধরার লোক খুঁজছেন। কেউ বা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে রয়েছেন, ডাক্তারবাবুর সঙ্গে দেখা করে রোগীর হাল জানার অপেক্ষায়। কখনও বা ওয়ার্ডের দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে রোগী বেড ছেড়ে এসে দাঁড়িয়ে আছেন বাইরে।

শেষ আপডেট: ০৬ ডিসেম্বর ২০১৫ ০১:৫২
ট্রলি নেই, এ ভাবেই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে রোগীকে। ছবি: বিশ্বরূপ বসাক।

ট্রলি নেই, এ ভাবেই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে রোগীকে। ছবি: বিশ্বরূপ বসাক।

কেউ বাবাকে স্ট্রেচারে শুইয়ে তার একদিক নিজে ধরে, অন্য দিক ধরার লোক খুঁজছেন। কেউ বা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে রয়েছেন, ডাক্তারবাবুর সঙ্গে দেখা করে রোগীর হাল জানার অপেক্ষায়। কখনও বা ওয়ার্ডের দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে রোগী বেড ছেড়ে এসে দাঁড়িয়ে আছেন বাইরে। উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজে ঢোকার পর থেকে পদে পদে নাকাল হচ্ছেন রোগী আর তাঁর পরিজনদের।

বৃহস্পতিবার দুপুরে কোচবিহার থেকে অ্যাম্বুল্যান্স ভাড়া করে বাবাকে মেডিক্যাল কলেজের হাসপাতালে নিয়ে আসেন সাদ্দাম মহম্মদ। বাবা কবুলুদ্দিনের বয়স পঁচাত্তর, হৃদরোগে আক্রান্ত। দুপুর দু’টোয় মেডিক্যালে পৌঁছনোর পরে ওয়ার্ডের বিছানায় বাবাকে নিয়ে যেতে সাদ্দামের লাগল ৪৫ মিনিট। অ্যাম্বুল্যান্স থেকে নামানোর পরে স্ট্রেচার বদলে হাসপাতালের স্ট্রেচারে শোয়ানো প্রায় সংজ্ঞাহীন কবুলুদ্দিনকে। খুলে নেওয়া হয়, অক্সিজেনের নলও।

অ্যাম্বুল্যান্স চলে যাওয়ার পর সাদ্দাম সকলকে অনুরোধ-উপরোধ শুরু করেন, বাবার স্ট্রেচারের অপর প্রান্ত ধরার জন্য। একজন তাঁর অনুরোধে সাড়া দিয়ে এসে স্ট্রেচার ধরলে ওয়ার্ডে পৌঁছয় সাদ্দাম। সেখানে কাগজপত্র দেখিয়ে বিছানার নম্বর পেয়ে গেলেও, ফের অপেক্ষা করতে হয় অন্য প্রান্তে স্ট্রেচার ধরার লোকের। সাদ্দামের কথায়, ‘‘বিছানায় নিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত অক্সিজেন দেওয়াও যাচ্ছিল না। এক সময়ে মনে হচ্ছিল, বাবা বোধহয় হাসপাতালের বিছানা পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না।’’

বাড়ি থেকে ফোন করে মেডিক্যাল কলেজে ‘লোক’ নিয়ে আসতে হয়েছে খড়িবাড়ির বাসিন্দা সোনম তামাঙ্গকে। নাক দিয়ে ক্রমাগত রক্তক্ষরণ হতে থাকায় গত সোমবার তাঁর বাবা নরবাহাদুর তামাঙ্গকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন সোনম। গত বৃহস্পতিবার হাসপাতালেই বেশ কয়েকটি পরীক্ষা করানোর কথা ছিল। অভিজ্ঞতা থেকে সোনম বুঝেছিলেন, তার একার পরে হুইলচেয়ারে বাবাকে বসিয়ে প্যাথোলজি, বর্হিবিভাগ বিভিন্ন ওয়ার্ডে টেনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাঁর কথায়, ‘‘বুঝতে পারছি, যাঁদের লোকবল বেশি নেই, তাঁদের মেডিক্যালে এসে কেমন দুর্ভোগ পোহাতে হয়।’’


হাসপাতাল চত্বরে জঞ্জালের পাহাড়। ছবি: বিশ্বরূপ বসাক।

ভর্তি হওয়ার পর থেকে রোগীদেরও দুর্ভোগ শুরু হয় বলে অভিযোগ। মহিলা মেডিসিন বিভাগের ঘর ভেসে যাচ্ছে শৌচাগার থেকে গড়িয়ে আসা জলে। কয়েকটি বিছানার নীচে পড়ে রয়েছে দলাপাকানো ব্যান্ডেজ, তুলো। ঘরের কোনে ডাঁই করে পড়ে রয়েছে ফলের খোসা। একাধিকবার অনুরোধ করেও সাফাই না হওয়ায়, দুপুরের দিকে একজনের হাতে ৩০ টাকা দেওয়ায় ঘরে ঝাড়ু পড়েছে বলে অভিযোগ করলেন বিমল কর্মকার। তাঁর এক আত্মীয়া রক্তাল্পতার কারণে হাসপাতালে ভর্তি। দুর্গন্ধে টিকতে না পেরে বিছানা ছেড়ে রোগীই চলে এসেছেন খোলা মাঠে।

গাছতলায় বসেই টিফিনবাক্সের বাটিতে ভাত-ডাল মেখে খেতে দেখা গেল ফজিরুন্নেসাকে। বছর পঞ্চাশের ফজিরুন্নেসা পেটের ব্যথা নিয়ে তিনদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। তাঁর ছেলে মহম্মদ আখতারের কথায়, ‘‘ওই দুর্গন্ধ ঘরে মা খেতে পারে না।’’

কেবল হয়রানি নয়, চিকিৎসা নিয়েও উদ্বেগে আছেন রোগীর আত্মীয়রা। তিন দিন ধরে অপেক্ষার পরেও চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে পারেননি নকশালবাড়ির বাসিন্দা মহম্মদ কফিলুদ্দিন। তাঁর স্ত্রী আসমা খাতুন পেটের ব্যথায় হাসপাতালে ভর্তি। কফিলুদ্দিনের অভিযোগ, ‘‘স্ত্রীর ঠিক কী রোগ হয়েছে তাই জানতে পারিনি। শুধু নার্সদের সঙ্গে কথা হয়েছে। চিকিৎসক এলেই আমাদের ওয়ার্ড থেকে বের করে দেওয়া হয়। এতদিন হয়ে গেল, কিছুই জানতে পারলাম না। অসহায় লাগছে।’’

নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে চিকিৎসকদের রোগী সহায়তা কেন্দ্র অথা ওয়ার্ডে বসার কথা। সেখানেই রোগীর পরিজনদের সঙ্গে কথা বলার কথা চিকিৎসকের। যদিও মেডিক্যাল কলেজে সে নিয়ম মানা হয় না হলে অভিযোগ করলেন অনেকেই।

কী বলছেন কর্তৃপক্ষ?

হাসপাতালের সুপার নির্মল বেরার কথায়, ‘‘হাসপাতালে পরিষেবা দিতে নিয়মিত চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হয়। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থাও হয়।’’ সুপারের দাবি, মেডিক্যালে কর্মীর অভাবও রয়েছে। কর্মীপদের এক চতুর্থাংশ শূন্য হয়ে রয়েছে। তার জেরেই নজরদারি সহ নানা পরিষেবায় সমস্যা হচ্ছে বলে সুপারের দাবি। সুপার বলেন, ‘‘তবে রাজ্য সরকার সম্প্রতি বেশ কিছু শূন্য পদে কর্মী নিয়োগ শুরু করেছেন। আশা করছি দ্রুত সমস্যা মিটবে।’’

নজরদারির অভাবেই ওয়ার্ডের ভিতরে বেড়াল, কুকুর বিনা বাধায় ঘুরে বেড়ায় বলে অভিযোগ। এমনকী গরুরও প্রবেশ অবাধ। বৃহস্পতিবার দুপুরে দেখা গেল, রোগীদের জন্য তৈরি খাবার বড় বড় পাত্রে ভরে ট্রলি ঠেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তার সামনে হেলেদুলে চলছে গরু। করিডোর দিয়ে গরু আসতে দেখে বর্হিবিভাগে দেখাতে-আসা রোগীরা ভয়ে নীচে নেমে গেলেন।

কেবল অবোধ প্রাণীরাই নয়, কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাবের সুযোগ নিচ্ছেন মানুষও। মেডিক্যাল কলেজের করিডরে বসে গিয়েছে জুতোর দোকান। লাগোয়া কলমজোত এলাকার এক ব্যবসায়ী রোগী সহায়তা কেন্দ্রের উল্টো দিকে করিডোরে জুতোর পসরা নিয়ে বসেছেন। হেঁকে চলছেন, ‘মাত্র চল্লিশ থেকে শুরু।’’

যা দেখে এক রোগীর আত্মীয়ের মন্তব্য, ‘‘যাক, কিছু একটা সহজে মেলে এই হাসপাতালে।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy