আচমকা পেঁয়াজের দর এক লাফে কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়ে গিয়েছে উত্তরবঙ্গের বেশ কিছু এলাকায়। দু’দিন আগেও পেঁয়াজের দাম ছিল ৩০ থেকে ৪৫ এর মধ্যে। বুধবার কোথাও ৬০, কোথাও ৭০ আবার কোনও বাজারে কেজি প্রতি ৮০ টাকা দরেও পেঁয়াজ বিক্রির খবর মিলেছে।
কোচবিহার থেকে দক্ষিণ দিনাজপুর, দার্জিলিং থেকে মালদহ কোনও বাজারেই বুধবার ৪০ টাকা কেজি দরের কমে পেঁয়াজ মেলেনি। তার জেরেই ব্যাপক কালোবাজারির অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসায়ীদের অবশ্য দাবি, রাজস্থানের বন্যার কারণে পেঁয়াজের জোগান কমেছে। সে কারণেই দাম কিছুটা বেড়ে গিয়েছে। যদিও, পাইকারি এবং খুচরো বাজারের মধ্যে দামের সমন্বয় না থাকতেই কালোবাজারির অভিযোগ মাথা চারা দিয়ে উঠেছে।
পাইকারি ব্যবসায়ীদের দাবি, বর্ষার সময়ে উত্তরবঙ্গের বাসিন্দাদের হেঁসেলে যে পেঁয়াজ ঢোকে, তা রাজস্থানের। রাজ্যে যে পেঁয়াজ উৎপাদিত হয় তা বাজারে ঢুকতে শুরু করে মার্চ মাস নাগাদ। টানা তিন মাস বাজারে সেই পেঁয়াজের সরবারহ থাকে। বর্ষা শুরুর আগে থেকেই রাজস্থানের পেঁয়াজ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার পাইকারি এবং খুচরো বাজারে আসতে থাকে। সেই পেঁয়াজের দাম বাজারে খানিকটা চড়া থাকলেও, মধ্যবিত্তের নাগালেই থাকে। যদিও, চলতি বছরের রাজস্থানের বন্যা পুরো পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে। গত মাসের মাঝামাঝি থেকেই রাজস্থানের বিভিন্ন এলাকায় অতিবৃষ্টি, বন্যা পরিস্থিতি চলছে বলে জানা গিয়েছে। তার জেরে পেঁয়াজের ফলন ব্যাপক মার খেয়েছে। চাহিদামতো পেঁয়াজ পাচ্ছে না উত্তরবঙ্গ। শিলিগুড়ি নিয়ন্ত্রিত বাজারের ফল, সব্জি কমিশন এজেন্টদের সংগঠনের নির্বাহী সদস্য তপন সাহার কথায়, ‘‘প্রতি বছর এই সময়ে যা আমদানি হয়, আবার তার মাত্র ২০ শতাংশ মিলছে। তার জেরেই দাম বেড়েছে।’’ এ দিন শিলিগুড়ি পাইকারি বাজারে ৩৫ থেকে ৪২ টাকায় পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে।
যদিও, পাইকারি দরের সঙ্গে খুচরো দরের ব্যবধানই কালোবাজারির অভিযোগ তুলে দিয়েছে। শিলিগুড়ির বিধান মার্কেটে এ দিন ৫০ থেকে ৬০ টাকা দরে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে। নিয়ন্ত্রিত বাজার থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে থাকা চম্পাসারি বাজারেও পেঁয়াজের প্রতি কেজির দর থেকে ন্যূনতম ৫০ টাকা। হায়দারপাড়া বাজারে পেঁয়াজের দাম সকালের দিকে ৫৫ টাকা ছাড়িয়ে যায়, ক্ষুদিরামপল্লি বাজারে এ দিন ৬০ টাকার বেশি দরে কেজি প্রতি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে বলে ক্রেতাদের একাংশের দাবি। পাইকারি বাজার থেকে ঝাড়াই বাছাই হয়ে খুচরো বাজারে পৌঁছনোর পরে কেজি প্রতি দাম বাড়া অস্বাভাবিক নয়। তবে পাইকারি বাজার এবং খুচরো বাজার একই শহরে থাকায় পরিবহন খরচ তেমন বেশি হয় না বলে ব্যবসায়ীদের একাংশেরই দাবি। সে ক্ষেত্রে খুচরো বাজারে কেজি প্রতি ২০ টাকারও বেশি দাম বেড়ে যাওয়া অসম্ভব বলে দাবি ক্রেতাদের।
অভিযোগ, জোগানে ঘাটতি শুরু হতেই একাংশ ব্যবসায়ী কৃত্রিম ভাবে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। কোথাও আবার মজুত বাড়িয়ে জোগান কম দেখানো হচ্ছে। বাজারে সব্জির দাম নিয়ন্ত্রণে টাস্ক ফোর্স রয়েছে। সারাবছরই সেই ফোর্সের নজরদারি চালানোর কথা। শিলিগুড়ির মহকুমাশাসক দ্বীপাপ প্রিয়া জানিয়েছেন, পরিস্থিতির সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, কোন বাজারে পেঁয়াজের কত দর তা খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। বিশদ রিপোর্ট পাওয়ার পরে পদক্ষেপ হবে বলে জানানো হয়েছে।
মালদহের বিভিন্ন বাজারে আলুর দাম একই থাকলেও পেঁয়াজের দাম বিভিন্ন রকম। এদিন ইংরেজবাজারের তিনশকুড়ি মোড় বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৪৫ থেকে ৪৮ টাকা কেজি দরে, নেতাজি পুরবাজারে পেঁয়াজের দাম ৪০ থেকে ৪২ টাকা কেজি।
পেঁয়াজের দাম পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডুয়ার্সেও। ডুয়ার্স এলাকার বিভিন্ন বাজারে পেঁয়াজ ৫০ থেকে ৬০টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আড়াইশো গ্রাম পেঁয়াজ কিনলে পরে কেউ কেউ ১৫ টাকা দর হাঁকছেন। সেখানে এক কেজি কিনলে ৫০টাকায় মিলছে মালবাজারের দৈনিক বাজারে। তুলনামুলক লাল রঙের ছোট আকারের নিম্নমানের পেঁয়াজ ৪০টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
জলপাইগুড়িতে দু’রকমের পেঁয়াজ বিক্রি হতে দেখা গিয়েছে। এক ধরনের পেঁয়াজ ৪০ টাকা প্রতি কেজি দরে বিক্রি হয়েছে, অন্য ধরণের পেঁয়াজের দর ছিল ৪৫ টাকা প্রতি কেজি। জলপাইগুড়ির পাইকারি সব্জি ব্যবসায়ী হরিনাথ প্রসাদ, কমলেশ্বর প্রসাদ বলেন, “পেঁয়াজের দামের ওঠানামার ওপর আমাদের কোন হাত নেই। বাজারে যেমন জোগান আসে তেমনি ভাবেই দাম ওঠা নামা করে।”
শিলিগুড়ি পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীরা অবশ্য দাবি করেছেন খুব শিগগিরি দাম কমার সম্ভাবনা নেই। পুজোর আগে বাজারে মহারাষ্ট্র এবং নাসিক থেকে পেঁয়াজ ঢুকতে শুরু করে। সেই পেঁয়াজের সরবারহ শুরু না হলে, জোগানের সমস্যা মিটবে না বলেই ব্যবসায়ীদের দাবি।